চীনের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সাপ্তাহিক আয়োজন: বিজ্ঞানবিশ্ব
2024-11-25 19:08:54

৯৭তম পর্বে যা থাকছে:

 

 

 

 

১। চীনে উল্কাপিণ্ডের আঘাতে সৃষ্ট গর্ত আবিষ্কার

২। মঙ্গলে সমুদ্র!

৩। পানীয় জলের গবেষণায় অসামান্য রাখায় পুরষ্কৃত হলেন চীনা বিজ্ঞানী

 

চীনে উল্কাপিণ্ডের আঘাতে সৃষ্ট গর্ত আবিষ্কার

প্রথমবারের মতো একটি পাহাড়ের চূড়ায় উল্কাপিণ্ডের আঘাতে সৃষ্ট গর্ত আবিষ্কার করেছেন চীনের বিজ্ঞানীরা। উত্তর-পূর্ব চীনের হেইলংচিয়াং প্রদেশের হেইলিন শহরের উত্তর পর্বতে এ গর্তটি আবিস্কার করেছেন তারা। সম্প্রতি একাডেমিক জার্নাল ‘ম্যাটার অ্যান্ড রেডিয়েশন অ্যাট এক্সট্রিমেসে’ এ সংক্রান্ত একটি গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে।

 

 

বেইজিং-ভিত্তিক সেন্টার ফর হাই প্রেসার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি অ্যাডভান্সড রিসার্চের বিশেষজ্ঞদের মতে, উল্কাগুলো কেবল প্রকৃতিতে একটি আকর্ষণীয় কিংবা আকাশে দীপ্তিমান বস্তু নয়, এটি মহাকাশের বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো মহাকাশ সম্পর্কে আমাদের জানার অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বহন করে। এই উল্কাদের গবেষণা করে আমরা মহাকাশের অনেক রহস্য উন্মোচন করতে পারব।

 

বিজ্ঞানীরা পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত দুইশোরও বেশি জায়গায় উল্কা পড়ার নিশ্চিত প্রমাণ পেয়েছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, চীনে এ ধরনের উল্কা গর্ত খুব কমই পাওয়া যায়। বিজ্ঞানীরা এখনো এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করছেন।

মহাকাশ থেকে পড়া কোনও বস্তুর আঘাতে সৃষ্ট এ ধরনের গর্তকে বলা হয় ‘হেইলিন ইমপ্যাক্ট ক্রেটার’। এই গর্তটি ১ হাজার ৩৬০মিটার ব্যাসের। যা দেখতে একটি উপবৃত্তাকার ডাস্টপ্যানের মতো। গর্তের কিনারার সর্বোচ্চ বিন্দু এবং কেন্দ্রের সর্বনিম্ন বিন্দুর মধ্যে উচ্চতা পার্থক্য ১০০ মিটারেরও বেশি।

সেন্টার ফর হাই প্রেসার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি অ্যাডভান্সড রিসার্চের গবেষক ছেন মিং জানান, এই ঘটনাটা অনেক অনেক বছর আগে ঘটেছিল সম্ভবত সেনোজোয়িক যুগ শেষের দিকে হয়েছিল। অর্থাৎ হাজার হাজার বছর আগে ঘটেছিল।

 

ভূপৃষ্ঠে উল্কাপিণ্ড আঘাত হানলেই যে সেখানে ভয়ংকর কোনো চিহ্ন রেখে যাবে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তেমনটা ঘটে না। চিহ্ন তৈরি হলেও বড়সড় খুব কমই দেখা যায়। বেশির ভাগই খুব দ্রুত আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে। তবে মাঝেমধ্যে খুব ভারী উল্কা পৃথিবীতে আঘাত করে। তখন সেখানে গভীর খাদ তৈরি হয়। আঘাতের সময়ে সৃষ্টি হয় অনেক উচ্চ তাপমাত্রা। ফলে উল্কাটি পুরোপুরি বাষ্পীভূত হয়ে চারদিকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় আশপাশের অনেক অঞ্চলজুড়ে শকওয়েভ তৈরি হয়। ক্ষয়ক্ষতিও হতে পারে বেশি মাত্রায়।

