Web bengali.cri.cn   
বাংলাদেশের নিজস্ব উন্নয়ন-সামর্থ্য বৃদ্ধি করাই চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতার উদ্দেশ্য
  2013-01-08 19:41:41  cri

বাংলাদেশ হচ্ছে চীনের প্রতিবেশী এবং দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা দিন দিন বৃদ্ধি পাছে এবং দু'দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক নতুন মাত্রা সৃষ্টি করছে। সম্প্রতি বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত লি চুন চীন আন্তর্জাতিক বেতারের সংবাদদাতাকে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাত্কারে জোর দিয়ে বলেছেন, চীন বাংলাদেশের সঙ্গে চলমান দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতাগুলো প্রধানত সেই দেশের উন্নয়নের সামর্থ্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে পরিচালনা করছে। বাংলাদেশের আধুনিক প্রযুক্তি আর চীনসহ অন্যান্য দেশের উন্নয়ন-অভিজ্ঞতা প্রয়োগ করে দ্রুত উন্নয়ন বাস্তবায়ন করতে পারে। চীনের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো এর জন্য ইতিবাচক সহযোগিতা প্রদান করবে। এখন শুনুন এ সম্পর্কে এক সাক্ষাত্কার ভিত্তিক প্রতিবেদন।

রাষ্ট্রদূত লি চুন প্রথম বারের মত বাংলাদেশে কাজ শুরু করেন। বাংলাদেশে যাওয়ার আগে তিনি এ দেশের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা সম্পর্কিত অনেক গবেষণামূলক রিপোর্ট, চীন ও বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়ন সংক্রান্ত গ্রণ্থ এবং সাবেক রাষ্ট্রদূতগণের লেখা প্রতিবেদনগুলো পড়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তিনি বলেন, "বাংলাদেশ হচ্ছে একটি সম্ভাবময় দেশ। তার সুদীর্ঘ ইতিহাস আছে। চীন ও বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ আদানপ্রদানের ইতিহাস দীর্ঘকালের। বাস্তব উন্নয়নের ক্ষেত্রেও রয়েছে আমাদের অনেক উল্লেখযোগ্য অবদান। ঐতিহাসিক সূত্রে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে কোনো বিবাদমান সমস্যা নেই এবং বর্তমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মাঝেও কোনো সংকট ও সীমাবদ্ধতা নেই। ফলে দু'দেশের পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ অত্যন্ত ভালো। চীন ও বাংলাদেশের উন্নয়নে রয়েছে নিজ নিজ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। উভয়ের এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র সমূহ বিবেচনায় নিয়ে দু'দেশের জনগণের জন্য দ্রুত কল্যাণ বয়ে আনা সম্ভব। যা দু'দেশের উন্নয়নে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে। আমার কর্তব্য হচ্ছে সহযোগিতার এই অপার সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপান্তর করা।"

বাংলাদেশ ও চীন উভয়ে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে। বাংলাদেশ কৃষি ভিত্তিক সমাজ কাঠামোর সাথে শিল্পায়ন সমন্বয় করা, ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে মধ্যম আয়ের একটি দেশে পরিণত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ১৮তম জাতীয় কংগ্রেস ২০২০ সাল নাগাদ অর্জিত জিডিপি আর শহর ও গ্রামাঞ্চলের অধিবাসীদের মাথাপিছু আয় ২০১০ সালের চেয়ে দ্বিগুণ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। উভয় দেশের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা দু'দেশের মধ্যে সহযোগিতা ও সম্ভাবনার নতুন যুগের সূচনা করেছে।

গত কয়েক বছর বিশ্ব অর্থনীতিতে তীব্র সংকট দেখা গেলেও চীন ও বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার প্রতি বছর ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। এ থেকে প্রতিয়মান হয়েছে যে, দু'দেশের পারস্পরিক উন্নয়ন ও অগ্রগতি উর্ধ্বমুখী এবং একে অন্যের পরিপূরক। তবে এর পাশাপাশি চীন ও বাংলাদেশের মধ্যকার বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণও কম নয়। রাষ্ট্রদূত লি চুন আশা করেন, "বাণিজ্যের টেকসই উন্নয়ন করতে হলে অগ্রসর করার দিকে থেকে, চীনের আরো বেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করা প্রয়োজন এবং এই সকল শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উত্পাদিত পণ্যগুলো স্থানীয় বাজারে সরবরাহ করার পাশাপাশি তা চীনে রপ্তানিও করতে পারে। এটা চীন ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে ভারসাম্য তৈরী করার জন্য সহায়ক হবে। এটা হচ্ছে দু'পক্ষের কল্যাণমূলক কাজ।"

