সাজিদ রাজু, ঢাকা:
“আমরা রোগীদের থেকে যেসব অভিযোগ পাই, তার মধ্যে অন্যতম হলো ডাক্তাররা কম সময় দেয়। আবার হাসপাতালগুলোতে সব টেস্টের ব্যবস্থা নাই। সেক্ষেত্রে আমরা চাই যে সরকারি হাসপাতালে সব ধরনের টেস্টের ব্যবস্থা করা হোক। দক্ষ লোক নিয়োগ দেয়া হোক।“
এভাবেই নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিচ্ছিলেন রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী রুহুল আমীন। সরাসরি শিক্ষার্থী হওয়ায় হাসপাতালগুলোতে রোগী চাপ আর নানা সংকটে ডাক্তার ও স্বাস্থ্যসেবাদানকারী কর্মীদের নাস্তানাবুদ হওয়ার এমন চিত্র দেখেন প্রতিনিয়ত।
মোঃ রুহুল আমিন
তার মতে আসছে বাজেটে স্বাস্থ্যখাত নিয়ে থাকতে হবে এ থেকে উত্তরণের পথ-পরিকল্পনা। বলছিলেন, এমন বাজেট চান যেন মানব সেবার যে অদম্য স্পৃহা নিয়ে তারা এসেছেন সেই স্বপ্ন ও প্রত্যাশা যেন পূরণের সুযোগ মেলে।
“স্বাস্থ্যখাতের বাজেটটা হোক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রীক। আমাদের ডাক্তার সংখ্যা বাড়াতে হবে। যদি ডাক্তারের সংখ্যা বাড়াই তাহলে তাহলেই কিন্তু আমরা রোগীকে বেশি মনোযোগ দিয়ে দেখতে পারবো, তাদেরকে বেশি সময় দিতে পারবো এবং রোগীরাও একটা সন্তুষ্টি পাবে।”
কথা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজের মাস্টার্স পর্যায়ের শিক্ষার্থী ডা. আনিকা তাসনিয়ার সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, স্বাস্থ্যসেবায় প্রত্যাশার তুলনায় সংকট সব সময়ের সঙ্গী। বিশেষ করে করোনাকালে নানা সীমাবদ্ধতা পিছু ছাড়ছে না। বাজেটে বরাদ্দ এমনভাবে থাকা উচিত যেন এসব সংকটের দ্রুত সমাধান করা যায়। পাশাপাশি তৃণমূলের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে রেফারেল ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রতিও নজর দেয়া উচিত বলে মত তার।
“ব্যবস্থাপনায় আসলেপরিবর্তন আনা উচিত। এমবিবিএস ডাক্তারের কাছে রোগীরা যাবে। সে রেফার করবে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে। প্রাথমিক যে চিকিৎসাগুলো সে দেবে। পরবর্তীতে যদি জটিল কোন রোগী আসে তাদেরকে সে রেফার করবে নির্দিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে।“
ডা. আনিকা তাসনিয়া
এই রেফারেল ব্যবস্থাপনার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে এর যৌক্তিকতা তুলে ধরেন দীর্ঘদিন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে কাজ করা সহকারী অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লহেল কাফী। মেডিকেল শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা, এ দুয়ের সম্মিলিত পথচলায় কেমন সংকট চোখে পড়ে? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে বিকেন্দ্রীকরণ এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের রোগীদের সীমিত ব্যয়ের সামর্থকে গুরুত্ব দিয়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সেবার মান বাড়ানোর দিকে নজর দেয়া উচিত বলেও মনে করেন তিনি।
ডা. আব্দুল্লহেল কাফী বলেন, “বাজেটতো প্রতি বছরই বাড়ানো হয়। কিন্তু এর ব্যবহার গতানুগতিকই। ভৌত অবকাঠামো সব জায়গায় আছে কিন্তু রোগীদের সন্তুষ্টি নাই। দোরগোড়ায় স্বাস্থ্য সেবা আমরা নিয়ে গেছি ঠিক কিন্তু রোগীরা সন্তুষ্টি পাচ্ছে না। যে গ্রামের লোক, তার চিকিৎসা তার ভালো নিজ জেলা পর্যায়ে হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে আমি মনে করি জেলা পর্যায়ে যে হাসপাতালগুলো আছে সেগুলো যদি উন্নত করা যায় অথবা এখন যেসব মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আছে সেগুলোকে যদি উন্নত করা যায়, সেগুলোতে যদি নজর দেয়া যায় তাহলে স্বাস্থ্যখাতে একটা আমূল পরিবর্তন হবে।“
ডা. আব্দুল্লহেল কাফী
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্স এর সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. লিয়াকত আলীর মতে স্বাস্থ্যখাতের বিকেন্দ্রীকরণ না হলে এই অচলাবস্থা থামবে না।
অধ্যাপক ড. লিয়াকত আলী চীন আন্তর্জাতিক বেতারকে বলেন, “খরচের সক্ষমতা, ব্যবস্থাপনাগত সক্ষমতা সেদিকে গুরুত্ব দেয়া এবং সেক্ষেত্রে গতবছর থেকে স্বাস্থ্যখাতের যেসব দুর্বলতা চিহ্নিত হচ্ছে সেই বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দেয়া উচিত। জনশক্তির ক্ষেত্রে প্রচণ্ড দুর্বলতা রয়েছে। পরিচালনা ও নীতিগত বিশেষ করে মন্ত্রণালয় থেকে অধিদফতর, বিভাগ ও জেলা সব ক্ষেত্রেই আমাদের বিকেন্দ্রীকরণের দিকে যেতে হবে। একাজে এখনো কোন অগ্রগতি নেই।“
ড. লিয়াকত আলী
তারা বলছেন, শুধু বড় স্থাপনা বা রোগের চিকিৎসার দিকে মনোযোগ নয় বরং রোগ প্রতিরোধে ব্যয় বাড়াতে হবে অনেক গুণ। করোনা এ বিষয়টি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, জনগণকে সম্পৃক্ত করে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনা চালু না করলে ভবিষ্যতেও আলোর মুখ দেখবে না স্বাস্থ্য খাত।