Web bengali.cri.cn   
চীন-ইউরোপের দ্বিপথ বিনিয়োগ
  2012-10-06 19:26:39  cri

 অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক হচ্ছে চীন ও ইউরোপের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। চীন ও ইউরোপ হচ্ছে পরস্পরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। নতুন শতাব্দীতে প্রবেশের পর থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চীনের প্রথম বাণিজ্যিক অংশীদার। চীন হচ্ছে ইইউর দ্বিতীয় বাণিজ্যিক অংশীদার। পরস্পরের বাজারের ওপর চীন ও ইউরোপের নির্ভরতা দিন দিন বাড়ছে। অন্যদিকে চীনের বিনিয়োগ পরিবেশ দিন দিন উন্নত হচ্ছে এবং চীনের বাজার ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে। তাই চীনে ইইউর বিনিয়োগের পরিমাণও দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। চীনের 'বিদেশে যাওয়া' কৌশল কার্যকর করার সাথে সাথে আরো বেশি চীনা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ইউরোপে বিনিয়োগ করেছে। আজকে আমরা চীন ও ইউরোপের দ্বিপথ বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা করবো।

চীন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগদান করার পর চীনে ইইউর বিনিয়োগের পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৩ সাল থেকে ২০১২ সালের জুলাই পর্যন্ত ইইউর বিশটি দেশের চীনে বিনিয়োগকারী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২১,৩৪৭টি এবং প্রকৃত বিনিয়োগের পরিমাণ ৫৪.১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিদেশি বিনিয়োগ বিভাগের উপপ্রধান ছিউ লি সিন বলেন, বিদেশি পুঁজি আকর্ষণের জন্য চীন গত দশ বছরে ধারাবাহিক ব্যবস্থা নিয়েছে। তিনি বলেন, "গত দশ বছরে চীনের ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ বিদেশি পুঁজি ব্যবহারনীতি আরো স্পষ্ট হয়েছে। বিদেশি ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ-পরিবেশ আরো সুবিন্যাস্ত হয়েছে। বিদেশি ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালা আরো সুসম্পন্ন, স্বচ্ছ ও নিয়মাতান্ত্রিক হয়েছে। চীনের বাজার আরো উন্মুক্ত হয়েছে। শিল্পের আনুষঙ্গিক সামর্থ্য আরো বেড়েছে। বিদেশি বিনিয়োগের অনুমোদনের আওতা ধাপে ধাপে কমে যাচ্ছে। জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলন (আঙ্কটাড) প্রকাশিত বিনিয়োগ-পূর্বাভাসে দেখা যায়, চীন বহুবার বহুজাতিক কোম্পানির বিদেশে বিনিয়োগের প্রথম বিকল্প স্থান ছিল।"

বিগত ২০০২ সালের পর চীনের অর্থনীতির উন্নয়ন-পদ্ধতির রূপান্তরের গতি দ্রুততর হয়েছে। বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের পাশাপাশি চীন সক্রিয়ভাবে বিদেশি বিনিয়োগের কাঠামো এবং আঞ্চলিক কাঠামো সুবিন্যাস্ত করার নির্দেশনা দেয়, আধুনিক পরিসেবা শিল্প, উন্নত যন্ত্রনির্মাণ শিল্প, উচ্চ ও নতুন প্রযুক্তি শিল্প এবং কৌশলগত নবোদিত শিল্পে বিনিয়োগ করার জন্য বিদেশি ব্যবসায়ীদের উত্সাহিত করে। এর পাশাপাশি চীনে ইইউর বিনিয়োগের ক্ষেত্রও ধাপে ধাপে সম্প্রসারিত হয়েছে। যেমন তাদের বিনিয়োগ ক্ষেত্র গতানুগতিক যন্ত্রনির্মাণ শিল্প থেকে সেবা শিল্প, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ এবং ঝুঁকি বিনিয়োগসহ অন্যান্য খাতেও প্রসারিত হয়েছে।