বাংলাদেশে চীনের দূতাবাস সবসময় দু'দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতাকে দ্রুত ও সহজ করার ক্ষেত্রে আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে। রাষ্ট্রদূত লি বলেন, "চীনের শ্রম ঘন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিদেশে বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা ক্রমাগতবৃদ্ধি পাছে। আমি মনে করি, বাংলাদেশ হচ্ছে চীনের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের উপযুক্ত স্থান। বাংলাদেশ চীনের বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য নানান উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এবং সংশ্লিষ্ট নীতিমালা প্রকাশ করেছে। এ সব নীতিমালা এবং উদ্যোগ সমূহকে আরো বেশি চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে জানানো আমাদের দূতাবাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য বলে মনে করি। আর এই কাজটি আমাদের দূতাবাসের ওয়েবসাইট আর অর্থনীতি বিষয়ক কাউন্সিলের ওয়েবসাইট অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এ সব নীতিমালার ব্যাপক প্রচার করে আসছে।"

জানা গেছে, চীনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশের সময় নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। প্রথমত, বাংলাদেশে বিদ্যুত্ সরবরাহের ঘাটতি সমস্যা। দ্বিতীয়, বাংলাদেশে জমি অধিগ্রহণ ও সরবরাহ অপেক্ষাকৃত সীমিত। কিন্তু এ সত্ত্বেও চীনা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো আরো অধিক হারে এবং সুষ্ঠুভাবে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা করতে পারে তার জন্য চীনা দূতাবাস সক্রিয় প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

রাষ্ট্রদূত লি জানিয়েছেন, "চীনের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলাদেশে স্থায়ী শিল্পায়ন এবং এর বিস্তার করার উদ্দেশ্যে আমরা এক চীনা শিল্প উদ্যান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। এই ধারণাটি প্রস্তাব আকারে পেশ করা হয়েছে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে বহুবার আলোচনা করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ইতিবাচক সাড়াও প্রদান করেছে। দ্রুত ও নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি। এখনো বাংলাদেশের একটি বড় সমস্যা। ফলে শিল্প উদ্যানের স্থান বাছাই করা এবং নিজস্ব বিদ্যুত্ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিরাজমান সমস্যার সমাধান করা হবে। সম্ভব হলে বাংলাদেশে দীর্ঘস্থায়ী শিল্প উদ্যানের বিকাশের পথ সহজ হবে।"

২০১২ সালে চীন ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার ধারাবাহিকতায় প্রভূত অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। রাষ্ট্রদূত লি জোর দিয়ে বলেন, চীন আর বাংলাদেশের সহযোগিতা প্রধানত সে দেশের উন্নয়নে নিজস্ব সামর্থ্য বৃদ্ধির ওপর কেন্দ্র করে। যেমন, চীনের পুরো সেট সরঞ্জাম আমদানি ও রপ্তানি লিমিটেড কোম্পানির নির্মিত বাংলাদেশের শাহজালাল রাসায়নিক সার কারখানা প্রকল্প গত বছরের ২৪ মার্চ বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে শুরু হয়েছে। এ প্রকল্পের চুক্তির মূল্য ৬০ কোটি মার্কিন ডলার। এটা হচ্ছে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত চীনা কোম্পানি স্বাক্ষরিত সর্ববৃহত্ চুক্তি। রাষ্ট্রদূত লি বলেন, "বাংলাদেশ হচ্ছে একটি কৃষি প্রধান দেশ। রাসায়নিক সারের উত্পাদন সে দেশের কৃষির বিস্তার ও উত্পাদন বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শাহজালাল রাসায়নিক সার কারখানার নির্মাণ বাংলাদেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ তাত্পর্য রয়েছে। কেননা চীন ও বাংলাদেশের মধ্যকার বৃহত্তম সহযোগিতা প্রকল্প হিসিবে শাহজালাল রাসায়নিক সার কারখানা সে দেশের রাসায়নিক সার ও জ্বালানি ঘাটতি পূরণে সহায়ক হবে এবং কৃষি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। পাশাপাশি দু'দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও গভীর করবে।"

