চীনের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সাপ্তাহিক আয়োজন: বিজ্ঞানবিশ্ব
৯৫তম পর্বে যা থাকছে:
১। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে আঙ্গুর গাছের বৃদ্ধি দ্রুততর করলেন বিজ্ঞানীরা
২। চীনে নতুন প্রজাতির বুনো মাশরুমের সন্ধান
৩। শব্দ দূষণ পাখির বংশবৃদ্ধিকে প্রভাবি করছে!
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে আঙ্গুর গাছের বৃদ্ধি দ্রুততর করলেন বিজ্ঞানীরা
আঙ্গুর চাষ বেশ লাভজনক হলেও বীজ রোপণ থেকে শুরু করে ফলন আসা পর্যন্ত আঙ্গুর চাষীদের অপেক্ষা করতে হয় দীর্ঘ সময়। এর ফলে অর্থনৈতিক ক্ষতিসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যার মুখে পড়েন কৃষকরা। এ সমস্যার সমাধানে চীনের বিজ্ঞানীরা আঙ্গুরের গাছ দ্রুত বড় করার উপায় বের করেছেন। নতুন এই পদ্ধতির কারণে এখন আঙ্গুরের গাছ আগের তুলনায় অনেক দ্রুত বড় হবে। সম্প্রতি এ সংক্রান্ত একটি গবেষণার ফলাফল নেচার জেনেটিক্স জার্নালে প্রকাশ করা হয়।
গবেষণাটি করেছেন চাইনিজ একাডেমি অফ এগ্রিকালচারাল সায়েন্সেসের গবেষকরা।
গবেষণাপত্রে বলা হয়, বাণিজ্যিকভাবে খুবেই গুরুত্বপূর্ণ আঙ্গুরের প্রজনন চক্রকে সংক্ষিপ্ত করে দ্রুত বৃদ্ধিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেছেন গবেষকরা। এর ফলে আঙ্গুর চাষিরা আগের চেয়ে অনেক আগেই আঙ্গুর তুলতে পারবেন।
সাধারণত একটি আঙ্গুরের বীজ থেকে অঙ্কুরোদগমন এবং ফল ধারণের প্রক্রিয়া তিন বছর সময় লাগে। এছাড়া উন্নত জাতের আঙ্গুরের ক্ষেত্রে আরও অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন। এই দীর্ঘ পক্রিয়ার কারণে নতুন জাতের আঙ্গুর উদ্ভাবন কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ, বিজ্ঞানীদের নতুন জাতের আঙুর তৈরি করে তার ফল দেখতে অনেক বছর অপেক্ষা করতে হয়।
গবেষক চৌ ইয়ংফেংয়ে নেতৃত্বে চীনের বিজ্ঞান একাডেমির সাবডিভিশন কৃষি জিনোমিক্স ইনস্টিটিউটের গবেষকরা ২০১৫ সাল থেকে আঙ্গুরের নতুন জাতের বিকাশ এবং প্রজনন নিয়ে গবেষণা করছেন। দীর্ঘ এ গবেষণায় বিপুল পরিমাণ জিনোমিক এবং জেনেটিক ডেটা বিশ্লেষণ করেছেন। গত বছর, তারা প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ আঙ্গুরের জিনোম মানচিত্র প্রকাশ করেন। এছাড়া তারা আঙ্গুরের প্যান-জিনোম তৈরি করেন।
আঙ্গুরের জিন এবং বৈশিষ্ট্যের মধ্যে সম্পর্ক বোঝার জন্য চৌ এবং তার সহকর্মীরা প্রায় ১০ হাজার জাতের আঙ্গুর থেকে ৪০০টিরও বেশি নমুনা পরীক্ষা করেছেন।
দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে তারা আঙ্গুরের গুচ্ছের আকার, মেটাবোলাইটের পরিমাণ, আকার এবং খোলের রঙের মতো ২৯টি কৃষিগত বৈশিষ্ট্য গবেষণা করে আঙ্গুরের জন্য জেনেটিক এবং ট্রেট মানচিত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। গবেষক দলটি ফসলের কার্যকারিতা বাড়াতে পারে এমন জিনগুলোর সনাক্তকরণকে দ্রুততর করার জন্য একটি সম্ভাব্য মডেল বিকশিত করেছেন।
চৌ ইয়ংফেং জানান, এই মডেলের সাহায্যে গবেষকরা দ্রুত এবং সঠিকভাবে অসংখ্য প্রজনন উপকরণের জেনেটিক সম্ভাবনা মূল্যায়ন করতে পারবেন এবং উন্নত জাত নির্বাচনও সহজ হবে। এই প্রজনন প্রযুক্তি আঙ্গুরের চারার বৈশিষ্ট্যের প্রাথমিক পূর্বাভাসে জানতেও সহায়তা করবে। এছাড়া অনুপযুক্ত চারা অপসারণ দ্রুততর করবে এবং অপ্রয়োজনীয় শ্রম এবং ব্যয় হ্রাস করে।
