Web bengali.cri.cn   
নতুন যুগে চীনা পরিবারের শিক্ষাদানের সুষ্ঠু উন্নয়ন এবং থাইল্যান্ডের কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র 'লুবান কারখানা'
  2019-10-21 11:30:36  cri

 


আজকের অনুষ্ঠানে চীনের আধুনিক পরিবারের শিক্ষাদানের উন্নয়ন এবং থাইল্যান্ডের কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র 'লুবান কারখানা' সম্পর্কে কিছু তথ্য তুলে ধরবো।

পরিবার মানুষের জীবনের প্রথম শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, বাচ্চাদের বাবা মা তাদের প্রথম শিক্ষক। তাই পিতামাতার উচিত ছোটবেলা থেকেই শিশুকে সঠিকভাবে শিক্ষাদান করা। ২০১৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর চীনের শিক্ষা সম্মেলনে চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বলেন, চীনা সমাজকে যুবকদের বেড়ে ওঠার দায়িত্ব বহন করতে হবে।

গত কয়েক বছর ধরে চীনা সমাজের বিভিন্ন পর্যায় ও মহল যুবকদের বড় হওয়ার প্রক্রিয়ায় ব্যাপক মনোযোগ দিয়ে আসছে। একইসঙ্গে পরিবার, স্কুল ও সমাজের যৌথ উদ্যোগে যুবকদের শিক্ষাদান কাঠামো তৈরি করে সুষ্ঠু শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।

বাচ্চাদের বড় হওয়ার প্রক্রিয়ায় পিতামাতার অংশগ্রহণ প্রয়োজন

বেইজিংয়ের একজন উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র সিয়াওচেংয়ের গল্প অনেকের জন্য দুঃখজনক। তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুবই ভালো, অন্যদের চোখে তার পরিবার ধনী একটি পরিবার, তবে তার পিতামাতা অনেক ব্যস্ত। দেশের বাইরে ব্যবসায়িক কাজ বা অন্য কারণে সবসময় তাদের ব্যস্ত থাকতে হয়। পরিবারকে তারা সময় দিতে পারেন না, তাই ছোটবেলা থেকে সিয়াওচেং আত্মীয়স্বজনের বাসায় থাকে এবং ৬ বছর বয়সে প্রাথমিক স্কুল ভর্তির সময় বাবা মায়ের কাছে ফিরে যায়।

তবে পিতামাতার সাথে থাকা তার জন্য আনন্দদায়ক ব্যাপার নয়। কারণ তার বাবা মা তাকে হাসিমুখে কখনো বেশি সময় দিতে পারেন না। পিতামাতা সবসময় তার সমালোচনা করে, মাঝে মাঝে তাকে কড়া শাসন করে এবং আন্তরিকভাবে তার কোনো যত্ন নেয় না।

মাধ্যমিক স্কুল থেকে সিয়াওচেং মানসিক বিষণ্ণতায় ভুগতে শুরু করে এবং উচ্চ বিদ্যালয়ে তার অবস্থা আরো গুরুতর হয়ে ওঠে। একবার সংঘর্ষে সিয়াওচেং অন্যকে হত্যা করে এবং তাকে গ্রেফতার করা হয়।

তখন তার পিতামাতা অনেক পরিতাপ করেন, তবে নিজের বাচ্চার জীবন আরেকবার শুরু করা সম্ভব নয়। অস্বাভাবিক পিতামাতা ও বাচ্চার সম্পর্ক এবং অস্বাভাবিক পারিবারিক শিক্ষাদান বাচ্চার অপরাধ বা দোষ সৃষ্টিতে নেতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে। বেইজিংয়ের হাইতিয়ান এলাকার অভিশংসক দফতরের একজন পরিচালক ম্যাডাম ইয়াং সিন এ্য এমন কথা বলেন।

বেইজিং থেকে ২৬০০ কিলোমিটার দূরে ইয়ুননান প্রদেশের রাজধানী খুনমিংয়ে হুইল চেয়ারে বসে ছাত্রী স্যু রুই ইয়াং হাসিমুখে তার গল্প শেয়ার করে।

২ বছর বয়সে তার পেশী অ্যাট্রোফি রোগে আক্রান্ত হয়, ডাক্তার তার মাকে বলেন যে সে হয়তো ৪ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে সক্ষম। তবে স্যু রুই ইয়াং'র পিতামাতা পরিত্যাগ করেন নি, তারা নানান পদ্ধতিতে ডাক্তার খুঁজে পান এবং তাকে অন্যদের মতো জীবনযাপন কাটাতে উত্সাহ দেন।

