v চীনের বিশ্ব কোষv চীন আন্তর্জাতিক বেতারv বাংলা বিভাগ
ইয়াও জাতির নারী ডাক্তার লান চি লিন
2009-08-18 20:27:42
দক্ষিণ পশ্চিম চীনের কুয়াং শি চুয়াং জাতি স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চলের রোং সুই জেলায় বসবাস করে চীনের একটি অতি প্রাচীন সংখ্যালঘু জাতি তারা হলো -ইয়াও জাতি । হোং ইয়াও ইয়াও জাতির একটি শাখা । দারিদ্র , পরিবেশ ও মানুষের ধারনার রক্ষশীলতার কারণে আগে হোং ইয়াও উপজাতির মেয়েরা কোন আনুষ্ঠানিক সংস্কৃতিক শিক্ষা গ্রহণ করে নি । ১৯৮৮ সালে হোং ইয়াও'র বালিকাদের জন্য প্রথম শিক্ষ ব্যবস্থা চালু করা হয় । এতে স্থানীয় মেয়েদের ভাগ্যের পুরোপুরি পরিবর্তন হয়েছে ।

ইয়াও জাতি চীনের একটি প্রাচীন সংখ্যালঘু জাতি । ২ হাজার বছরেরও বেশি পুরানো ঐতিহ্যের এ জাতির লোকজন চীনের কুয়াং শি , হুনান ও কুইচৌসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বাস করে । তাদের মধ্যে বেশির ভাগ লোক পাহাড়ী অঞ্চলে থাকে । আচার ব্যবহার এবং -পোষাক পরিচ্ছদের ব্যবধানের কারণে ইয়াও জাতিকে হোং ইয়াও , পাই খু ইয়াও ও ফাং ইয়াওসহ কয়েকটি সম্প্রদায়ে বিভক্ত করা যায় ।

লান চি লিন কুয়াং শি চুয়াং জাতি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের লিউ চৌ শহরের রোং সুই জেলায় বসবাসকারী হোং ইয়াও উপজাতির একটি মেয়ে । হোং ইয়াও উপজাতির লোকজন হালকা লাল রঙের পোষাক পছন্দ করে । চীনা ভাষায় 'হোং' শব্দের অর্থ লাল রঙ । ১৯৮২ সালে পাই ইউন থানা থেকে দূরের একটি গ্রামে তার জন্ম । এ গ্রাম থেকে থানায় হেঁটে যেতে প্রায় ৫ ঘন্টা লাগতো । তখন ৬ বছর বয়সী লান চি লিনের নাম ছিল না । গ্রামবাসীরা তাকে লান বোন ডাকতো । গ্রামের ছেলেরা স্কুলে লেখাপড়া করতো । সে অন্যান্য মেয়ের মতো পাহাড়ে গরু চরাতো । তিনি নিজেই বলেন ,

তখন লান চি লিন ও অন্যান্য মেয়েরাও লেখাপড়া খুব পছন্দ করতো । কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে তাদের পক্ষে এ সুযোগ পাওয়া সম্ভব হতো না ।

১৯৮৮সালে লান চে ইং নামে হোং ইয়াও উপজাতির এক তরুণ স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের রাজধানী কুই লিন থেকে আসেন । তিনি ওখানে লেখাপড়া করেছেন । কুই লিন শহরের মেয়েরা ছেলেদের মতো স্কুলে লেখাপড়া করে । হোং ইয়াও উপজাতির মেয়েরা তাদের মতোই লেখাপড়া করতে পারবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন । লেখাপড়ার জন্য তিনি বাড়িতে বাড়িতে মেয়েদের ও তাদের পরিবারের লোকজনকে পরামর্শ দিতেন । লেখাপড়ার উদ্দেশ্যে মেয়েদের উত্সাহ দেয়ার জন্য তিনি গ্রামে একটি প্রাথমিক স্কুল স্থাপন করেন । প্রথম এ স্কুলে মাত্র ছ'জন ছাত্রছাত্রী ছিল । তাদের মধ্যে লান চি লিন ছিল অন্যতম । স্কুলে শিক্ষক লান চেন ইং তাকে 'লান চি লিন' এ নাম দেন ।

কিন্তু হোং ইয়াও উপজাতির প্রবীণ গ্রামবাসীরা মেয়েদের লেখাপড়ার বিরোধীতা করতেন । তারা মনে করেন , লেখাপড়ায় মেয়েদের জন্য কোনো উপকার নেই । কারণ তারা বিয়ে করবে এবং বউ হবে । শুধু বাড়ির কাজ করতে হবে । লান চি লিনের লেখাপড়া বন্ধ করার জন্য তারা তার বাবাকেও পরামর্শ দিতেন ।

এক দিন গরু চরানোর জন্য লান চি লিন প্রবীণ গ্রামবাসীদের সঙ্গে পাহাড়ে যায় । তখন একজন বৃদ্ধ তাকে বললেন , লেখাপড়া করা মেয়ের জন্য কোনো লাভ নেই । মেয়েরা লেখাপড়া না করলে ভাল ।