সম্প্রতি গবেষকরা ফসলের জাত উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতা দূর করে প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং উচ্চ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এবং অন্যান্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। সিনচিয়াং উইগুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের কিছু অঞ্চল তুলা চাষের জন্য বিখ্যাত। এসব অঞ্চলে খরা সহনশীলতা এবং কীট প্রতিরোধের মতো বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন তুলার জাত উন্নয়নে এআই-চালিত প্রজনন কৌশলগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে।
চীনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ সুন ছিসিন জানান, সাম্প্রতিক বছরগুরোতে স্মার্ট ব্রিডিং প্রযুক্ততির ক্ষেত্রে অগ্রণী হয়ে উঠেছে চীন। দেশটিতে এ বিষয়ে স্নাতকোত্তর শিক্ষাও গ্রহনের হারও বেড়েছে।
চীনের এই গবেষণা আঙ্গুর চাষের ক্ষেত্রে একটি নতুন দিগন্তের দ্বার উন্মুক্ত করেছে। অন্যান্য ফসলের ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কৃষি ক্ষেত্রে আরও ব্যাপকভাবে ব্যবহার হতে শুরু করেছে। এটি খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।
|| প্রতিবেদন: শুভ আনোয়ার
|| সম্পাদনা: ফয়সল আবদুল্লাহ
চীনে নতুন প্রজাতির বুনো মাশরুমের সন্ধান
মাশরুম প্রকৃতির এক অদ্ভুত ও রহস্যময় উপহার। এগুলো দেখতে হয়তো সাদামাটা, কিন্তু ভেতরে লুকিয়ে থাকে অসাধারণ স্বাদ ও পুষ্টিগুণ। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে হাজার হাজার প্রজাতির বুনো মাশরুম পাওয়া যায়। তবে সব মাশরুম খাওয়া যায় না, অনেক প্রজাতি বিষাক্ত। সম্প্রতি উত্তর-পশ্চিম চীনের ছিনবা পর্বত অঞ্চলের একটি অভয়ারণ্যে দুটি নতুন প্রজাতির বুনো মাশরুম চিহ্নিত করেছেন দেশটির গবেষকরা।
এ সংক্রান্ত একটি গবেষণার ফলাফল ইউরোপীয় জার্নাল অব ট্যাক্সোনমি সায়েন্স সাইটেশন ইনডেক্স জার্নালে প্রকাশ করা হয়। এই বুনো মাশরুম দুটির খাবার উপযোগিতা এবং ব্যবহার নিয় বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেননি গবেষকরা।
অধ্যাপক সোং ইউর নেতৃত্বে শায়ানসি ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির স্কুল অফ বায়োলজিক্যাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের একদল গবেষক এই বুনো মাশরুম দুটির সন্ধান পেয়েছেন। গবেষকরা মিছাংশান বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভে পাওয়া নতুন প্রজাতি দুটির নাম রেখেছে ‘রুসুলা মিছাংশানেনসিস’ও ‘রুসুলা মিনিরোসিয়া’।
এর আগে ২০২১ সালের আগস্ট এবং ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে মিছাংশান বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভে মাশরুমের প্রজাতি দুটি পাওয়া গিয়েছিল।
গবেষকরা এ কাজে প্রতিটি প্রজাতির ১২টি নমুনা সংগ্রহ করে সেগুলোর ম্যাক্রোস্কোপিক ও মাইক্রোস্কোপিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করেছেন। এ কাজে তারা মাশরুমগুলোর পাঁচটি করে জিনও বিশ্লেষণ করেছেন।
|| প্রতিবেদন: ফয়সল আবদুল্লাহ
|| সম্পাদনা: শুভ আনোয়ার
শব্দ দূষণ পাখির বংশবৃদ্ধিকে প্রভাবি করছে!
