এবারের পর্ব সাজানো হয়েছে
২। প্রকৃতির লাল গালিচা
বিশ্বব্যাপী অপরূপ সৌন্দর্যের চাদর বিছিয়ে রেখেছে বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি। কতো-শতো দেশ, কতো সংস্কৃতি, কতো ভাষা, কতো পেশা,.... কিন্তু আর্থিক অসঙ্গতি কিংবা সময়ের টানাটানিতে দেখা হয় না, ‘ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া’
‘একটি ধানের শিষের উপরে একটি শিশির বিন্দু...’সেই অদেখাকে দেখাতেই আমাদের আয়োজন "ঘুরে বেড়াই"।
দেশ-বিদেশের দর্শনীয় স্থান, সেখানে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা, এবং সেই স্থানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অর্থনীতি নিয়ে আমাদের অনুষ্ঠান ‘ঘুরে বেড়াই’।
ঘুড়ে বেড়াই অনুষ্ঠানের ৯৪ তম পর্ব আজ। আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি আমি, আফরিন মিম।
১। হুইলচেয়ারে বসে সি’আন ঘুরে প্রতিবন্ধীদের জন্য মানচিত্র আঁকলেন থিয়েন
ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন হুইল চেয়ার আরোহী থিয়ান ইয়ে। ৩৭ বছর বয়সী এই ভ্রমনপিপাসু চীনের শায়ানসি প্রদেশের সি’আনের বাসিন্দা। ঘুরে বেড়ানোর প্রবল ইচ্ছা থেকে নিজ শহরের প্রায় প্রতিটি পর্যটন গন্তব্যে ঘুরেছেন তিনি। তাইতো গোটা শহর এখন তার নখদর্পণে।
থিয়েনের জন্ম ও বেড়ে উঠা এই সি আন শহরেই। ২০০৪ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে সড়ক দুর্ঘটনায় পা হারান থিয়ান। এরপত্র থেকে হুইল চেয়ার হয়ে উঠে নিত্যদিনের সঙ্গী। বাকিটা সময় হাসি-আনন্দে কাটানোর ইচ্ছা থেকে ঘুরতে শুরু করেন নিজ শহরের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে।
উত্তর-পশ্চিম চীনের ঘুরে বেড়ানোর জন্য আদর্শ পর্যটন গন্তব্য হিসেবে ভাবা হয় এই সি’আন শহরকে। তাইতো প্রতিবছরই হাজার হাজার পর্যটকের দেখা পায় শহরটি। এই পর্যটকদের মধ্যে যেমন শিশু, নারী, বৃদ্ধ আছেন ঠিক তেমনি আছে প্রতিবন্ধী। আর এই প্রতিবন্ধীদের জন্য সি’আন ভ্রমণ সহজ করে দিয়েছেন থিয়ান ইয়ে।
প্রতিবন্ধী পর্যটকের জন্য থিয়েন একটি মানচিত্র এঁকেছেন। যে মানচিত্রে স্থান পেয়েছে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে যাওয়ার সহজ পথ। তাই এই উদ্যোগের মাধ্যমে আরও বেশি প্রতিবন্ধী ঘুরতে আসছেন এই শহরে।
এই মানচিত্র আঁকার শুরু ২০১৯ সালে। শুরুতে থিয়েন ও তার বন্ধুরা এই শহরের মূল নগর এলাকায় প্রবেশের জন্য একটি মানচিত্র আঁকেন। এরপর দেখতে পান তার এই মানচিত্র প্রতিবন্ধীদের যাতায়াতকে আরও সহজ করে দিয়েছে। এরপর শুরু করেন শহরটির বিভিন্ন দর্শনীয় ঘুরা। থিয়েন ও তার বন্ধুরা তিন মাসে শহরের ৫৯৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা ঘুরে বেড়ান।
