সাধারণ ঝাড়ুদারের অসাধারণ গল্প
2022-08-17 16:54:30

বন্ধুরা, ঝাড়ুদারের কথা উল্লেখ করলে আপনার কি মনে হয়? খুবই সাধারণ পদে কাজ করা সাধারণ কোনো মানুষ, তাই না? তবে, সম্প্রতি চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বিশেষ করে চীনের ‘হুয়াংশান পাহাড় দর্শনীয় স্থানের’ সাধারণ দু’জন ঝাড়ুদারের প্রশংসা করেছেন এবং তাঁদেরকে চিঠি লিখেছেন। কেমন ঝাড়ুদার তাঁরা- যাঁরা একটি দেশের শীর্ষনেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করেতে পেরেছেন? তাঁরা নিজের পদে কীভাবে কাজ করেছেন? আজ তাঁদের গল্প জানাবো।

 

চীনের হুয়াং শা পাহাড় দর্শনীয় স্থান চীনের সেরা দশটি দর্শনীয় স্থানের অন্যতম। যা বিশ্ব সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার তালিকায় স্থান পেয়েছে। এর উচ্চতা প্রায় ২ হাজার মিটার। এমন উঁচু পাহাড়ের পরিবেশ পরিষ্কার করা অনেক কঠিন কাজ এবং ঝুঁকিপূর্ণ। তবে সেখানের কর্মী লি ভেই শেং এবং হু সিয়াও ছুন ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই কঠিন কাজ করে আসছেন। তাঁরা ২০১২ ও ২০২১ সালে ‘চীনের ভালো ব্যক্তির’ মর্যাদা পেয়েছেন।

খাড়া উঁচু পাহাড়ের পাশে দড়ি ঝুলিয়ে নিজের কোমরে বেঁধে লি ভেং শেং খাড়া উঁচু পাহাড়ের কাজ করতে যান। এই কাজ কর্মী লি প্রতিদিন চার/পাঁচ বার করেন। দেখতে সহজ, তবে আসলে অনেক বিপজ্জনক। ২৩ বছর ধরে তিনি এই কাজ করে যাচ্ছেন। চলতি বছর হল হুয়াং শান পাহাড় দর্শনীয় স্থানে লি’র কাজের ২৫তম বছর। শুরুতে তিনি টিকিট চেক করতেন। পরে পাহাড়ের সড়ক পরিষ্কার করতেন। ১৯৯৯ সালের জুন মাসে লি ভেই শেং দড়ি দলে যোগ দেন। এখন তিনি হুয়াংশান পাহাড় দর্শনীয় স্থানের পরিবেশ সংরক্ষণ বিভাগের একজন কর্মী।

 

দড়ি-দল পরিবেশ সংরক্ষণ বিভাগের একটি বিশেষ পদ। দলের কর্মীরা খাড়া উঁচু পাহাড়ে আবর্জনা ও প্লাস্টিকের ব্যাগ কুড়ান। এই কাজ অনেক কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। এই কাজে সাহস, বিশেষ প্রযুক্তি ও শক্তিশালী শারীরিক অবস্থার প্রয়োজন।

লি বলেন, তিনি ছোটবেলায় নদীর তীরে বড় হয়েছেন। তাই প্রথমবার দড়িতে খাঁড়া উঁচু পাহাড়ে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকা তার কাছে অনেক ভয়ঙ্কর ব্যাপার ছিল। পাহাড়টি যেন বিশ তলা ভবনের মত উঁচু। কঠোর পেশাদার প্রশিক্ষণ এবং দীর্ঘসময় চর্চার পর এখন লি এই কাজ খুব ভালোভাবে করতে পারেন। একটি দড়ির মাধ্যমে তিনি ইচ্ছামতো খাড়া উঁচু পাহাড়ে মুভ করতে পারেন।

২৩ বছর ধরে এই কাজের কারণে লি মোট ১৮০০ কিলোমিটার উচ্চতায় কাজ করেছেন, যা ২শ’ টি এভারেস্ট পর্বতারোহণের সমান।

 

এত বছরে দড়িতে ঝুলে কাজ করার অনুভূতি কেমন, আকাশে ঝুলানো অবস্থায় আবর্জনা কুড়াতে বেশ ভয় লাগে। এক মাসে শুধু একবার বাসায় যেতে পারি। এই কাজ থেকে চলে যেতে চান কি? এমন প্রশ্ন বার বার তাঁকে জিজ্ঞাস করা হতো। তবে ২৩ বছর আগে হোক, বর্তমানে হোক, তাঁর উত্তর একই ছিল। বিভিন্ন কাজে বিভিন্ন মানুষের প্রয়োজন। এই কাজ আমি না করলে অন্যকে করতে হবে।

