Web bengali.cri.cn   
শিক্ষার মাধ্যমে চীনের তুলুং জাতির দারিদ্র্য-বিমোচন বাস্তবায়ন
  2019-06-17 16:41:40  cri

 


আজকের অনুষ্ঠানে আপনারা শিক্ষার মাধ্যমে চীনের তুলুং জাতির দারিদ্র্য-বিমোচন বাস্তবায়ন সম্পর্কে কিছু তথ্য জানবেন, আরো জানবেন ইতালির মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজিত 'চীনা ব্রিজ' প্রতিযোগিতা সম্পর্কে।

চীনের তুলুং জাতির লোকসংখ্যা সাত হাজার জনেরও কম। বংশের পর বংশ ধরে তাঁরা তুলুং গিরিখাতে বসবাস করেন। তাদের চারপাশে তুষারাচ্ছন্ন পাহাড়। হাজার বছর ধরে এই জাতি ঘাস দিয়ে তৈরি বাড়িতে থাকেন, ছুরি দিয়ে কৃষিক্ষেত চাষ করেন, ইস্পাতের তারের মাধ্যমে নদী অতিক্রম করেন। বলা যায়, বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন এই জাতি চরম দরিদ্রতার মধ্যে জীবনযাপন কাটান।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন সরকারের সহায়তায় তুলুং জাতির অধ্যুষিত এলাকায় রাস্তা, বিদ্যুত্ ও ইন্টারনেট ব্যবস্থা চালু হয়েছে, নির্মিত হয়েছে আবাসিক এলাকা। এসবের মধ্য দিয়ে স্থানীয় দারিদ্র্য-বিমোচন যুদ্ধে তারা এখন জয়লাভ করেছে। ২০১৮ সালে তুলুং জাতি পুরোপুরি দারিদ্র্যমুক্ত হয়। বলা যায়, তাদের আদিম সমাজ থেকে আধুনিক সমাজে রূপান্তর সম্পন্ন হয়।

একটি জাতির সংস্কৃতি সেই জাতির নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য, বিশ্বাস, আচার, অনুষ্ঠান, ধ্যান-ধারণা ইত্যাদি সামগ্রিক পরিচয় বহন করে। চীনের তুলুং জাতির দারিদ্র্যমুক্তির সফলতা রক্ষা আর সচ্ছল স্বপ্নের বাস্তবায়নে জাতির বৈশিষ্ট্যময় শিক্ষা ও উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। এ সম্পর্কে তুলুংচিয়াং জেলার স্কুলের প্রেসিডেন্ট ইয়াং সি ইয়াং মনে করেন, জাতীয় সংস্কৃতির আত্মবিশ্বাসের গঠন ও উত্তরাধিকার ছোটবেলার ক্লাস থেকে শুরু হবে। তুলুং জাতির ভাষা সংরক্ষণ করে দোভাষী শিক্ষাদানে সংস্কৃতির উত্তরাধিকারও উন্নত করতে হবে। তিনি বলেন,

'আমাদের উন্নয়ন যেন একটি পদক্ষেপের মাধ্যমে হাজার বছরের উন্নয়ন। আমাদের বাচ্চাদের জন্য ছোটবেলা থেকে জাতীয় ইতিহাস ভুলে না যাওয়ার জন্য দোভাষী শিক্ষাদান চালু করা হয়। তুলুং জাতির ভাষার অক্ষরের লেখা ও পড়া বুঝিয়ে দেওয়া হয়।'

প্রতি সপ্তাহে একদিন প্রতিটি বিষয়ে পড়ার ক্লাস থাকে, তখন চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা তুলুং ভাষায় বই পড়ে। স্কুলের দোভাষী শিক্ষক মা চিয়ান সিন ২০০৬ সালে এখানে চাকরি শুরু করেন। নিম্ন শ্রেণীর বাচ্চাদের চীনা ভাষা শেখান। ১০ বছর পর বর্তমানে দোভাষী শিক্ষাদানের উদ্দেশ্য তুলুং জাতির ভাষা মনে রাখা। শিক্ষক মা চিয়ান সিনের হাতে তুলুং ভাষার পাঠ্যপুস্তক কয়েকবার সংশোধন করা হয়। আগে শুধু তুলুং জাতির মৌখিক ভাষা ছিলো, তবে বর্তমানে বাচ্চারা সব জাতীয় ভাষা মনে রেখেছে। শিক্ষক মা চিয়ান সিন বলেন,

'আমাদের তুলুং জাতির ভাষা সংখ্যালঘু জাতির ভাষার অন্যতম। বাইরের ভিন্ন সংস্কৃতির প্রভাবে আমাদের ভাষা রক্ষা করা কঠিন একটি ব্যাপার। এখন স্কুলে ছাত্রছাত্রীরা জাতীয় ভাষা খুবই কম বলে, সাধারণত বাসায় ফিরে গেলে জাতীয় ভাষা বলে। স্কুলে সবাই ম্যান্ডারিন ভাষা বলে, তাই এ ভাষা রক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে আমাদের জাতীয় ভাষা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে, উত্তরাধিকার করাও সম্ভব হবে না। অতীতে বাচ্চারা তুলুং জাতির সংগীত গাইতে পারতো, তবে আমরা এখন পারি না। কারণ এ সংস্কৃতি শেখার সুযোগ নেই।'

