অলিম্পিক গল্প: জীবন তার নিজস্ব গতিতে চলবে...
2021-08-10 14:35:00

গত ২৪ জুলাই টোকিও অলিম্পিক গেমসের উদ্বোধনী দিনে ৩৪ বছর বয়সী চীনা খেলোয়াড় উ চিং ইউ অলিম্পিক গেমসের মাঠে ফিরেন। বিশ্বের কুন ডু ইতিহাসে তিনি হচ্ছেন প্রথম নারী খেলোয়াড়- যিনি টানা চার বার অলিম্পিক গেমসে অংশগ্রহণ করেছেন। এ ছাড়াও তিনি একজন মা। বন্ধুরা, আজ আমরা তার গল্প শুনব, কেমন?

২০১৭ সালের ২৫ জুলাই। গ্রীষ্মকালের সে দিনটিতে বেইজিংয়ে  অনেক গরম পড়েছিল। এমন সময় হাসপাতালে একজন নারী বিছানায় শুয়ে আছেন। অনেক কষ্টকর অবস্থায় রয়েছেন তিনি। পাশে একজন পুরুষ তাঁর হাত ধরে আছেন। নারীটি তাঁকে বলেন: “তুমি আবার ডাক্তার সাহেবকে জিজ্ঞেস করবে আমার বাচ্চা প্রসব কখন হবে? আমি আর সহ্য করতে পারছি না।” 

পুরুষটি দৌড়ে ডাক্তারের কাছে যান। একটু পর ডাক্তার নারীটির কাছে ছুটে আসেন। তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলেন, ম্যাডাম, সময় হয়নি, আরো সময় লাগবে। 

তিনি পুরুষটিকে বলেন, “আপনার স্ত্রী হলেন খেলোয়াড়, এজন্য তাঁর শরীর সাধারণ মানুষের চেয়ে ভিন্ন, এ কারণে তাঁর বাচ্চা প্রসব প্রক্রিয়া বেশি কষ্টকর। আপনি তাঁকে শান্তনা দিন, কেমন?”

অনেক যন্ত্রনার পর এই নারী একটি মেয়ে শিশু জন্ম দেন। নারীটি আর কেউ নন, তিনি হলেন উ চিং ইউ। 

উ চিন ইউ চীনের দক্ষিণাঞ্চলের চিয়ান সি প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ২০০৮ ও ২০১২ সালে দুবার গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক গেমসে স্বর্ণপদক অর্জন করেন। 

সময় নদীর স্রোতের মত বয়ে চলে। ২০১৬ সালের গ্রীষ্মকালীন রিও অলিম্পিক গেমসেও উ চিন ইউ তৃতীয়বারের মত অংশগ্রহন করেন। সেবার তাঁকে অনেকে সমর্থন দেন। সবাই আশা করেছিলেন, তিনি তৃতীয়বারও স্বর্ণপদক জয় করবেন। এটি তাঁকে অত্যন্ত চাঁপে ফেলে। ফলে তিনি ব্যর্থ হন। 

তার পর ২০১৭ সালের জুলাই মাসে অনেক কষ্টের পর উ চিন ইউ তাঁর মেয়ের জন্ম দেন। এরপর ছয় মাস তিনি তাঁর পরিবারকে সময় দেন। 

তাঁর স্বামী এক দিন আবিষ্কার করেন, উ চিন ইউ মাঝে মাঝে তাঁর খেলোয়াড় জীবনের ছবি দেখছেন। তাঁর আগের অর্জিত পদকসমূহকে স্পর্ষ করছেন। সে দিন সন্ধ্যায় মেয়ে ঘুমানোর পর, তাঁর স্বামী তাঁকে বলেন, “তুমি যদি প্রশিক্ষণে ফিরে যেতে চাও, আমি বিরোধিতা করব না।” একথা শুনে উ চিন ইউ’র চোখে পানি চলে আসে। 

২০১৮ সালের বসন্ত উত্সবে  তাঁর স্বামী তাঁর মেয়েকে নিয়ে সান তোং প্রদেশে তাঁর জন্মস্থানে ফিরে যান। উ চিন ইউ চীনের জাতীয় কুন ডু দলের প্রশিক্ষন স্টেডিয়ামে গিয়ে আবারও  প্রশিক্ষণ শুরু করেন। তিনি তাঁর সব শক্তি উজাড় করে দিয়ে প্রশিক্ষণ নিতে থাকেন। সাধারণ প্রশিক্ষণ কোর্স ছাড়াও প্রতিদিন তিনি অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ নিতেন। প্রতি রাতে স্টেডিয়ামের আলো বন্ধ হওয়া পর্যন্ত তিনি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতেন। 

গত ২৪ জুলাই টোকিও অলিম্পিক গেমসের প্রথম প্রতিযোগিতার দিনে তিনি আবারও মাঠে নামেন। বিশ্বের কুন ডু ইতিহাসে তিনি প্রথম নারী খেলোয়াড় হিসেবে একটানা চার বার অলিম্পিক গেমসে অংশগ্রহণ করে রেকর্ড গড়েন। কিন্তু নিয়তি এবারও তাঁকে সঙ্গ দেয়নি। তাই তিনি আবারও ব্যার্থ হন। 

খেলা শেষে কয়েক ঘন্টা সময়ের মধ্যেই তিনি স্বাভাবিক হয়ে ওঠেন। তারপর তিনি তাঁর পরিবারকে ফোন দেন। তার মেয়ে জানায়, “আম্মু আমি তোমাকে অনেক মিস করছি, তুমি তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে, কেমন?”

২৪ জুলাই গভীর রাতে তিনি লিখেন: “রাত অনেক দীর্ঘ, দুধ অনেক মিস্টি। যদি একটি পদক অর্জন করতে পারতাম, তা অনেক সুন্দর হতো । কিন্তু জীবন তো এমনই, এত বেশি পারফেক্ট না। এখন থেকে আবারও ভবিষ্যতের পথ পরিকল্পনা করতে হবে। অন্য একটি ভূমিকায় আবার দেশ, কুন ডু ও পরিবারের জন্য প্রচেষ্টা চালাব। জীবন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।”
(আকাশ/এনাম/রুবি)