গত ২৫ সেপ্টেম্বর চীনের চুংকোং আন্তর্জাতিক প্রকল্প লিমিটেড কোম্পানি আর বাংলাদেশের পানি সরবরাহ ব্যুরো পদ্মা পানি শোধনাগার প্রকল্পের বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। পদ্মা পানি কারখানা প্রকল্প হচ্ছে চীন ও বাংলাদেশ সরকারের আরেকটি সহযোগিতামূলক প্রকল্প। এর মোট মূল্য ২৯ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার। এ প্রকল্প নির্মাণের পর রোজ প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার টন পরিশোধিত পানি সরবরাহ করতে সক্ষম হবে। এ প্রকল্প প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত লি বলেন, "ঢাকা অধিক জনসংখ্যা বসতিপূর্ণ একটি শহর। খাবার পানি ঢাকার অধিবাসীদের জন্য এক বড় সমস্যা। এ সমস্যা সমাধানের জন্য চীন বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে বৃহত্ আকারের একটি পানি শোধনাগার নির্মাণ করবে। এ পানি শোধনাগার নির্মাণের পর ঢাকা শহরের প্রায় ছয় ভাগের এক ভাগ থেকে পাঁচ ভাগের এক ভাগ জনসংখ্যা নিরাপদ খাবার পানি খেতে পারবে।"

তা ছাড়া, টেলিযোগাযোগ ক্ষেত্রে চীন ও বাংলাদেশের সহযোগিতাও সুষ্ঠুভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। চীনের যন্ত্রপাতি ও সাজসরঞ্জাম প্রকল্প লিমিটেড কোম্পানি গত ১৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের কম্পিউটার কমিটির সঙ্গে ই-সরকার দ্বিতীয় প্রকল্পের বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এটাও একটি চীন ও বাংলাদেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতামূলক প্রকল্প। এর মোট মূল্য ১৩ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার। এই চুক্তি স্বাক্ষর বাংলাদেশ সরকারের 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' এর লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের সহায়ক হবে এবং একই সাথে দু'দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও মজবুত ও টেকসই উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

১৪ অক্টোবর চীনের যন্ত্রপাতি ও সাজসরঞ্জাম প্রকল্প লিমিটেড কোম্পানির সম্পাদিত চীন ও বাংলাদেশের সরকারের মধ্যকার প্রথম সহযোগিতামূলক প্রকল্প ২.৫জি সম্প্রসারণ আর ৩জি নেট নির্মাণ প্রকল্পের গ্রাহক পর্যায়ে সেবা প্রদান অনুষ্ঠান ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাষ্ট্রদূত লি মনে করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত বিকশিত হয়েছে। টেলিযোগাযোগের সরঞ্জামের চাহিদাও অনেক। আর এ পর্যায়ে চীনের টেলিযোগাযোগ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে অনেক কাজ করার সুযোগ রয়েছে।

লি চুন বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূত নিয়োগের পর অনেক বাঙ্গালী বন্ধুর সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। এমনকী প্রায়শই অনেক সাধারণ মানুষ তাঁকে এসএমএস পাঠিয়ে চীনের প্রতি তাঁদের বন্ধুত্বপূর্ণ ভাব-আবেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, "আমি বাংলাদেশে আসার পর সক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সঙ্গে ব্যাপক যোগাযোগ করেছি। আমি যথার্থভাবে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে ভাইয়ের মতো বন্ধুত্বপূর্ণ আবেগ অনুভব করি। আমি তৃণমূল গিয়ে সাধারণ জনগণ, এমনকি গরীব ও কঠিন জীবনযাপনকারী সাধারণ জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি এবং তা আমার মনে গভীরভাবে রেখাপাত করেছে। তাঁরা জানেন, চীন হচ্ছে তাঁদের বিশ্বাসযোগ্য বন্ধু। তাঁরা আশা করেন, চীনের সঙ্গে সহযোগিতা তাদের দেশের অর্থনীতি উন্নত হবে।" (ইয়ু / লিপন)

সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন
মন্তব্য
লিঙ্ক