ভবিষ্যতে শিক্ষক মা তুলুং জাতির বৈশিষ্ট্যময় গান সংগ্রহ করতে চান, যাতে ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের শেখানো যায়। স্কুলে প্রতি রোববার বিকেলে দুটি হস্তশিল্পকর্ম-বিষয়ক ক্লাস চালু করা হয়, তাতে হস্তশিল্পকর্মীরা বাচ্চাদের তুলুং জাতির কম্বল বয়ন আর রুটির চুপড়ি তৈরির পদ্ধতি বুঝিয়ে দেন।

প্রতি মঙ্গলবার, বৃহস্পতিবার ও শনিবার খেলার মাঠে একসাথে তুলুং জাতির লোকজন নৃত্য করে। তারা গান গাওয়া ও নৃত্য করা খুবই পছন্দ করে। প্রতিটি উত্সব বা কাজের সময় সবাই একসাথে আনন্দের সঙ্গে নৃত্য করে। তুলুং জাতির বাচ্চারাও মিষ্টি হাসিমাখা মুখে নৃত্য করে।

খেলার মাঠের পাশে একজন ফর্সা লম্বা ছেলেকে হাতে ছবি ও বই নিয়ে বাচ্চাদের নৃত্য উপভোগ করতে দেখা যায়। তার নাম মা কুও সিয়ান। তিনি ইউয়ুননান বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন। গত ছয় মাস ধরে তিনি দূরবর্তী এলাকায় শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করছেন। তার জন্মস্থান শানতুং প্রদেশে। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি তুলুংচিয়ান জেলায় আসেন, এরপর স্থানীয় অঞ্চলের রহস্যময় সংস্কৃতি তাকে ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করে। জাতীয় পোশাক ডিজাইন-বিষয়ের একজন স্নাতক হিসেবে তিনি ইউয়ুননান প্রদেশের বৈশিষ্ট্যময় 'টাই ডাইং' দিয়ে তুলুং জাতির উপাদান সংমিশ্রণ করতে চান। তিনি বলেন,

'আমি তাদের 'টাই ডাইংয়ের' পদ্ধতি বুঝিয়ে দিতে চাই, কারণ এটি চীনের অবৈষয়িক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের অন্যতম। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে তুলুং জাতির বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা ও সৃজনশীল কাজ করা যাবে। অনেক গ্রামবাসী তুলুং কম্বল তৈরি করেন, আমি ভাবি যে কিভাবে ইউয়ুননানের টাই ডাইং দিয়ে নব্যতাপ্রবর্তনের কাজ করতে পারি। বিশ্বে শুধুমাত্র একটি তুলুং জাতি আছে, তারা প্রথমবারের মতো এ পদ্ধতিতে জাতীয় উপাদান তৈরি করেন।'

২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে শিক্ষক মা স্কুলের প্রেসিডেন্ট ইয়াং ও ইউয়ুননান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছিশুই ডিজাইন একাডেমির কাছে প্রস্তাব জমা দেন এবং অর্থায়নের আবেদন করেন। শিক্ষক মা বলেন,

'আমি দু'পক্ষের কাছে প্রস্তাব দেওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ইয়াং ও আমাদের একাডেমি উভয়েই সমর্থন প্রকাশ করে। শীতকালীন ছুটি থেকে বিভিন্ন কাঁচামাল কেনা শুরু হয়, এরপর ক্লাসরুম সাজানো হয়।'

এ ক্লাস চালু করার পর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা দেয়। ছাত্রছাত্রীদের চাহিদা পূরণে ৪০ জনকে তিনটি ক্লাসে ভাগ করা হয়, প্রতি সপ্তাহে ১০টি ক্লাস আয়োজন করা হয়। দুপুরে বিশ্রামের সময়ও তিনি আন্তরিকভাবে ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনায় সহযোগিতা করেন। কারণ বাচ্চাদের কল্পনার দক্ষতায় তিনি অবাক হন। খুব সম্ভবত এটি তুলুং জাতির বিশেষ সৌন্দর্যের প্রকাশ। মা বলেন,

'আমার মনে হয় তাদের চিত্রাঙ্কন অসাধারণ। তুলুং জাতির বিষয় তাদেরকে চিত্রাঙ্কন করতে বলি, যেমন- তুলুং নদীর একটি অংশ বা তাদের চোখে তুলুং নদী। তাদের চিত্রাঙ্কনের মাধ্যমে অনেক মজার প্রতীক দেখা যায়। যেমন-তাদের অঙ্কনে নিয়মিতভাবে গরুর মাথা ও উল্কি দেখা যায়, তাদের চোখে উল্কি মৌচাকের মতো।'