যদিও মেয়ে স্যু কখনো দাঁড়াতে সক্ষম নয়, তবে সে আনন্দ ও আশাবাদী মনে জীবনযাপন কাটায় এবং সুখী পরিবারের যত্নে হুইল চেয়ারে বসে কাওখাওতে চমত্কার ফলাফল অর্জন করে সিছুয়ান বিদেশি ভাষা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়।

বাবা মাকে বেশ কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মেয়ে স্যু বলে, তাঁরা সবসময় আমাকে সমর্থন, উত্সাহ ও সঠিক দিক-নির্দেশনা দেন, আমার প্রিয় কাজ করতে সহায়তা দেন।

দু'জন ছাত্রছাত্রীর গল্প থেকে বোঝা যায়, বাচ্চাদের পরিবারের সদস্যদের সম্পর্ক বাচ্চাদের চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। তাদের মানসিক অবস্থা, নিরাপত্তার অনুভূতি এবং মানুষের সাথে সম্পর্ক তৈরি, কর্মসংস্থানে সহকর্মীদের সাথে সম্পর্ক এবং নিজের বিবাহের ব্যাপারে সবই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে থাকে।

এ সম্পর্কে বেইজিংয়ের এক সিনিয়র মনোবিজ্ঞানী শু ছাং বলেন, পিতামাতার ভালোবাসা ও সুসম্পর্ক বাচ্চাদের জন্য যেন সূর্যের মতো।

বাচ্চার সাথে যৌথ উন্নয়নে পিতামাতারও লেখাপড়া প্রয়োজন

চীনের শানতুং প্রদেশের চিনান শহরে আবর্জনা সঠিকভাবে ভাগাভাগি সম্পর্কে এক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। চিনান শহরের ছুয়ানছেং পার্কের এক কর্নারে স্বেচ্ছাসেবক উচ্চস্বরে বলেন, ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে এ৪ সাইজের কাগজ টুকরো টুকরো করতে হবে। তার কথা শুনে ৪০ জনেরও বেশি বাবা ও তাদের বাচ্চা অবিলম্বে কাগজ টুকরো টুকরো করতে শুরু করে এবং কম সময়ের মধ্যে কাগজটি ছিড়ে ফেলে। তখন স্বেচ্ছাসেবক আরো বলেন, সবাইকে ৫ মিনিটের মধ্যে কাগজটি আগের মতো পুনরুদ্ধার করতে হবে। তার এ কথা শুনে সবাই অবাক হয়ে যায়। এ সম্পর্কে অনুষ্ঠানের আয়োজক চিনান শুনকেং প্রাথমিক স্কুলের 'ফাদার্স ক্লাব'-এর দায়িত্বশীল ব্যক্তি চু হাই লুং বলেন, এটা হল 'ফাদার্স ক্লাব'-এর নতুন সেমিস্টারের এক অনুষ্ঠান, এর মাধ্যমে বাচ্চা ও পিতারা আবর্জনা সঠিকভাবে ভাগাভাগির পদ্ধতি ও তাত্পর্য ভালোভাবে জানতে সক্ষম।

শুনকেং প্রাথমিক স্কুলের 'ফাদার্স ক্লাব' প্রতিষ্ঠার ১০ বছরের মধ্যে নিয়মিতভাবে পিতাদের 'ক্লাসরুমে এক বিশেষ ক্লাস', 'খেলার মাঠে বাস্কেটবল প্রতিযোগিতা'সহ অনুষ্ঠান আয়োজিত হয় এবং টানা চার সহস্রাধিক পিতা অনুষ্ঠানে অংশ নেন। তাছাড়া, স্কুলে 'প্যারেন্টস গাইড গ্রুপ', 'সুন্দরী মাতা গ্রুপ' সহ বিভিন্ন সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, এভাবে স্কুল ও পরিবারের যৌথ শিক্ষা কমিউনিটি গঠিত হয়।

স্কুলের চীনা ভাষা শিক্ষক সুন সিয়াওথুং বলেন, পিতামাতাকে বাচ্চাদের সাথে চলে আসা এবং স্কুলে এসে বাচ্চাদের শিক্ষাদানে অংশগ্রহণে উত্সাহ দেয় স্কুলটি, যাতে দু'পক্ষের যৌথ উন্নয়ন বাস্তবায়ন করা যায়। শিক্ষক সুন আরো বলেন, তাঁর ক্লাসে পিতামাতা ও বাচ্চাদের পারস্পরিক চিঠি লেখার কার্যক্রম চালু হয়েছে, যা ব্যাপকভাবে পিতামাতা ও বাচ্চাদের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর করেছে।

