আকাশ ছুঁতে চাই ৭৭
2024-07-04 17:19:57

১. চান ছুনপেই: বিপদে এগিয়ে আসা সাহসী বোন

২. হংকংয়ে বাংলাদেশী নারী কর্মীদের জন্য বিশেষ আয়োজন

৩. মানবসেবাই যার জীবনের লক্ষ্য

 

নারী ও শিশু বিষয়ক অনুষ্ঠান আকাশ ছুঁতে চাই থেকে সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি আমি শান্তা মারিয়া। আমাদের অনুষ্ঠানে আমরা কথা বলি নারী ও শিশুর অগ্রযাত্রা, বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ, সাফল্য, সংকট সম্ভাবনা নিয়ে। আমরা কথা বলি সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানুষের অধিকার নিয়ে।

 

চান ছুনপেই: বিপদে এগিয়ে আসা সাহসী বোন

 

একজন সাহসী নারী চান ছুনপেই। তিনি  চীনের পাবলিক ওশ্যান গোয়িং জাহাজের  প্রথম নারী ক্যাপ্টেন। এখন পর্যন্ত বিশটির বেশি উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছেন। শুনবো এই সফল নারীর গল্প।

বিক্ষুব্ধ সমুদ্র। বিপদ সংকুল ঢেউ ভেঙে এগিয়ে চলেছে একটি জাহাজ। হাইসুন ১ নামের পাঁচ হাজার টন টহল জাহাজটি শাংহাই মেরিটাইম সেফটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের একটি উদ্ধার জাহাজ। এর ক্যাপ্টেন একজন নারী। নাম তার চান ছুনপেই। তিনি চীনের পাবলিক ওশ্যান গোয়িং জাহাজের প্রথম নারী ক্যাপ্টেন। ৩৩ বছর বয়সী এই সাহসী নারী এখন পর্যন্ত ২০টির বেশি প্রধান উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছেন। এই অভিযানের মধ্যে মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের সেই হারানো বিমান  ফ্লাইট এমএইচ ৩৭০ অনুসন্ধান অভিযানও ছিল।

তিনি নিজের বিষযে বলেন তিনি একজন প্রকৃত বোন যিনি বিপদে এগিয়ে যান।

চান ছুনপেই ২০১৩ সালে শাংহাই মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশনের পর শাংহাই মেরিটাইম সেফটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে তার ক্যারিয়ার শুরু করেন। তিনি যখন শোনেন সে সময় দেশের সবচেয়ে বড় ও আধুনিক মেরিটাইম পেট্রল অ্যান্ড রেসকিউ বা টহল ও উদ্ধার জাহাজ হাইসুন যাত্রা মুরু করবে তখন তিনি সেখানে যোগ দেয়ার সুযোগ খোঁজেন। সুযোগ আসে ২০১৪ সালে। সেসময় মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের নিখোঁজ এমএইচ৩৭০ ফ্লাইটের খোঁজে ভারত মহাসাগরে সন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চলছিল। তিনি সেই অভিযানে নেমে পড়েন। 

এরপর থেকে অনেক উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছেন চান। তিনি মনে করেন মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করার মধ্যে যে আনন্দ ও শান্তি রয়েছে তা অনন্য। এমন অনেকবার হয়েছে যখন অন্য সবাই হাল ছেড়ে দিলেও তিনি হাল ছাড়েননি এবং একেবারে শেষ মুহূর্তেও কোন মানুষকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন।

২০১৮ সালে তিনি একটি বিশাল চ্যালেঞ্জিং অভিযানে অংশ নেন। একটি ট্যাংকার ১ লাখ ১০ হাজার ম্যাট্রিক টন ভয়াবহ দাহ্য ঘন তেল নিয়ে আরেকটি যানের সঙ্গে ধাক্কা খায়। পূর্ব চীন সাগরে ঘটনাটি ঘটে। তিনি তখন ছুটি কাটাচ্ছিলেন। কিন্তু জরুরি ভিত্তিতে ছুটি বাতিল করে তাকে উদ্ধার অভিযানে যুক্ত করা হয়।

এই দুর্ঘটনায় চ্যালেঞ্জ ছিল বহুমুখী। দুর্গত মানুষদের উদ্ধার করা, আগুন থেকে বাঁচানো এবং নিজেদেরও নিরাপদ রাখা। আবার তেল ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টিও পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব ছিল। তিনি এই উদ্ধার অভিযানে কৃতিত্বের পরিচয় দেন।