শুরুতে নিজেরা ঘুরে দেখেন তাদের জন্য কতটা প্রতিবন্ধকতার হয় এই ঘুরে বেড়ানো। এরপর শুরু করেন বিভিন্ন স্থানের মানচিত্র আঁকা। পাশাপাশি নিজের ঘুরে বেড়ানোর ভিডিও ধারণ করেন । তার আঁকা মানচিত্র ও ভিডিও দেখে আরও অনেক প্রতিবন্ধী পর্যটক আকৃষ্ট হয় এই শহর ঘুরতে।
থিয়েন ইয়ে বলেন, "আমরা ঘুরে ঘুরে ৫ হাজারটিরও বেশি ছবি তুলেছিলাম এবং ১,৩০০টিরও বেশি সমস্যা খুঁজে পাই। এই মানচিতত্রে ব্যবহার করা হয়েছে হলুদ, লাল এবং নীল রঙ। একেক রঙের কোডে একেক সমস্যা ব্যাখ্যা রয়েছে। আমরা এই মানচিত্রটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জমা দিয়েছিলাম, এর মাধ্যমে এই শহরের অনেক রাস্তা উন্নত হয়েছে”।
থিয়েন এখন অনেক প্রতিবন্ধী পর্যটকের আস্থার জায়গা। এই শহরে ঘুরতে আসার আগে অনেকেই থিয়েনের থেকে তথ্য নিয়ে আসেন । যার ফলে তাদের ভ্রমনও হয়ে উঠে আরও বেশি স্বস্তির।
থিয়েন ইয়ে বলেন, "অনলাইনে অনেক প্রতিবন্ধী বন্ধু আমাকে প্রশ্ন করেন, তারা এই শহর ঘুরতে আসতে চান। কিন্তু তারা কিভাবে হুইলচেয়ারে ঘুরবে সেটা নিয়ে ভয়ে থাকেন। আমি তাদের আমার অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। এরপর আমি বিভিন্ন ভিডিও বানিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে আপ করি, যাতে করে আরও অনেকেই সেটা দেখতে পারে”।
থিয়েন ইয়েকে এই পর্যন্ত আসতে নিজের সাথে লড়াই করতে হয়েছে। তার এই লড়াইয়ে পাশে ছিলেন তার পরিবার।
থিয়েন ইয়ের মা ইয়াং হংহই বলেন, "সেই সময় আমি সত্যিই বিভ্রান্ত ছিলাম। অনেক বছর লেগেছিল বাইরে বেরিয়ে অন্যদের সঙ্গে মেলামেশা করতে। যখনই কেউ আমার ছেলে সম্পর্কে জানতে চাইত, আমি আর সহ্য করতে পারতাম না, শুধু কাঁদতাম । তাই সেই সময়ে আমি মানুষের সাথে মেলামেলা এড়িয়ে চলতাম,"।
পরিবার , বন্ধুদের সহযোগিতায় থিয়েন একঅসময় স্বাভাবিক জীবন পার করতে থাকেন। ২০১৪ সালে একটি রেস্তোরা দেন। মাত্র আট চুলা স্টল থেকে ৩০০ বর্গমিটারের বড় রেস্তোরা হয় তার। কিন্তু চলতি বছরই বন্ধ হয় তার এই রেস্তোরা। এরপর থেকেই ঘুরে বেড়ানোয় মনোযোগ দেন।
থিয়েন ইয়ে জানান, "শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সাময়িক চ্যালেঞ্জ। আসল চ্যালেঞ্জ হলো আমাদের অন্তরে। এটি যখন আপনি অভ্যন্তরীণ প্রতিবন্ধকতা দূর করতে পারবেন তখনই আপনি জীবনের আসল সুখ এবং আনন্দ অনুভব করতে পারবেন। আমি আমার নিজের সমস্যা মোকাবেলা করার পর, অন্যের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি”।
