

0528
|
বলা বাহুল্য, এটি পেইচিংয়ের প্রথম বইয়ের দোকান যেটি ২৪ ঘন্টা খোলা থেকে পাঠক-ক্রেতাদের সেবা দেওয়া শুরু করেছে। একজন পাঠক জানান, তিনি এমনিতেই দেরি করে ঘুমান। তাই রাত জেগে এই দোকানে বই পড়া তার পছন্দের কাজ।
লিউ মেং একজন ছাত্র এবং সান লিয়ান বই দোকানের নিয়মিত গ্রাহক। আগে তিনি এখানে দাঁড়িয়ে এক থেকে দুই ঘন্টা বই পড়তেন। কিন্তু এখন তিনি বসে বই পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন। তিনি বলেন, একজন তরুণ হিসেবে সারারাত এখানে থাকলেও কোনো অসুবিধা নেই।
রাতের জন্য দোকানে রয়েছে ৭ জন কর্মকর্তা ও ২ জন প্রহরী। ২৪ ঘন্টার সেবা চালু করার পর দোকানের কর্তৃপক্ষ ১৪ জন নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ করেছে।
গভীর রাতেও ক্রেতারা এখানে বই কিনতে আসতে পারেন এবং ২০ শতাংশ ছাড়ও পেতে পারেন। এখানে দ্বিতীয় তলায় রয়েছে একটি ক্যাফে এবং এ ক্যাফেটিও ২৪ ঘন্টা খোলা থাকে।
পেইচিংয়ের আগে তাইওয়ান ও সাংহাইতে চালু হয়েছিল ২৪ ঘন্টার বইয়ের দোকান। তাইওয়ানের ছেং পিন বই দোকান হংকংয়ে একটি ২৪ ঘন্টার শাখা খুলেছিল। কিন্তু গ্রাহক কম বলে সেটি রাতারাতি বন্ধ করে দিতে হয়। আসলে ইন্টারনেটের এই যুগে, সনাতন বইয়ের দোকানগুলোর টিকে থাকা আগের যে-কোনো সময় তুলনায় কঠিনতর হয়ে পড়েছে। এ পর্যন্ত এসে একটি প্রশ্ন উঠতে পারে: ২৪ ঘন্টার বইয়ের দোকানের প্রয়োজনীয়তা কী?
সান লিয়ান বই দোকানের প্রধান কর্মকর্তা লি সিন জানান, খরচের কথা বিবেচনা করে তারা ২৪ ঘন্টার বই দোকান খোলার ব্যাপারে দ্বিধা করছিলেন। তিনি বলেন, 'সস্তা বইয়ের দোকান চালু রাখা একটি চ্যালেঞ্জ। গত দশ-বারো বছরে আমাদের লোকসান হয়েছে দুই কোটি ২০ লাখ ইউয়ান। এবার সরকারের সহযোগিতায় আমরা অবশেষে এ ২৪ ঘন্টার বই দোকান খুলতে সক্ষম হয়েছি।'
চীনের সরকার সস্তা বইয়ের ৫৬টি দোকানের জন্য ৯ কোটি ইউয়ান বরাদ্দ দিয়েছে এবং সান লিয়ানসহ পেইচিংয়ের ৫টি বইয়ের দোকান এ বরাদ্দ থেকে অর্থ পেয়েছে। লি সিনের মতে, ২৪ ঘন্টার বই দোকানের প্রধান উদ্দেশ্য মুনাফা অর্জন করা নয়। তিনি বলেন, 'আমরা ভাবছি, সান লিয়ানের উদ্যোগে আরও বেশি বইয়ের দোকান নাগরিকদের জন্য বই পড়ার সহজ সুযোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে।'
সান লিয়ান বই দোকানের মহাব্যবস্থাপক ছাং চুও চেন জানালেন, রাতের পাঠকদের জন্য তারা বিশেষ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করে থাকেন। বিশেষ করে, শীতকালে পাঠকদের জন্য গরম কফি সরবরাহ করার কথা ভাবছেন তারা। তিনি বলেন, 'আমি মনে করি, বই মানুষের মনে উষ্ণতা ছড়িয়ে দেয়। শীতের রাতে পাঠকদের শরীরে উষ্ণতা ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের নেওয়া উচিত।'
