নতুন প্রমাণের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ফোর্ট ডেট্রিকে তদন্ত করতে দেওয়া
2021-08-16 15:39:25

সবাই জানে যে, সারা বিশ্ব কোভিড-১৯ প্রতিরোধের চেষ্টা চালানোর সময় কিছু মার্কিন রাজনীতিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব চীনের বিরুদ্ধে দোষারোপ করেছে এবং চীনকে অপমান করেছে। তারা আবার ‘উহানের ল্যাব থেকে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার’ অপপ্রচারও চালিয়েছে। মার্কিন সরকার করোনার উত্স অনুসন্ধানে সন্ত্রাসী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে গোয়েন্দা সংস্থাকে ৯০ দিনের মধ্যে চীনে করোনার উত্স অনুসন্ধান করার নির্দেশ দেয়; যাতে চীনকে মহামারির জন্য দায়ী বানানো যায়। অন্য দেশকে দোষারোপের লক্ষ্যে অনেক দূরে এগিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে অন্যদের দোষ দিয়ে ও অপমান করে নিজের ভুল দূর করা যায় না। এখন প্রশ্ন হলো- যুক্তরাষ্ট্রে কখন কোভিড-১৯ মহামারির প্রাদুর্ভাব শুরু হয়? করোনার উৎসের সঙ্গে মার্কিন জৈব গবেষণাগারের সম্পর্ক কি? এ বিষয়ে সম্প্রতি বেশ কিছু নতুন প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সন্দেহ অনেক বেড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত অন্যদের দোষারোপ বন্ধ করা এবং সমতাভিত্তিক দাবি মেটাতে ফোর্ট ডেট্রিকে আন্তর্জাতিক সংস্থাকে তদন্ত করার অনুমোদন দেওয়া।

 

অনেক তথ্য উপাত্ত প্রমাণ করে যে,  মার্কিন ফোর্ট ডেট্রিক জৈব গবেষণাগারে করোনাভাইরাসের উত্স অনুসন্ধানের গবেষণা করা খুবই জরুরি একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি আমেরিকান ন্যাশনাল ওয়াইল্ডলাইফ সেন্টারের গবেষকরা দেশটির প্রাণিগুলোর করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সময় উদ্ধার করতে পেরেছেন; সে সময়টি হলো ২০১৯ সাল। বিশ্বের অন্যতম বিজ্ঞান ম্যাগাজিন— ন্যাচারে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাদা লেজের হরিণগুলো থেকে নেওয়া রক্তের নমুনা পরীক্ষা করে করোনার এন্টিবডি পাওয়া গেছে। ফোর্ট ডেট্রিক রাজ্যের সাদা লেজের হরিণের নমুনা গ্রহণ করা হয় নি। তাই সেখানকার হরিণগুলো করোনায় আক্রান্ত হয়েছে কিনা, তা জানায়নি গবেষকরা। তবে আক্রান্ত সাদা লেজের হরিণ আমেরিকার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পাওয়া গেছে; যা ফোর্ট ডেট্রিকের বেশ কাছাকাছি। কানাডার  সাসকাচেওয়ান (Saskatchewan) বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরাবোলজিস্ট আরিনজাই বানার্জি বলেছেন, সাদা লেজের হরিণগুলো সম্ভবত মানুষ, অন্য পশু-পাখি বা দূষিত পানি থেকে করোনায় আক্রান্ত হয়েছে।

 

ঠিক সে সময়, ২০১৯ সালের জুন মাসে মার্কিন রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র (সিডিসি) ফোর্ট ডেট্রিক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর সময় দুটি ‘লিক’ হওয়ার ঘটনা টের পায়। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে গবেষণাগারের দূষিত পানি সংশোধনের সমস্যার কথা বলে, ফোর্ট ডেট্রিক জৈব গবেষণাগার সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় সিডিসি। এরপরই ফোর্ট ডেট্রিকের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী লোকজন মারাত্মক ধরনের অজানা ফুসফুস-জনিত রোগে আক্রান্ত হয়। সে রোগের কারণে ২ কোটি ৮৯ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয় এবং ৬০ হাজার অধিবাসী প্রাণ হারায়। তবে, যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে নি। আরও আশ্চর্যজনক প্রমাণ পাওয়া গেছে। তা হলো- সম্প্রতি এক হাজারেরও বেশি আমেরিকান টুইটারে বলেছেন, তারা নিজেরা বা পরিবারের অন্য সদস্য ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে নভেল করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ১০০জন প্রকৃত-নাম ব্যবহারকারী সংক্রমণের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। তাদের সংক্রমণের লক্ষণ কোভিড-১৯ রোগের লক্ষণের সঙ্গে মিলে যায়।

 

এক মার্কিন গণমাধ্যম (wn.com) সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০১৯ সালে মার্কিন সেনারা ‘এএসবিপি’ প্রকল্পের মাধ্যমে নভেল করোনাভাইরাস ইউরোপে নিয়ে যায়। ইতালিতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে সেনাদের মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শ দেওয়া স্বেচ্ছাসেবকরা সম্ভবত প্রথমেই কোভিড-১৯ মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। ‘এএসবিপি’ প্রকল্পের নামটি হলো- সশস্ত্র বাহিনী রক্ত ​​প্রকল্প। ফোর্ট ডেট্রিকে এ প্রকল্পের রক্ত সংগ্রহ করা হতো। মার্কিন সেনাদের রক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা এ প্রকল্পের লক্ষ্য। রক্তের কোল্ড চেইন প্যাকিং করা হয়। প্রতি দু’সপ্তাহে ইতালি ও ইংল্যান্ডে মার্কিন বিমানবাহিনীর ঘাঁটিতে পাঠানো হয় এসব ফ্রোজেন ব্লাড। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কোনো একবার ‘জীবাণু ফাঁসের’ দুর্ঘটনা ঘটায়, ভাইরাস ইতালিসহ কিছু দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এর আগে ইতালির মিলানো ক্যান্সার গবেষণাকেন্দ্র প্রমাণ করে যে, কোভিড-১৯ সম্ভবত ২০১৯ সালের অক্টোবরেই দেশটিতে ছড়িয়ে পড়েছিল।

 

বিখ্যাত বিজ্ঞানী গ্যালিলিও’র বৈজ্ঞানিক তত্ত্বে বলা হয়, বাস্তবতা থেকে যে তথ্য লাভ করা যায়, সেটিই হলো বিজ্ঞান।  করোনাভাইরাসের উত্স অনুসন্ধানকাজেও বিজ্ঞানকে সম্মান করতে হয়। এতো বেশি ঘটনার সঙ্গে ফোর্ট ডেট্রিকের যোগসূত্র খুঁজে পাওয়ার পর করোনাভাইরাসের উত্স অনুসন্ধানে সেখানে তদন্ত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে সবাই মনে করছে।

(রুবি/তৌহিদ)