তবে ইউরোপের আর্থিক সংকটের পর চীনে ইইউর বিনিয়োগের গতি মন্থর হয়েছে। উপাত্ত অনুযায়ী, ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত চীনে ইইউর প্রকৃত বিনিয়োগের পরিমাণ ২.৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় পরিষদের উন্নয়ন গবেষণা কেন্দ্রের বিশ্ব অর্থনীতি গবেষণালয়ের উপপ্রধান ডিং ই ফান মনে করেন, চীনের বাজারের আকর্ষণশক্তির দরুণ সত্তা অর্থনীতিতে ইইউর বিনিয়োগ স্থায়ী প্রবৃদ্ধি বজায় রেখেছে। ডিং ই ফান বলেন, "সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপের ঋণ সংকটের কারণে চীনে ইইউ দেশগুলোর বিনিয়োগের গতি কিছুটা মন্থর হয়েছে। তবে মন্থর হওয়ার ক্ষেত্র প্রধানত তাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠান। কারণ আর্থিক সংকটকালে চীন থেকে তাদের অর্থ প্রত্যাহার করার দরকার হয়। তাদের বিপুল পরিমাণ অর্থ আগের মতো চীনে প্রবাহিত হতে পারে না। কিন্তু সত্তা অর্থনীতি, বিশেষ করে যন্ত্রনির্মাণ শিল্পে চীনে তাদের বিনিয়োগের পরিমাণ আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। এক্ষেত্রে চীনের বাজার এখনো আকর্ষণীয়।"

চীনের ইইউ বণিক সমিতির গত মে মাসে প্রকাশিত 'ব্যবসার আস্থা সংক্রান্ত জরিপ-২০১২' অনুযায়ী, ২৬ শতাংশ ইইউ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মনে করে, এ বছর তাদের প্রত্যাশিত আয়ের মধ্যে এক-চতুর্থাংশ চীন থেকে আসবে। চুয়াল্লিশ শতাংশ ইইউ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান জানায়, চীনের বাজার থেকে সৃষ্ট আয় তাদের সারা বিশ্বের মোট আয়ের ১০ শতাংশেরও বেশি। অন্যদিকে ৭৪ শতাংশ ইইউ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান জানায়, সারা বিশ্বে তাদের ব্যবসা কৌশলের মধ্যে চীনের মর্যাদা দিন দিন আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইইউর অধিকাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরবর্তী কয়েক বছরে চীনে তাদের ব্যবসার ভৌগলিক আওতা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। এ প্রসঙ্গে ডিং ই ফান বলেন, "এখন চীনের বাজার অনেক রকম পণ্যের বৃহত্তম বাজারে পরিণত হয়েছে। ফলে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তাদের উত্পাদন ও গবেষণা কাজ চীনে স্থানান্তর করতে চায়। যেমন জার্মান গাড়িনির্মাতা ভক্সওয়াগন ও অডি কোম্পানির চীনে সৃষ্ট উত্পাদন মূল্য ও মুনাফা তাদের সারা বিশ্বের উত্পাদন মূল্যের অর্ধেকেরও বেশি। অর্থাত্ তাদের অর্ধেকেরও বেশি মুনাফা সৃষ্টি হয় চীনের বাজার থেকে। এটা চীনে তাদের উত্পাদন ও বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রধান কারণ।"

