|
বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকিং খাতে যে ধস দেখা দিয়েছিল, ২০০৭ সালের শেষভাগ থেকে তা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে গোটা বিশ্বে। দু বছরের অধিক কাল ধরে চলমান সে মন্দা বিশ্ব অর্থনীতিকে তছনছ করে দিয়েছিল। ওই মন্দা কেটে গেলেও তার রেশ এখনও বর্তমান রয়েছে। আর এমনই পরিস্থিতিতে শুরু হয়েছে আরেক দফা মন্দার ঘনঘটা। তবে এবার এ মন্দার মূল কারণ ঘটিয়েছে ইউরোপজুড়ে ঋণ সংকট আর যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেডিট রেটিংয়ে সাম্প্রতিক অবনমন।
ইউরোপের ঋণ সংকট শুরু হয়েছিল গ্রিস থেকে। তারপর তা ছড়িয়ে পড়ে ইতালিসহ আরো বেশ কয়েকটি দেশে। এ সংকট থেকে উত্তরণে দেশগুলোকে ব্যাপক মাত্রায় সরকারি ব্যয় হ্রাস করতে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রেও ওবামা সরকারকে ব্যয় হ্রাসের অঙ্গিকার করে রাষ্ট্রীয় ঋণসীমা বৃদ্ধিতে রিপাবলিকানদের সমর্থন আদায় করতে হয়েছে।
এ নতুন পরিস্থিতিতে অর্থনীতিতে সৃষ্ট অনিশ্চয়তার কারণে শেয়ারবাজার থেকে অর্থ তুলে নিচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। তারা এখন শেয়ার বা বন্ডের মতো কাগুজে পণ্যে বিনিয়োগের চেয়ে মূল্যবান ধাতু সোনায় বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছেন। এর ফলে ধস নেমেছে বিশ্বের শেয়ারবাজারে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে বিশ্বের শেয়ারবাজার থেকে আড়াই ট্রিলিয়ন ডলার পুঁজি কমে গেছে।
পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেওয়া যায়, তা নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু করেছেন বিশ্ব নীতিনির্ধারকরা। শিল্পোন্নত দেশগুলোর সংগঠন জি-৭ ও জি-২০ভুক্ত দেশগুলোর প্রতিনিধিরা এবং ইউরোপের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি আলাদা আলাদা বৈঠকে বসেন এ বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক খাতের নেতারা বিনিয়োগকারীদের এটা নিশ্চিত করতে চাচ্ছেন যে, ঋণ সংকট সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে পশ্চিমা সরকারগুলোর ইচ্ছে ও সক্ষমতা দুটোই আছে।
জি-৭ ও জি-২০-এর নেতৃত্বে থাকা ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের সঙ্গে এক পরামর্শ বৈঠক করেছেন। ক্যামেরনের একজন মুখপাত্র জানান, দু নেতা ইউরোভুক্ত দেশগুলোর ঋণ সংকট এবং ঋণ মানে যুক্তরাষ্ট্রের অবনতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁরা একমত হয়েছেন যে, এই মুহূর্তে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, পরিস্থিতি খুব কাছে থেকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং আগামী দিনগুলোতে সতর্ক থাকতে হবে।
জি-২০ বৈঠকে অংশগ্রহণকারী দক্ষিণ কোরিয়ার উপ-অর্থমন্ত্রী চো জংগ-কু জানান, বিরাজমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তার দেশের অবস্থান তিনি বৈঠকে জানিয়েছেন। তবে তিনি ইঙ্গিত দেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তার দেশের আস্থা এখনো বজায় রয়েছে এবং তাদের বৈদেশিক মুদ্রা মজুদ ব্যবস্থাপনা নীতিতে কোনো পরিবর্তন এই মুহূর্তে আসছে না। এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মিত্র দেশ দক্ষিণ কোরিয়ার ৩০০ বিলিয়ন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের মধ্যে একটি বড় অংশ রয়েছে মার্কিন বন্ড।
প্রসঙ্গত, ক্রেডিট রেটিং বা ঋণ মানে কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো অবনতি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। বিশ্বের অন্যতম রেটিং সংস্থা স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওরস (এসঅ্যান্ডপি) যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এ মান নির্ধারণ করে। এতে দেখা যায়, ঋণ মানে দেশটির অবস্থান 'ট্রিপল এ' থেকে নেমে এসেছে 'ডাবল এ প্লাসে'। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, বাজেট ঘাটতির কারণেই যুক্তরাষ্ট্র ঋণ মানে পিছিয়েছে। মার্কিন কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলছে, এসঅ্যান্ডপি'র হিসেবে ভুলের কারণে দেশটির এ অবনমন ঘটেছে। দেশটির রাজস্ব বিভাগ বলেছে, রেটিং এজেন্সির ঋণের হিসাবে দুই ট্রিলিয়ন ডলার ভুল আছে। সে কারণে তাদের মূল্যায়ন যথার্থ হয়নি। অন্যদিকে ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসের একজন অর্থনৈতিক উপদেষ্টা এসঅ্যান্ডপি'র সমালোচনা করে তাদের রেটিং মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের নেতারা এসঅ্যান্ডপি'র রেটিং মেনে নিতে না চাইলেও তাদের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যে অনেকটা নাজুক হয়ে পড়েছে, তাতে সন্দেহ নেই অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলের কারোরই। সেকারণে নতুন দফা মন্দার আশঙ্কায় সবাই উদ্বিগ্ন। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দরকার সকল পক্ষের আন্তরিক প্রচেষ্টা। (এসআর)
| ||||
![]() |
© China Radio International.CRI. All Rights Reserved. 16A Shijingshan Road, Beijing, China. 100040 |