মেরিটাইম সেফটির এই পেশায় পুরুষ প্রাধান্য রয়েছে। বলা যায় পুরোপুরি মেল ডোমিনেটেড একটি পেশা। কিন্তু এরপরও চান মনে করেন এখানে জেন্ডার কোন বাধা নয়। সাহসের সঙ্গে কাজ করা এবং নিজের পেশাকে সম্মান করাটাই সবচেয়ে জরুরি। নারীরা যত বেশি এগিয়ে আসবেন ততোবেশি প্রথাগত ধারণা ভাঙতে পারবেন। তিনি নিজে প্রমাণ করেছেন যে, একজন নারী পুরুষর সমান বা অনেক ক্ষেত্রে বেশি দক্ষ।

প্রতিবেদন: শান্তা মারিয়া

সম্পাদনা: মিম

 

হংকংয়ে বাংলাদেশী নারী কর্মীদের জন্য বিশেষ আয়োজন

চীনের বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল হংকংয়ে বাংলাদেশের নারী কর্মীদের জন্য বৈধপথে রেমিট্যান্স প্রেরণ ও প্রবাস পেনশন স্কিমে রেজিস্ট্রেশন সম্পর্কিত উদবুদ্ধকরণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। হংকংয়ের বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল সেখানে কর্মরত বাংলাদেশি নারীদের নিয়ে এ আয়োজন করা হয়। বিস্তারিত প্রতিবেদনে।

সম্প্রতি চীনের বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল হংকংয়ের বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল দেশটিতে কর্মরত বাংলাদেশি নারী কর্মীদের জন্য বৈধপথে রেমিট্যান্স প্রেরণ ও ‘প্রবাস পেনশন’ স্কিমে রেজিস্ট্রেশন সম্পর্কিত উদ্বুদ্ধকরণ সভার আয়োজন করে।

এ সভায় প্রায় ১২০ জন নারী কর্মী উপস্থিত ছিলেন। এতে প্রথম সচিব (শ্রম) জাহিদুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে কনসাল জেনারেল ইসরাত আরা প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

 

উপস্থিত নারী কর্মীদের সমবেত জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়। পরে কনসাল জেনারেল কর্মীদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে বৈধপথে রেমিট্যান্স প্রেরণ এবং ‘প্রবাস পেনশন’ স্কিমে অংশগ্রহণের জন্য সবাইকে আহ্বান জানান।

কনসাল জেনারেল নারী কর্মীদের জন্য বিভিন্ন দিকনির্দেশনার পাশাপাশি কনস্যুলেট থেকে তাদের সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত নারী কর্মীদের কয়েকজন তাদের অনুভূতি ব্যক্ত করেন। তারা প্রবাস পেনশন স্কিমে রেজিস্ট্রেশনের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করার পাশাপাশি প্রবাসীদেরও সার্বজনীন পেনশন স্কিমের বিশেষ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করায় সরকারকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

বৈধপথে রেমিট্যান্স প্রেরণের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পেরে তারা বৈধপথে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রেরণের বিষয়েও দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

প্রতিবেদন: আফরিন মিম

সম্পাদনা: শান্তা মারিয়া

 

মানবসেবাই যার জীবনের লক্ষ্য

ধীরে ধীরে নিজের জীবনে উন্নতি করেছেন পাশাপাশি গ্রামবাসীকে দিয়েছেন স্বাস্থ্যসেবা। এমন একজন সেবাপরায়ণ নিবেদিত নারী চাং চিচুয়ান। তার জীবনের গল্প শুনবো এখন।

চাং চিচুয়ান একজন পল্লী চিকিৎসক। নিজের সম্পর্কে তিনি বলেন তিনি কচ্ছপের মতো ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে এগিয়ে গিয়েছেন।

চাং বাস করেন ইয়ুননান প্রদেশের তালি-পাই স্বায়ত্তশাসিত প্রিফেকচারের কাওফা গ্রামে। ৫০ বছর বয়সী চাং তার হোমটাউনের এথনিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে দারুণ জনপ্রিয়। তিনি ছোটবেলা থেকেই চিকিৎসাবিজ্ঞানে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু ডাক্তারি বিদ্যা অধ্যয়নের মতো তুখোড় মেধা ছিল না । সুযোগও পাননি বড় শহরে গিয়ে চিকিৎসাবিদ্যার পাঠ নেবার।