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সার্বিক রাষ্ট্রীয় শক্তি বৃদ্ধির সাথে সাথে চীন সরকার জোরালোভাবে বিদেশি পুঁজি আকর্ষণের পাশাপাশি শর্তসাপেক্ষে নিজ দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে বিদেশের বাজারে প্রবেশে উত্সাহ দেয়। আর্থিক সংকটের পর চীনা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ইউরোপে বিনিয়োগ করার সুযোগ পেয়েছে। ডিং ই ফান বলেন, "ইউরোপের প্রধান সমস্যা ঘটেছে আর্থিক ও ব্যাংকিং শিল্পে। ফলে তার ব্যাংকগুলো অর্থনীতিতে বলিষ্ঠ সহায়তা দিতে পারছে না। ইউরোপের অনেক প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ও যন্ত্রনির্মাণ প্রতিষ্ঠানের অর্থের প্রয়োজন হলেও তারা ব্যাংক থেকে ঋণ পাচ্ছে না। এ সময় তারা চীনা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে হাত বাড়িয়েছে। চীনা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের কারণে তারা অর্থপ্রবাহের সংকট থেকে রেহাই পায়। এর ফলে দু'পক্ষের উপকার হয়েছে। বিশেষ করে, আর্থিক সংকটের পর চীনা অর্থের প্রয়োজন জরুরি হয়ে পড়ায় তারা অতীতের কিছু প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা শিথিল করেছে। কারণ অতীতে ইউরোপীয় উদ্যোক্তাদের চীনের ব্যাপারে প্রযুক্তিগত সতর্কতা ছিল। তারা চীনের কাছে উন্নত প্রযুক্তি উন্মুক্ত করতে চাইতো না। এখন তা অনেক উন্মুক্ত হয়েছে।"

আর্থিক সংকটের পর চীনা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ইউরোপে বিনিয়োগ করার পদক্ষেপ দ্রুততর করেছে। যেমন চীনের মহাসাগর পরিবহন কর্পোরেশন গ্রুপ গ্রিসের পিরায়েভস বন্দরে বিনিয়োগ করেছে। চীনের চিলি হোল্ডিং সুইডেনের ভলভো গাড়ি কোম্পানি অধিগ্রহণ করেছে। চীনের সানঈ ভারী শিল্প কোম্পানি লিমিটেড জার্মান যন্ত্রপাতি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান পুত্জমিস্টার অধিগ্রহণ করেছে। চীনে ইইউর বিনিয়োগের তুলনায় ইউরোপে চীনের বিনিয়োগের পরিমাণ এখনো ক্ষুদ্র। তবে ফ্রান্সে চীনা দূতাবাসের অর্থনীতি ও ব্যবসা বিষয়ক মিনিস্টার কাউন্সিলার উ শি লিন ইউরোপীয় বাজারে চীনা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের ভবিষ্যত সম্ভাবনার ব্যাপারে আস্থাবান। তিনি বলেন, (রেকর্ডিং—৫)

"অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন গভীর হওয়ার সাথে সাথে চীনা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিদেশে প্রবেশের সুযোগ আরো বাড়বে। এখন চীনা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিদেশে বিনিয়োগ করার দুটি প্রাধান্য রয়েছে। একটা হচ্ছে অর্থের প্রাধান্য। বিদেশে আমাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের জন্য আমাদের যথেষ্ঠ পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আছে। দ্বিতীয় হচ্ছে আমাদের বড় বাজার আছে। আমাদের বর্তমান অর্থনৈতিক নীতি হচ্ছে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ানো। অনেক বিদেশি পণ্য চীনের বাজারে প্রবেশ করতে চায়। চীনা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পুঁজি আর বাজার প্রাধান্য আরো অনেক দিন থাকবে। ফলে আমরা বিদেশে বিনিয়োগের ভবিষ্যত সম্ভাবনার ব্যাপারে আশাবাদী।"

আর্থিক সংকটের কারণে ইউরোপীয় বাজার সংকীর্ণ হয়েছে। পরিপূর্ণ প্রাণবন্ত চীনের বাজার নিঃসন্দেহে ইইউর কাছে আকর্ষণীয় থেকে যাবে। সার্বভৌম ঋণ সংকটের প্রেক্ষাপটে ইইউর দরকার চীনা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ অব্যাহত রাখা। ফলে বলা যায়, চীন ও ইউরোপের দ্বিপথ বিনিয়োগের ভবিষ্যত সম্ভাবনা বিস্তীর্ণ। (ইয়ু/এসআর)

মন্তব্য
মন্তব্য
লিঙ্ক