প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও মানসিক শক্তিই পারে যেকাউকে তার গন্তব্যে পৌঁছে দিতে। এযেন সেই উদাহরণ তৈরি করেছে থিয়েন ইয়ে। তিনি এখন তার মতো ব্যক্তিদের জন্য অনুপ্রেরণা।
প্রতিবেদন- আফরিন মিম
সম্পাদনা- ফয়সল আব্দুল্লাহ
২। প্রকৃতির লাল গালিচা
হেমন্ত ঋতুর শেষ আর শীতের শুরু। এ সময় পাহাড়ী অরণ্যের রঙিন পাতার দৃশ্য সবচেয়ে মনকাড়া। লালপাতার অরণ্য দেখার জন্য একটি বিখ্যাত পর্যটন স্পট হলো কুয়াংউ মাউন্টেন। দক্ষিণ পশ্চিম চীনের সিছুয়ান প্রদেশের পাচোং সিটির কুয়াংউ মাউন্টেনে এখন পর্যটকদের ভিড় জমেছে। ২২তম সিছুয়ান কুয়াংউ মাউন্টেন ইন্টারন্যাশনাল রেড লিফ ফেস্টিভ্যাল চলছে। ২২ অক্টোবর শুরু হওয়া এই উৎসব ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে। একানকার লার পাতার দৃশ্যকে বলা হয় এশিয়ার সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক লাল কার্পেট।
এখানকার অরণ্যের গাছে গাছে পাতার রঙের পরিবর্তন শুরু হয় অনেক আগে থেকে। গ্রীষ্মের সবুজ পাতা শরৎ হেমন্তকালে নীল, হলুদ, কমলা ও লার রঙের হয়ে ওঠে। শীতের শুরুতে পাতাগুলো হয়ে ওঠে টকটকে লাল। এই সিনিক স্পটকে বলা হয় বায়োলজিকাল জিনব্যাংক এবং প্রাকৃতিক অক্সিজেনবার।
লালপাতা উৎসব চলাকালে পাচোং সিটিতে নানা রকম ইভেন্টের আয়োজন করা হয়। যেমন ফটোগ্রাফি প্রদর্শনী, অরণ্যে ক্যাম্পিং, পাহাড়ে লাল পাতার অরণ্য দেখা ও তারাভরা আকাশের নিচে সংগীত উৎসব। সেইসঙ্গে স্থানীয় জনপ্রিয় সিছুয়ান খাদ্যেরও আয়োজন থাকে।
চীনে এখন প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার জন্য বিশেষ পর্যটন প্যাকেজেরও ব্যবস্থা রয়েছে। পাচোং সিটিতে রয়েছে এমন বেশ কিছু পর্যটন প্যাকেজ। এই প্যাকেজের আওতায় লাল পাতার অরণ্যে ভ্রমণ, এই এলাকার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য উপভোগ, স্থানীয় খাদ্য গ্রহণ, স্থানীয় কারুশিল্পমেলা দেখাসহ বিভিন্ন আয়োজন রয়েছে। পাচোং কালচারাল টুরিজমকে ব্র্যান্ডিং করা হচ্ছে বিভিন্নভাবে। পর্যটকরা একানে পাহাড়ী অরণ্যের রঙিন শোভা দেখতে পাবেন। সিনিক স্পটে রেস্টুরেন্টও রয়েছে।
লালপাতার অরণ্য দেখতে হলে সিছুয়ান যাবার এখনই সময়। বিশেষ করে কুয়াংউ পাহাড় সিনিক এরিয়ায় এখন দেশি বিদেশি অনেক পর্যটকই যাচ্ছেন।
প্রতিবেদন- শান্তা মারিয়া
সম্পাদনা- আফরিন মিম
ঘুরে বেড়াই অনুষ্ঠান পরিকল্পনা ও প্রযোজনা - আফরিন মিম
অডিও সম্পাদনা- রফিক বিপুল
সার্বিক তত্ত্বাবধান- ইউ কুয়াং ইউয়ে আনন্দী