১৯৯৪ সালে তিনি নার্সিং প্রোগ্রাম পাশ করেন। প্রিফেকচার পর্যায়ের একটি ভোকেশনাল হাইস্কুল থেকে নার্সিং বিষয়ে পাশ করার পর তিনি গ্রামে ফিরে আসেন এবং পল্লী ক্লিনিকে কাজ করা শুরু করেন।  আশপাশের ২০০০ বাসিন্দার জন্য সেই ক্লিনিকে মাত্র তিনজন কর্মী ছিলেন।

এখানকার প্রকৃতি অত্যন্ত দুর্গম। পার্বত্যভূমি। শহরের হাসপাতাল থেকে বহুদূরে। চাং দুর্গম পাহাড়ি গ্রামে গ্রামে ঘুরে গর্ভবতী মায়েদের খোঁজ নিতেন। তাদের যথাসাধ্য চিকিৎসা সেবা দিতেন।

চাং যদিও পাশ্চাত্য চিকিৎসা বিদ্যা শিখেছেন তবে তার সবসময় আগ্রহ ছিল লোকজ চিকিৎসা পদ্ধতির দিকে। তিনি ভোকেশনাল স্কুলে কিছুটা আকুপাংচার ও ঐতিহ্যবাহী চিনা চিকিৎসাপদ্ধতির পাঠ নিয়েছিলেন। সেই জ্ঞান থেকেই তিনি স্থানীয় কৃষকদের টিসিএম চিকিৎসা সেবা দেয়া শুরু করেন।

২০১৯ সালে চাং একটা ভালো সুযোগ পান। তিনি তালি প্রিফেকচারে টিসিএম ট্রেনিং প্রোগ্রামে যোগ দেন। ওই প্রশিক্ষণে বেশিরভাগই ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী ও বড় হাসপাতালের ডাক্তাররা। তার খুব লজ্জা লাগতো। তারপরেও সব দ্বিধা দ্বন্দ্ব কাটিয়ে তিনি প্রায় সন্তানের বয়সী একজন সহপাঠীর সঙ্গে পড়াশোনা করতে থাকেন। সেই সহপাঠী চাংকে অনেক সহায়তা করেন। তিনি পড়া মুখস্ত করেন এবং নিজের দক্ষতা বাড়াতে থাকেন।

এই প্রশিক্ষণে চাং অনেক কিছু জানতে পারেন এবং ট্র্যাডিশনাল চাইনিজ মেডিসিনে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। তিনি গ্রামে ফিরে এসে তার শিক্ষা ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে গ্রামবাসীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা দিতে থাকেন।

 

 চাং শুধু বাড়ি বাড়ি ঘুরে চিকিৎসাই দেন না তিনি তাদের বিভিন্নভাবে সাহায্য করারও চেষ্টা করেন। কাওফা গ্রামে চারটি এথনিক জনগোষঠীর মানুষ বাস করেন। তাদের অনেকের ভাষা বেশ দুর্বোধ্য। কিন্তু চাং এই চারটি ভাষাই বোঝেন ও কথা বলতে পারেন। ফলে গ্রামবাসীরা সহজেই নিজেদের সমস্যার কথা চাংকে বলতে পারেন। চাং সাধ্যমতো তাদের সাহায্য করেন। কাউকে যদি শহরের হাসপাতালে পাঠাতে হয় সেটার ব্যবস্থা করেন।

প্রতিবেদন: শান্তা মারিয়া

সম্পাদনা: মিম

সুপ্রিয় শ্রোতা। আকাশ ছুঁতে চাই অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে পৌছে গেছি আমরা। সকলকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বিদায় নিচ্ছি আমি শান্তা মারিয়া। আবার কথা হবে আগামি সপ্তাহে। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। চাই চিয়েন।

সার্বিক সম্পাদনা : ইয়ু কুয়াং ইউয়ে আনন্দী

লেখা, গ্রন্থনা ও উপস্থাপনা: শান্তা মারিয়া

অডিও সম্পাদনা: হোসনে মোবারক সৌরভ