'কিভাবে বাচ্চাদের সাথে যোগাযোগ করা যায়', তা পিতামাতার সম্মুখীন সবচেয়ে বড় সমস্যা। এ সম্পর্কে চীনের হুনান প্রদেশের লিয়ানইউয়ান শহরের নাগরিক লু শুনলি'র গভীর অনুভব রয়েছে। তাঁর দু'জন বাচ্চা আছে, পারিবারিক শিক্ষাদান তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতকালে মনের আদর্শ দিয়ে বাচ্চাকে দেখাশোনা করেন, তা বাচ্চাদের জন্য অগ্রহণযোগ্য পদ্ধতি, এতে তার মন অনেক খারাপ। অনেক পিতামাতা নিজের বাচ্চাদের সাথে কথাবার্তা বলতে সক্ষম নন। তারা স্কুলে এসে শিক্ষকের সঙ্গে পরামর্শ করেন এবং শিক্ষকদের সহায়তায় পরিবারের সমস্যা সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন। এ সমস্যার সমাধানে হুনান শিক্ষা প্রকাশনালয় পিতামাতার জন্য অনলাইন স্কুল চালু করেছে, যাতে ইন্টারনেট ও নিউ মিডিয়া প্রযুক্তিতে পিতামাতাদের বিনিময়ের প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা যায় এবং পিতামাতার ক্লাস, বাচ্চাদের দেখাশোনার জ্ঞানসহ বিভিন্ন পরিষেবা দেওয়া যায়, অর্থাত্ সার্বিকভাবে পারিবারিক শিক্ষাদানে সহায়তা দেয়া যায়।

'পিতামাতার অনলাইন স্কুল' লু শুন লি'র মতো পিতামাতার জন্য জানালা খুলে দিয়েছে। তিনি সুবিধাজনক সময়ে অনলাইনে 'এভাবে তোমাকে ভালোবাসি' প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং নিজের সম্মুখীন সমস্যা সমাধান করেন।

অনলাইন স্কুল চালু হওয়ায় ব্যক্তিগতভাবে লেখাপড়া এবং বাচ্চাদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করা যায়, এভাবে পরিবারের সদস্যদের সম্পর্ক উন্নত করা সম্ভব।

বাচ্চাদের জন্য বিধিনিয়ম স্থাপন করা

চীনের হোপেই প্রদেশের শিচিয়াচুয়াং শহরের নাগরিক ম্যাডাম বিয়ান না এবং তাঁর পঞ্চম শ্রেণী পড়ুয়া মেয়ের সম্পর্ক তেমন সুবিধাজনক না।

এ সম্পর্কে ম্যাডাম বিয়ান বলেন, 'সে আমার কথা শোনে না, নিজেই সিদ্ধান্ত নেয় এবং আমার যে কোনো সিদ্ধান্ত সন্দেহ করে।' তখন থেকে তার মনে হয় মেয়ের সাথে যোগাযোগের পদ্ধতি সমন্বয় করতে হবে, বিশেষ করে প্রতিদিন সময় মতো হোমওয়ার্ক না করার ব্যাপারে তাঁর মেয়ে জিজ্ঞেস করছিল: 'মা, তুমি প্রতিদিন শুধু হোমওয়ার্কের ব্যাপার আমাকে জিজ্ঞেস করো, আর অন্য কাজ নেই?'

অনেক পিতামাতা বিয়ান না'র মতো সমস্যার সম্মুখীন হন। এ অবস্থা মোকাবিলায় হোপেই প্রদেশের শিক্ষা বিভাগ 'পিতামাতার ক্লাস' চালু করে এবং পেশাগত শিক্ষাবিষয়ক শিক্ষকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে পিতামাতাদের বাচ্চা দেখাশোনার পদ্ধতি বুঝিয়ে দেয়।

এ ক্লাসের মাধ্যমে ম্যাডাম বিয়ান তাঁর সমস্যা খুঁজে পান। 'বাচ্চা বড় হয়েছে, মানসিক ও শারীরিক দিকে পরিবর্তন ঘটেছে।' তাকে এ বাস্তবতার সম্মুখীন হতে হবে, যদি অতীতকালের পদ্ধতিতে তার সাথে অবস্থান করা হয়, তাহলে তার বড় হওয়ার পদক্ষেপ সুষ্ঠু হবে না।

পারিবারিক শিক্ষা শুধু বাচ্চাকে বিভিন্ন ক্লাসে পাঠিয়ে দেওয়া নয়, বরং নিজের আচরণ ও অনুশীলনের মাধ্যমে বাচ্চার মধ্যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। পিতামাতাদের গুণ উন্নত করে বাচ্চাদের গুণগতমান উন্নত করতে হবে।


1  2  
© China Radio International.CRI. All Rights Reserved.
16A Shijingshan Road, Beijing, China. 100040