ছোটখাটো উল্কার ফলে পৃথিবীর তেমন ক্ষতি হয় না। তবে কয়েক শ মিটার ব্যাসের গ্রহাণু পৃথিবীতে আঘাত করলে নিউক্লিয়ার বোমা বিস্ফোরণের চেয়েও বড় ক্ষতি করতে পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব আঘাতের পূর্বাভাস আগেভাগে জানা যায় না। তাই পৃথিবীতে আঘাতের আশঙ্কাময় উল্কা ও গ্রহাণু শনাক্ত করা এবং এগুলো থেকে বাঁচার উপায় বের করা জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয়।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই নতুন আবিষ্কারের ফলে আমরা গ্রহগুলোর মধ্যে ধাক্কা লাগার ঘটনা সম্পর্কে আরো ভালোভাবে জানতে পারব। এই আবিষ্কার চীনের মাটির গঠন এবং ভূমি আকারের ওপর গবেষণা এবং গ্রহগুলোর ধাক্কা লাগার ফলে মাটির গঠন কীভাবে বদলে যায়, সেখানে কী ধরনের পরিবর্তন হয়, সে সম্পর্কে আমাদের নতুন তথ্য দিয়েছে।

 

|| প্রতিবেদন: শুভ আনোয়ার

|| সম্পাদনা:  ফয়সল আবদুল্লাহ

 

 

মঙ্গলে সমুদ্র!

মঙ্গলগ্রহে একসময় প্রাচীন সমুদ্র ছিল। চীনের মঙ্গল গ্রহের রোভার চুরং-এর তথ্য থেকে এমনটাই জানা গেছে। চীনের বিজ্ঞানীদের এমন আবিষ্কার গ্রহটির ইতিহাস এবং জীবন ধারণের সম্ভাবনা আরও প্রকট করেছে।

 

সম্প্রতি সায়েন্টিফিক রিপোর্টস জার্নালে এ সংক্রান্ত একটি গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

প্রকাশিত ওই গবেষণায় বলা হয়েছে, চুরং-এর ইন-সিটু ডেটা এবং দূরবর্তী সেন্সিং পর্যবেক্ষণের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, মঙ্গলের উত্তর নিম্নভূমিতে একটি প্রাচীন সমুদ্র ছিল।

 

চীনের থিয়ানওয়েন-১ মিশনের অংশ হিসেবে রোভার চুরং ২০২১ সালে মঙ্গলের উত্তর গোলার্ধে বিশাল নিম্নভূমি ইউটোপিয়া প্ল্যানিটিয়ায় অবতরণ করেছিল। মিশনের উদ্দেশ্য ছিল মঙ্গলের ভূতত্ত্ব অনুসন্ধান করা। চুরং এর পাঠানো তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, প্রায় ৩ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন বছর আগে ইউটোপিয়া প্ল্যানিটিয়ায় বন্যা হয়েছিল।

গবেষণায় দক্ষিণ ইউটোপিয়ায় বিভিন্ন সমুদ্রিক ল্যান্ডস্কেপের বিবরণ দেওয়া হয়েছে, যেমন একটি ফোরশোর উচ্চভূমি-নিম্নভূমি স্থানান্তর, একটি অগভীর সমুদ্রিক অঞ্চল এবং একটি গভীর সমুদ্রিক পরিবেশ। গবেষকরা ধারণা করছেন প্রায় ৩ দশমিক ৪২ বিলিয়ন বছর আগে এই সমুদ্রটি শুকিয়ে গিয়েছিল।

গবেষণা অনুযায়ী, এই অঞ্চলটি বেশ কয়েকটি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে গেছে: প্রথমে প্লাবন, তারপর হেসপেরিয়ান যুগে অগভীর ও গভীর সমুদ্রের সৃষ্টি এবং অবশেষে অ্যামাজোনিয়ান যুগে ভূগর্ভস্থ জলীয় বস্তুর ক্ষয়।

 

এই জলীয় ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের আবিষ্কার মঙ্গল গ্রহের বাসযোগ্যতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

 

এই সমুদ্র যখন বিদ্যমান ছিল, মঙ্গল সম্ভবত তার একসময় ঘন বায়ুমণ্ডল হারাতে শুরু করেছিল, পৃথিবীর মতো জলবায়ু থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল। "মঙ্গলের প্রাথমিক ইতিহাসে, যখন সম্ভবত এর উষ্ণ, ঘন বায়ুমণ্ডল ছিল, তখন সূক্ষ্মজীবী জীবন আরও সম্ভব ছিল," ক্রাসিলনিকভ যোগ করেছেন।

