নয়া চীন উন্নয়নের অভিজ্ঞতার অভাব রয়েছে। দেশের পশ্চাত্পদ অবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যে জনগণ যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। কারখানাগুলোর যন্ত্র দিন রাত কাজ করে। শহরে ইস্পাত তৈরির অভিযান শুরু হয়েছে।
১৯৫৮ সালের শেষ দিকে জলাধার নির্মাণের কাজ শেষ করে লি মিং ছাই পেইচিংয়ের কারখানা শ্রমিক নিয়োগ করার খবর পাওয়ার পর পরই নাম তালিকাভুক্ত করেছেন এবং পেইচিংয়ের দ্বিতীয় মেশিন টুল কারখানার একজন শিক্ষানবিশ শ্রমিক হয়েছেন।
তিনি বলেন, 'তখন আমি খুব খুশি। ছুটির দিন বাইরে বেড়াতে যেতাম। মাসে বারো ইউয়ান খাবার ফি ও চার ইউয়ান হাতখরচ দিয়ে ভালোভাবে খেতে এবং সিগারেট কিনতে পারি। কাজের সময় ওভাররল পড়ি।'
শহরে এক বছর কাজ করার পর লি মিং ছাই আবার গ্রামে ফিরে যান। তত্কালীন গ্রামে কেউ কেউ পরিশ্রমের মাধ্যমে সমৃদ্ধ হয়েছে। কেউ কেউ শ্রমিকের অভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা রোগের কারণে দরিদ্র হয়েছে। গ্রামবাসীদের আর্থিক ব্যবধান এড়ানো এবং সরকার শহরবাসীদের খাদ্যশস্য সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চীন প্রথমে গ্রামাঞ্চলে কৃষি সমবায় প্রতিষ্ঠা করে। কিছু দিন পর আরো ব্যাপক আকারের গণ কমিউন প্রতিষ্ঠা করেছে। জমি সংস্কারে কৃষকদের দেয়া জমি আবার গণ কমিউন ফেরত নিয়েছে। কৃষকরা আবার ডাইনিং হলে খেতে শুরু করেন। কৃষকরা আর মুক্তভাবে কৃষিজাত দ্রব্য বিক্রি করতে পারে না। ব্যবস্থাপনা অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত, বন্টনের নির্বিচার সমতার কারণে কৃষকদের উত্পাদনের সক্রিয়তা হারিয়েছে।
১৯৫৯ সালে চীন একটানা তিন বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটেছে। খাদ্যশস্যসহ কৃষিজাত দ্রব্যের সরবারহের ঘাটতিও শুরু হয়েছে। গ্রামের জীবনও কঠিন হয়ে উঠেছে।
লি মিং ছাইয়ের মত লিন লিও তিন বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের গভীর ছাপ রেখেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দুর্ভিক্ষ আবির্ভুত হয়েছে। রাজধানী পেইচিংয়ে খাদ্যের ঘাটতিও দেখা দিয়েছে। পেইচিং পৌর সরকার বাধ্য হয়ে নিয়ম করেছে যে, পেইচিংয়ের আনুষ্ঠানিক অধিবাসীর বয়স অনুযায়ী মাসিক খাদ্যের পরিমাণ নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট টিকিট বন্টন করবে।
'তখন নানা ধরনের টিকিট ছিল। কাপড়ের টিকিট, ময়দার টিকিট, ধানের টিকিট, তেলের টিকিট ও শস্যের টিকিট। প্রতিটি মানুষের নির্ধারিত পরিমাণ আছে। খুব জটিল। আমার ছোট ভাই তখন প্রায়শই পেট ভরে খেতে পারতো না। মা নিজের খাবার ভাইকে দিতেন। আমি ও ছোট বোন বড় চোখ করে ভাইয়ের দিকে তাকাই। যাতে সে মায়ের খাবার না খায়। মা খিদে পেলে সিগারেট খেতেন।'
কঠিন অবস্থা থেকে জাগানো জনসাধারণের মনে জরুরীভাবে এক মানবিক আদর্শ স্থাপন করা দরকার। অবশেষে লেই ফাং চীনের জনগণের এক আদর্শে পরিণত হয়েছেন। হুনান প্রদেশের লেই ফাং চীনের মুক্তি ফৌজের একজন সৈনিক ছিলেন, এক দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান। ১৯৬৩ সালের ৫ মার্চ মাও ছে তুং 'কমরেড লেই ফাংয়ের কাছে শিক্ষাগ্রহণ করেন' অভিলেখন লিখে দিয়েছেন। 'লেই ফাংয়ের কাছে শিক্ষাগ্রহণ অভিযান' সারা চীনে চালু হয়েছে। লেই ফাংয়ের নিঃস্বার্থ মর্ম লিন লির মত অসংখ্য কিশোরকিশোরীকে উত্সাহ দিয়েছে।
১৯৬৬ সালে মহা সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুরু হয়। মাথা-পাগলা ব্যক্তিপূজা ও তুমুল রাজনৈতিক ঝড়ে অধিকাংশ মানুষের নিয়তি পরিবর্তিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়েছে। লিন লি হঠাত্ জীবনের লক্ষ্য হারিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া আর কর্মসংস্থান করা উভয় হতাশা হওয়ার পর লিন লি ও তাঁর কিছু সহপাঠির ইউয়ুনান প্রদেশের সিশুয়াংপাননায় গিয়ে দেশের জন্য এক রবার উত্পাদনের কেন্দ্র নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সরকারী অনুমোদন পাওয়ার জন্য তারা কেন্দ্রীয় সরকারের নেতাদের কাছে আবেদন পাঠিয়েছেন। ১৯৬৭ সালের ২৭ নভেম্বর রাতে প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাইন মহা গণ ভবনে রাজধানীর জনসাধারণের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করেন। এ খবর পেয়ে লিন লি ও তাঁর দু'জন সহপাঠি দ্রুত মহা গণ ভবনে গিয়েছেন।
তিনি বলেন, 'আমরা সেখানে পৌঁছার পর মনে পড়েছে যে, আমাদের আবেদন ভুলে গেছি। সেখান থেকে একটি ক্ষুদ্র কাগজ যোগার করে আমার এক সহপাঠি সেখানে আবেদনটি আবার লিখেছেন। জনসমাবেশের পর প্রধানমন্ত্রী বাইরে আসার সময় আমি সাহস নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়ে সরাসরি গ্রামাঞ্চলের যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করি এবং আবেদনটি দাখিল করি। প্রধানমন্ত্রী তাতক্ষনিকভাবে সেখানেই আবেদন অনুমোদন করেন।'
কিছু দিন পর ১৯৬৮ সালে চেয়ারম্যান মাওয়ের 'বুদ্ধিজীবী যুবকদের গ্রামাঞ্চলে যাওয়ার' আহ্বানে শহরাঞ্চলের অসংখ্য ছাত্রছাত্রী বাবা-মার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গ্রাম ও সীমান্ত অঞ্চলে যান। প্রায় দু'কোটি যুবক এবারের বুদ্ধিজীবী যুবকদের পাহাড়ে উঠা ও গ্রামাঞ্চলে যাওয়ার অভিযানে অংশ নিয়েছে। এ অভিযান চীনের এক প্রজন্মের জনগণের জীবনের ওপর প্রভাব ফেলেছে। (ইয়ু কুয়াং ইউয়ে)
|