প্রত্যেকবার দড়িতে আবর্জনা কুড়ানো শেষে ফিরে এসে পর্যটকরা হাততালি দিয়ে প্রশংসা করেন, এমন অনুভূতি খুব ভালো লাগে। লি বলেন, বিশেষ করে তাঁদের পরিশ্রম দেখে অনেক মানুষ নিজের শিশুকে যেখানে সেখানে আবর্জনা না-ফেলার কথা বলেন, তা দেখে তাঁর অনেক ভালো লাগছে।

চলতি বছর লি-এর বয়স ৪৯ বছর হয়েছে। তিনি হলেন হুয়াংশা পাহাড় দর্শনীয় স্থানের বয়স্ক এবং প্রবীণ দড়ি কর্মীর অন্যতম। তবে তাঁর মনে দৃঢ় সংকল্প থাকে: শারীরিক অবস্থা ভালো থাকলে তিনি এই পদে থাকবেন। নিজের চেষ্টায় দর্শনীয় স্থানের পরিবেশ রক্ষা করবেন।

২৩ বছর ধরে খাড়া উঁচু পাহাড়ে ঝুলে কাজ করা, ২৩ বছরের চেষ্টা। লি-এর অবদান অসংখ্য মানুষের প্রশংসা পেয়েছে। ২০১২ সালে লি ‘চীনের ভালো ব্যক্তি’র মর্যাদা পেয়েছেন। গত ১৩ অগাস্ট লি প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং-এর ফেরত চিঠি পান, তাঁর চোখে এটি মহান এক উত্সাহ। যা সব হুয়াংশা মানুষের জন্যই।

জানা গেছে, হুয়াংশা পাহাড়ের দর্শনীয় স্থানে লি-এর মত দড়ি কর্মীর সংখ্যা ১৮ জন। তাঁরা কাঁধে দড়ি, খাড়া উঁচু পাহাড়ের মধ্যে প্রাকৃতিক পরিবেশের রক্ষা করছেন। তাঁদের মতে, সবুজ পাহাড় রক্ষা করাই তাঁদের বৃহত্তম লক্ষ্য।

একই সঙ্গে হুয়াংশান পাহাড় দর্শনীয় স্থানের আরেকজন কর্মী হু সিয়াও ছুন প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং-এর চিঠিও পেয়েছেন। তিনি সেখানের ১৯তম দফায় পাইন গাছ রক্ষাকারী। কেন পাইন গাছগুলো রক্ষা করতে হয়? এই পাইন গাছ হুয়াংশান দর্শনীয় স্থানের প্রতীক। যা খাঁড়া উঁচু পাহাড়ে চাষ করা হয়েছে। এর বয়স ১৩০০ বছরেরও বেশি। দেখতে যেন পাহাড়ের একটি বাহু’র মত হাতছানি দিয়ে পর্যটকদের স্বাগত জানাচ্ছে। এই পাইন গাছ রক্ষা করার কাজ জোরদার করার জন্য ১৯৮১ সালে হুয়াংশান পাহাড়ে পাইনগাছ রক্ষার ব্যবস্থা স্থাপিত হয়। বিশেষ করে একজন ২৪ ঘণ্টা করে গাছ রক্ষা করবে।

২০০৬ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর হু সিয়াও ছুন হুয়াংশান পাহাড়ের একজন আগুন প্রতিরোধক কর্মী হন। ২০১০ সালে বার বার নির্বাচনের পর তিনি অষ্টাদশ মেয়াদের পাইনগাছ রক্ষাকারী সুই তুং মিং-এর শিষ্য হন। ২০১১ সালের জুন মাসে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ওস্তাদের হাত থেকে দূরবীক্ষণ যন্ত্র এবং আতশকাচ গ্রহণ করে ১৯ মেয়াদের পাইনগাছ রক্ষাকারী হয়েছেন।

 

হু বলেন, তাঁর কাছে পাইনগাছ শুধু গাছই নয়, এগুলো রক্ষা করা যেন নিজের পরিবারের সদস্যদের রক্ষা করার মতই। ১২ বছর কাজের মাধ্যমে তিনি এই পাইন গাছ এবং হুয়াংশা পাহাড়ের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। সেনা সদস্য থেকে অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ কর্মী হয়েছেন। আবার তিনি পাইনগাছ রক্ষাকারী হয়েছেন। কাজ পরিবর্তন হয়েছে, তবে কর্তব্য এবং দায়িত্ব পরিবর্তন হয় নি।