জীববৈচিত্র্যের এই পৃথিবীতে হরেক রকম কীট-পতঙ্গ, পাখি উড়ে বেড়ায়। পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে পাখির বংশবৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমানে শব্দ দূষণ এর কারণে পাখির বংশবৃদ্ধির উপর অনেক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এর ফলে অকালেই মারা যাচ্ছে অনেক পাখি।
সম্প্রতি গবেষণায় পাওয়া গেছে, শব্দ দূষণ এর কারণে পাখির বংশবৃদ্ধির হার কমে যায়। এই প্রভাব ডিমের ভিতরে ভ্রূণ অবস্থায় অথবা ডিম থেকে বাচ্চা হওয়ার পর উভয় অবস্থায় হতে পারে। শব্দ দূষণ এর ক্ষতিকর প্রভাব পাখির বেড়ে উঠা, স্বাস্থ্য ও প্রজননের উপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
সম্প্রতি সায়েন্স জার্নালে এ সংক্রান্ত একটি গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
প্রকাশিত গবেষণার সহ লেখক এবং অস্ট্রেলিয়ার ডেকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাখি যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. মেরিন মাইলেট বলেন,
আগে গবেষকরা শুধু জানতেন, শব্দ দূষণ পাখিদের বেড়ে উঠার জন্য বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে মা পাখিদের বাচ্চার যত্ন নিতে এবং যোগাযোগ রক্ষা করতে কষ্ট হয়। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এই বিষয়ে নিশ্চিত ছিলেন না যে, শব্দ দূষণ সরাসরি পাখির ছানাদের ক্ষতি করে কিনা!
এই প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য মেরিন মাইলেট ও তাঁর দল জেব্রা ফিঞ্চ পাখির ডিমের উপর একটি পরীক্ষা করে। তাঁরা ডিমগুলোকে দুভাগ করে টানা পাঁচদিন একভাগকে নীরবতার মধ্যে রাখেন এবং অন্যভাগকে শব্দ দূষণময় পরিবেশে রাখেন। দূষণময় পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য তাঁরা শহরের যানজটের শব্দ, পাখির কলকলানি ইত্যাদির রেকর্ড বাজাতেন।
পরবর্তীতে ভ্রূণ থেকে অঙ্কুরিত হওয়ার পর আবার টানা নয়দিন এই পরিস্থিতি বজায় রাখেন। মা পাখিদের কোনো ক্ষতি না হওয়ার জন্য তাঁরা শুধু মাত্র ছানাগুলোকে আলাদা করে কিছু নির্দিষ্ট সময়ের জন্য রেকর্ড শুনানোর জন্য নিয়ে যেতেন।
তাঁরা এই পরীক্ষার মাধ্যমে লক্ষ্য করেন, যে-সব ডিম শব্দ দূষণ এর মধ্যে থাকে, তাদের ডিম অঙ্কুরিত হওয়ার হার প্রায় ২০ শতাংশ কমে যায়। এছাড়াও ওই ডিম থেকে যে-সব বাচ্চা ফোটে তারা অন্যান্য সাধারণ বাচ্চা থেকে প্রায় ১০ শতাংশ ছোট এবং ১৫ শতাংশ হালকা।
তাঁরা আরো আতঙ্কের সাথে লক্ষ্য করেন, এসব বাচ্চার লোহিত রক্ত কণিকার ঘনত্ব কম এবং ক্রোমোজোমের টিপস বা ডিএনএ এর ছোট অংশ ক্ষতিগ্রস্ত। যা কোষীয় চাপের একটি ইঙ্গিত বহন করে।
ছানাগুলো আর শব্দ দূষণ এর সংস্পর্শে না থাকার পরেও চার বছর পরে তাদের প্রজনন বয়সে উপনীত হয়েও এই প্রভাবগুলো অব্যাহত ছিল। জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে শব্দ দ্বারা বিরক্ত পাখিরা তাদের সমবয়সীদের তুলনায় অর্ধেকেরও কম সন্তান উৎপাদন করে।
|| প্রতিবেদন: শুভ আনোয়ার
|| সম্পাদনা: ফয়সল আবদুল্লাহ
নতুন আরও তথ্যবহুল ও অজানা বিষয় নিয়ে প্রতি সপ্তাহের সোমবার হাজির হবো আপনাদের সামনে। আগামী সপ্তাহে আবারো কথা হবে। সে পর্যন্ত ভালো থাকুন, সুস্থ্য থাকুন।
প্রযোজনা ও উপস্থাপনা- শুভ আনোয়ার
অডিও সম্পাদনা- রফিক বিপুল
স্ক্রিপ্ট সম্পাদনা- ফয়সল আবদুল্লাহ
সার্বিক তত্ত্বাবধান- ইউ কুয়াং ইউয়ে আনন্দী