 

|| প্রতিবেদন: শুভ আনোয়ার

|| সম্পাদনা:  ফয়সল আবদুল্লাহ

 

 

পানীয় জলের গবেষণায় অসামান্য রাখায় পুরষ্কৃত হলেন চীনা বিজ্ঞানী

নিরাপদ পানীয় জলের ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ‘সাসটেইনেবলিটি অ্যাওয়ার্ড ২০২৪’ জিতেছেন চীনের বিজ্ঞানী ছু চিউহুই। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে  ‘নোবেল সাসটেইনেবিলিটি ট্রাস্ট ফাউন্ডেশন’ এ অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে। চীনের বিজ্ঞান একাডেমি এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে।

 

চীনের বিজ্ঞান একাডেমির ইকো-এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস রিসার্চ সেন্টার জানিয়েছে, চলতি বছর প্রথমবারের মতো পানি গবেষণার ক্ষেত্রে এই পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। চীন এখন পানির গবেষণায় বিশ্বের অন্যতম অগ্রণী দেশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং এই পুরস্কার তারই প্রমাণ।

 

বিজ্ঞানী ছু চিউহুই মনে করেন, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পানি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তিনি বলেন, “পানি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সবাইকে ভালোভাবে বাঁচতে হলে পানি সমস্যার সাবধান করতে হবে।।” তিনি আরও বলেন, তার গবেষণার ফলে অনেক দেশ এখন আরও ভালোভাবে পানি ব্যবহার করতে সক্ষম হবে।

 

‘নোবেল সাসটেইনেবিলিটি ট্রাস্ট ফাউন্ডেশন  শহুর এবং গ্রামীণ অঞ্চলে নিরাপদ পানীয় জল নিশ্চিত করার জন্য ‘উৎস থেকে ট্যাপ পর্যন্ত’ একটি প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা বিকাশ করায় বিজ্ঞানী ছুর প্রশংসা করে। তার উদ্ভাবনগুলোর মধ্যে রয়েছে কম খরচে পানি থেকে আর্সেনিক এবং ফ্লোরাইডকে ভূগর্ভজল পৃথকীকরণ প্রযুক্তি। এর ফলে বিশ্বব্যাপী ২০ কোটিরও বেশি মানুষের উপর ইতিবাচক প্রভাব পরবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিজ্ঞানী ছু চিউহুই চীনের ওয়াটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি উদ্ভাবন পরিকল্পনা পরিচালনা করছেন। ইতোমধ্যেই তিনি ইয়াংজি নদী সুরক্ষা এবং বাইয়াংতিয়ান জলাশয় সংস্কারসহ পরিবেশগত পুনরুদ্ধা প্রকল্পগুলোতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন।

 

বিশ্বের অনেক অঞ্চলেই পানির সংকট দেখা দিয়েছে। ছু চিউহুইয়ের আবিষ্কৃত পানি সম্পর্কিত নতুন নতুন প্রযুক্তি বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশের জন্য আশার আলো জ্বালাবে। তিনি বিশ্বব্যাপী পানি সঙ্কটের সমাধানের জন্য আরও বেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে আগ্রহী বলে জানিয়েছেন।

 

|| প্রতিবেদন: শুভ আনোয়ার

|| সম্পাদনা:  ফয়সল আবদুল্লাহ

 

নতুন আরও তথ্যবহুল ও অজানা বিষয় নিয়ে প্রতি সপ্তাহের সোমবার হাজির হবো আপনাদের সামনে। আগামী সপ্তাহে আবারো কথা হবে। সে পর্যন্ত ভালো থাকুন, সুস্থ্য থাকুন।

 

 

প্রযোজনা ও উপস্থাপনা- শুভ আনোয়ার

 

অডিও সম্পাদনা- নাসরুল্লাহ রাসু

 

স্ক্রিপ্ট সম্পাদনা- ফয়সল আবদুল্লাহ

সার্বিক তত্ত্বাবধান- ইউ কুয়াং ইউয়ে আনন্দী