আসলে সান লিয়ান বই দোকান ছাড়াও, ভবিষ্যতে আমরা পেইচিংয়ে আরেকটি ২৪ ঘন্টার বই দোকান দেখতে পাবো। পেইচিংয়ে প্রথম বেসরকারি ২৪ ঘন্টার বই দোকান-পো সু উ আগামী জুন মাসে উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। ১২০০ বর্গমিটার আয়তনের এ দোকান নির্মাণে পেইচিং চিং তিয়ান পো ওয়ে সাংস্কৃতিক কোম্পানি ৫০ লাখ ইউয়ান বিনিয়োগ করেছে। চিং তিয়ান পো ওয়ে সাংস্কৃতিক কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক ছেন লি মিং বলেন, 'পো সু উ শুধু একটি বইয়ের দোকান তা নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স। এখানে রয়েছে ক্যাফে, থিয়েটার এবং ডিজিটাল রিডিং জোন ইত্যাদি।'
আসলে আরো আগেই চিং তিয়ান পো ওয়ে সাংস্কৃতিক কোম্পানি ২৪ ঘন্টার বই দোকান চালু করতে চেয়েছিল। কিন্তু নানা কারণে এতদিন তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। গত বছরের নভেম্বর মাসে ছেন লি মিং এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। কারণ, তার মতে এখন একটি ২৪ ঘন্টার বইয়ের দোকান চালু করার উপযুক্ত সময়। তিনি মনে করেন, সাধারণ বই দোকানের সাথে ২৪ ঘন্টার বই দোকানের পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, ২৪ ঘন্টার দোকানে বিদ্যুত খরচ এবং কর্মী খরচ বেশি। তবে, পাশাপাশি এ কথাও সত্য যে, এ ধরনের বইয়ের দোকান অধিক পাঠককে আকৃষ্ট করতে সক্ষম এবং এতে বই কোম্পানির সুনাম বৃদ্ধি পায়।
ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সকল ভবিষ্যত সমস্যা মোকাবিলায় ছেন লি মিং প্রস্তুতি নিয়েছেন। আবহাওয়া খারাপ হলে যাতে পাঠকরা দোকানে আসতে আগ্রহ হারিয়ে না-ফেলেন, তার জন্য দোকানে একটি খাবার এলাকা রাখা হয়েছে। তা ছাড়া, এখানে সামান্য অর্থের বিনিময়ে পণ্ডিত ব্যক্তি ও লেখকদের লেকচার শোনার সুযোগও রাখা হয়েছে পাঠকদের জন্য।
চিং তিয়ান পো ওয়ে কোম্পানি নিজস্ব অর্থায়নেই ২৪ ঘন্টার বইয়ের দোকান চালু করতে যাচ্ছে। তবে, ভবিষ্যতের প্রয়োজনের কথা বিবেচনায় রেখে, কোম্পানিটি সরকারের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তার আবেদন করে রেখেছে।
৪ এপ্রিল থেকে ৮ মে পর্যন্ত সান লিয়ান বই দোকানের মোট আয় হয়েছে ২২ লাখ ৫০ হাজার ইউয়ান এবং এসময় রাতের বেলায় আয় হয়েছে ৮ লাখ ২০ হাজার ইউয়ান। অবশ্য পয়লা মে থেকে বিক্রির পরিমাণ কিছুটি হ্রাস পায়। এখানে শনি ও রোববারে পাঠক ও ক্রেতার সংখ্যা বেশি হয় এবং রাত ১০টার পর যেসব পাঠক এখানে আসেন তাদের অধিকাংশই যুবক।
২৪ ঘন্টার বই দোকান নিয়ে অবশ্য বিতর্ক রয়েছে। কেই কেউ মনে করেন, ২৪ ঘন্টা বইয়ের দোকান খোলা রাখা ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তিযুক্ত নয়। তাদের মতে, রাত ১২টার পর বইয়ের দোকান খোলা থাকার কোনো অর্থ নেই; কারণ, এসময় খরচ বেশি, কিন্তু গ্রাহক কম। তবে, অনেকেই ২৪ ঘন্টার বই দোকানের প্রতি তাদের সমর্থন জানিয়েছেন। মৌমাছি বই দোকানের প্রতিষ্ঠিতা ছাও ইয়ে হং মনে করেন, পেইচিংয়ের জন্য ২৪ ঘন্টার বই দোকান প্রয়োজনীয়। তিনি মনে করেন, যারা রাত জেগে দোকানে বই পড়েন, তাদের মধ্যে ভবিষ্যতে একজন শিক্ষকে পরিণত হলেও একটা কাজের কাজ হবে। তার বিশ্বাস, বইয়ের দোকানে সংস্কৃতি, শিল্প ও আত্মার খোরাক পাওয়া গেলে, ২৪ ঘন্টার দোকান ভালোই চলবে।