লান চি লিন প্রতিশ্রুতি দিতো যে , অন্যান্য মেয়েদের জন্য একটি দৃষ্টান্ত স্থাপনের লক্ষ্যে তাকে অধ্যবসায়ের সঙ্গে লেখাপড়া করতে হবে । ১৯৮৮ সালে নিখিল চীন নারী ফেডারেশনের উদ্যোগে হোং ইয়াও উপজাতির অঞ্চলে বালিকাদের জন্য একটি প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করা হয় । দু' বছর পর লান চি লিন ও অন্য ৪টি মেয়ে লেখাপড়ার জন্য এ কোর্সে ভর্তি হয় । তারা এ প্রশিক্ষণ কোর্সে নিয়মিত প্রশিক্ষণ নেয় । তখন লান চি লিনের বড় ভাইও লেখাপড়া করছে । কিন্তু সারা পরিবারের বার্ষিক আয় মাত্র ১ শ' ইউয়ানেরও সামান্য কিছু বেশি । লেখাপড়ার জন্য দু' সন্তানের ব্যয় বহন করা এ পরিবারের পক্ষে সম্ভব ছিল না । ক্লাসে লান চি লিনের লেখাপড়ার ফলাফল প্রথম সারিতে রয়েছে । অবশেষে তার বড় ভাই বাধ্য হয়ে স্কুল থেকে চলে যাওয়ার বিষয়টি বেছে নিলো ।

এতে লান চি লিন খুব দুঃখ প্রকাশ করলো । পরিবারের দারিদ্র্যের কারণে তার বড় ভাইয়ের লেখাপড়ার সুযোগ হারিয়ে গেছে । নইলে বড় ভাইয়ের ভাগ্য ও ভবিষ্যত হয়তো আরো ভাল হতো ।

লান চি লিনের বড় ভাই এখনো কৃষি কাজ করছে । বড় ভাইয়ের ভাগ্যের জন্য লান চি লিন এখনো খুব দুঃখ পায় । এর পাশাপাশি হোং ইয়াও উপজাতির মেয়েদের ভাগ্য ও ভবিষ্যত পরিবর্তনের জন্য সে অধ্যবসায়ের সঙ্গে লেখাপড়া করেছে । ১৯৯৭ সালে লান চি লিন কুয়াং শি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের চিকিত্সা বিদ্যালয়ে ভর্তি হয় । ২০০২ সালে এ বিদ্যালয় থেকে পাস করার পর সে তার জন্মভূমির একটি ক্লিনিকের স্ত্রীরোগ বিষয়ক বিভাগের কাজ শুরু করে । সে চিকিত্সার কাজে যথাসাধ্য প্রচেষ্টা চালিয়েছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে চিকিত্সকের যোগ্যতা লাভ করেছে । সে এখন হোং ইয়াও উপজাতির প্রথম নারী চিকিত্সকে পরিণত হয়েছে ।

আগে বাইরের সঙ্গে হোং ইয়াও উপজাতির মেয়েদের বিনিময় ও যোগাযোগ ছিল না । স্ত্রীরোগ বিষয়ক জ্ঞানের দারুণ অভাব ছিল । এ ব্যাপারে তারা কাউকে জিজ্ঞাসাও করতে পারতো না ।

আয় করার জন্য হোং ইয়াও উপজাতির ছেলেরা সাধারণতঃ চাকরির জন্য বাইরে যেতো । জীবনযাপনের ক্ষেত্রে মেয়েদের অনেক বেশি সমস্যা ও অসুবিধা ছিল ।

এখন হোং ইয়াও উপজাতির গ্রামে ক্লিনিক গড়ে তোলা হয়েছে । সমস্যা থাকলে মেয়েরা সহজেই চিকিত্সকদের জিজ্ঞাসা করতে পারে । নারী চিকিত্সক হিসেবে লান চি লিন চিকিত্সার পাশাপাশি এখন মেয়েদের মধ্যে স্ত্রীরোগ ও স্বাস্থ্যরক্ষা বিষয়ক জ্ঞান জনপ্রিয় করে তোলার চেষ্টা করছে । হোং ইয়াও উপজাতির মেয়েদের জন্য চিকিত্সার ব্যবস্থা প্রতিদিনই আরো পূর্ণাঙ্গ হয়ে ওঠেছে ।

বর্তমানে হোং ইয়াও উপজাতির মেয়েরা আরো বেশি ও আরো পূর্ণাঙ্গ শিক্ষার সুযোগ পেয়েছে । লান চি লিন আশা করে , তার মতো হোং ইয়াও উপজাতির মেয়েরা ভবিষ্যতে লেখাপড়া ও চাকরির আরো ভাল সুযোগ পাবে । হোং ইয়াও উপজাতির ভবিষ্যত আরো উজ্জ্বল হবে ।

(থান ইয়াও খাং)

  • সাক্ষাত্কার
  • সর্বশেষ সংবাদ
  • অন-লাইন জরীপ
     
    © China Radio International.CRI. All Rights Reserved.
    16A Shijingshan Road, Beijing, China