এক বছরে হু তিনশ’ দিন ধরে পাহাড়ে থাকেন। দিন রাত পাইনগাছের সঙ্গে থাকেন। ১৪ বর্গমিটারের কক্ষে একটি সহজ বিছানা, একটি টেবিল ও চেয়ার। একটি মনিটরিং কম্পিউটার এবং কিছু যন্ত্র—এটাই হল পাহাড়ে তাঁর সবকিছু।

প্রতিদিন সকাল সাতটা থেকে হু পুরো দিনের টহল এবং পর্যবেক্ষণ শুরু করেন। পাইনগাছের খানিকটা পরিবর্তন হলেও তাঁর চোখে পড়ে। পাইনগাছের সাপোর্ট দেওয়ার ফ্রেম, বজ্রপাত প্রতিরোধ ব্যবস্থাসহ নানা অবস্থা যাচাই করেন। দিনের বেলায় প্রতি দুই ঘণ্টা পর একবার নিয়মিত গাছগুলো পরীক্ষা করেন তিনি। বজ্রপাত বা বৃষ্টি থাকলে প্রতি আধা ঘণ্টায় এবার চেক করতে হয়। রাতে ইনফ্রারেড এলার্ম সিস্টেম চালু করতে হয়।

তিনি বলেন, কোনো পরিবর্তন না-করলে সবচেয়ে ভালো হয়। টহলের ফলাফল স্বাভাবিক থাকা মানে তাঁর রক্ষা কার্যকর হয়।

প্রত্যেক বার টহলের কাজ শেষ করে হু নিজের ছোট কক্ষে ফিরে ‘পাইনগাছ জার্নালে’ বিস্তারিতভাবে গাছ সম্পর্কিত সূচক লিখে রাখেন। তা ছাড়া এদিন তাপমাত্রা, বায়ু ও আর্দ্রতাসহ বিভিন্ন তথ্য রেকর্ড করেন। ১২ বছরে তিনি ৭০টিরও বেশি জার্নাল লিখেছেন, মোট অক্ষর ১৪ লাখেরও বেশি। দীর্ঘ সময় কাজ করার কারণে তিনি যেন বন বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছেন।

প্রচুর বাতাসের দিনে কীভাবে গাছ রক্ষা করে, ঝড় বৃষ্টির পর কীভাবে ভূমিক্ষয় এড়ানো যায়, ঋতু পরিবর্তনের সময় কী কী ব্যবস্থা নিতে হয়। এসব সমস্যা কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, জনাব হু এর সব জানেন।

একজন মানুষ, একটি গাছ, সত্যি অনেক বিরক্তিকর জীবন। শুরুর প্রথম দুই বছরে তাঁর সত্যি চাকরি পরিবর্তনের কথা বিবেচনা করা হল। হু বলেন, দিনের বেলা পাহাড়ে মানুষের ভিড় থাকে, তবে রাতে অনেক একাকী লাগে তাঁর। শান্ত হলে শুধু ঘাসের শব্দ শোনা যায়। তবে পরিবারের সমর্থন ও উত্সাহে তিনি এখন পর্যন্ত জিদ ধরে টিকে আছেন।

 

তাঁদেরকে দেওয়া জবাবি চিঠিতে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বলেছিলেন, আপনারা বহু বছর ধরে পাহাড়ের মধ্যে পরিবেশ সংরক্ষণ করছেন। দিনের পর দিন ধরে হাজার বছরের পুরানো পাইনগাছের বন রক্ষা করেছেন। আপনারা মন দিয়ে ভালোবাসা দিয়ে সুন্দর হুয়াংশা পাহাড় রক্ষা করেছেন, যা আপনাদের একনিষ্ঠ চেতনার প্রতিফলন।

 

‘চীনের ভালো ব্যক্তির’ সবচেয়ে মূল্যবান চেতনা হলো সাধারণ পদে থেকে অসাধারণ সফলতার দৃষ্টান্ত তৈরি করা।

যা ঠিক চীনের নেটিজেনদের কথা মতো, তাঁরাই হলেন আমাদের পাশে থাকা বীর, যাঁরা যুগের স্তম্ভ।