লুংইউয়ান গ্রামের পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী হুং ইউ ফাং তুলুং জাতির 'উল্কি মেয়ে'-র ছবি আঁকে। সে বলে,

'কারণ এটি আমাদের তুলুং জাতির বৈশিষ্ট্য। আমার নানা ও মায়ের চেহারায় উল্কি আছে। এটি আমার জন্য বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ, তা তুলুং জাতির প্রতীক।'

পঞ্চম শ্রেণীর আরেকজন ছাত্রী ওয়াং জিন হুয়া'র তৈরি 'মৌচাক'-র ছবিও দারণ সুন্দর। তার চিত্রাঙ্কনে তুলুং জাতির বিশেষ প্রাচীন গোলাকারের মৌচাকের ছবি ফুটে উঠেছে। ওয়াং জিন হুয়া বলে,

'এটা মৌচাক, আমার বাবা কয়েকটি মৌচাক তৈরি করেন, এতে মৌমাছিরা উড়ে আসে। এ ছোট গুহা থেকে মৌমাছিরা মৌচাকের ভিতরে যায়।'

শিক্ষক মা মনে করেন, যদিও ইউয়ুননানের ই জাতির মতো তুলুং জাতির বিশেষ উল্কির ডিজাইন নেই, তবে তাদের রীতিনীতি রয়েছে, তা তাদের জাতির জন্য শ্রেষ্ঠ বিষয়। বাচ্চাদের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনে তিনি কয়েক ধরনের শিল্পকর্ম তৈরি করেন। ২০০৬ সালে 'কাছুয়েইওয়া উত্সব' চীনের প্রথম দফার অবৈষয়িক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারে তুলুং জাতির বিশেষ দিবস হিসেবে নির্ধারিত হয়। তুলুং জাতির এ বিশেষ উত্সবের রীতিনীতি বাটিক ও টাই ডাইংয়ের পদ্ধতিতে তুলে ধরেন শিক্ষক মা।

এভাবে বাচ্চারা নিজ জাতির সংস্কৃতির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় মনে রাখতে এবং অন্যদের কাছে নিজ জাতির বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতে সক্ষম। তুলুং জাতির বাচ্চারা একটু শান্ত, তবে বিশেষ চিত্রকলার মাধ্যমে সৃজনশীলতা সম্পর্কে তাদের ব্যাপকভাবে উত্সাহ দেওয়া হয়েছে। তাদের জন্য শিল্পকলা প্রদর্শনী আয়োজন করবেন শিক্ষক মা। তিনি বলেন,

'আমি এ কার্যক্রমকে দারিদ্র্য-বিমোচনের একটি পদক্ষেপ হিসেবে গঠন করতে চাই। যদিও এটি সহজ নয়, তবে আমি আমার অবদান রাখতে চাই। এ ক্লাস চালু করার পর আমি শিল্পকর্মের অন্য ভূমিকা পালন করতে চাই। প্রতি বছরের মে মাসে ছিশুই ডিজাইন একাডেমি ইউয়ুননান বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি শিল্পকলা উত্সব আয়োজন করে, এতে তুলুং জাতির বিশেষ কলাম থাকে। এ ক্লাসের মাধ্যমে শুধু বাটিক ও টাই ডাইং-বিষয়ক শিল্পকর্ম নয়, বরং চিত্রকলার অন্য শিল্পকর্মও প্রদর্শন করা সম্ভব। এ বিষয়টি আমার চিন্তাভাবনার মধ্যে রয়েছে।'

মে মাসের ছবি প্রদর্শনীর জন্য বিশেষ লোগো ডিজাইন করেন শিক্ষক মা। তুলুং গরুর মাথা টাই ডাইংয়ের পদ্ধতিতে ডিজাইন করা হয়, এতে বহুবর্ণ রঙয়ের ডিজাইন দেখা দেয়। এ লোগো বিশেষ ক্লাসের প্রতীক। তাঁর পড়াশোনার কাজ শেষ হলেও এ ক্লাস অব্যাহতভাবে থাকবে বলে আশা করেন মা।

তুলুং নদীর পাশে জাতীয় সংস্কৃতি রক্ষার সব প্রচেষ্টা দিন দিন ঘটছে। তা তুলুং জাতির দারিদ্র্য-বিমোচনের পর জাতীয় সংস্কৃতি রক্ষার পদক্ষেপ। এই পদক্ষেপগুলো তুলুং জাতির দীর্ঘকালীন সমৃদ্ধির জন্য সুযোগ বয়ে আনবে, যাতে যত দ্রুত সম্ভব সচ্ছল সমাজ বাস্তবায়ন করা যায়।


1  2  
© China Radio International.CRI. All Rights Reserved.
16A Shijingshan Road, Beijing, China. 100040