২০০৮ সালের পেইচিং অলিম্পিক গেমস ধীরে ধীরে আমাদের কাছে আসছে । চীনের ৪০ কোটি ছাত্রছাত্রী এবং বিশ্বের নানা দেশের ছাত্রছাত্রীদের ভালভাবে অলিম্পিক গেমস সংক্রান্ত জ্ঞান দেয়ার জন্য , পেইচিং অলিম্পিক গেমস কমিটি এবং চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে পেইচিংয়ের প্রাথমিক ও মাথমিক বিদ্যালয় এবং ২০০৮ পেইচিং অলিম্পিক গেমসে অংশগ্রহণকারী দেশের প্রাথমিক ও মাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে অলিম্পিক গেমস সংক্রান্ত "মৈত্রীর বন্ধন" নামক একটি কার্যক্রম চালাবে । পেইচিংয়ের ২০০টিরও বেশি স্কুল এ কার্যক্রমে অংশ নেবে । পেইচিং তুছেং এলাকার হোপিংলি প্রথম নম্বর প্রাথমিক বিদ্যালয় হচ্ছে তাদের মধ্যে অন্যতম । তারা বাংলাদেশের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সঙ্গে মৈত্রীর বন্ধন সম্পর্ক স্থাপন করে ২০০৮ সাল অলিম্পিক গেমসের আগে বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে । যাতে দু'দেশের ছাত্রছাত্রীরা মৈত্রী স্থাপন করার পাশাপাশি আরো বেশি অলিম্পিক জ্ঞান জানতে পারে । হোপিংলি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের বাংলাদেশ সম্পর্কে জানানোর জন্য , নতুন সেমিষ্টারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তারা চীনে বাংলাদেশ দূতাবাস এবং চীন আন্তর্জাতিক বেতারের বাংলা বিভাগকে আমন্ত্রণ করে বাংলাদেশকে জানুন শীর্ষক বিশেষ কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে ।
আমরা বিদ্যালয়ের সভাকক্ষে প্রবেশ করার পর দেখলাম সাদা বোর্ডে রাখা সুন্দর ডিজাইনের পত্রিকা । সেসব পত্রিকা পঞ্চম শ্রেণীর ক বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা ডিজাইন করেছে । এর বিষয় হল বাংলাদেশকে জানুন । ক্লাসের শিক্ষক ম্যাডাম লিউ চি ইং আমাদেরকে পরিচয় করিয়ে দিলেন । আমাদের ক্লাসের ছাত্রছাত্রীরা প্রথম শ্রেণী থেকেই কম্পিউটারের মাধ্যমে লেখাপড়া করেছে। তারা এখন পঞ্চম শ্রেণী পড়ছে । প্রত্যেকটি ছাত্রছাত্রী পত্রিকা ও আলোকচিত্র ফিল্ম তৈরী করতে পারে । গত সেমিষ্টার শেষে আমাদের স্কুল বাংলাদেশের একটি প্রাথমিক স্কুলের সঙ্গে মৈত্রীর বন্ধন স্থাপন করার খবর জানার পর , ছাত্রছাত্রীরা বাংলাদেশকে পরিচয় করানোর লক্ষে বিশেষ পত্রিকা তৈরী করতে শুরু করেছে । আজকের প্রদর্শনীতে শুধু পত্রিকা রয়েছে । তাছাড়া, তারা কম্পিউটারের সাহায্যে স্লাইডের মাধ্যমে আলোকচিত্র প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেছে । এখন আমরা একসাথে পত্রিকার সম্পাদকের কথা শুনবো ।
আমার নাম স্যু নুও, আমি পঞ্চম শ্রেণীতে ক বিভাগের ছাত্রী । আমি মনে করি আমার স্কুল এবং বাংলাদেশের প্রাথমিক স্কুল হচ্ছে মৈত্রীর বন্ধন স্কুল, আমরা বাংলাদেশের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে লেখাপড়া ও খেলাধুলা করে নিজেদের মধ্যে অর্জিত জ্ঞানের কথা বিনিময় করতে চাই । এ জন্য আমাদের পত্রিকায় আমি দু'দেশের জাতীয় পতাকা এবং জাতীয় প্রতীক একসাথে রেখেছি । তা দেখতে সুন্দর ও সুষম । তা ছাড়াও আমি বাংলাদেশের পশুপাখি, প্রাকৃতিক সম্পদ ও মুদ্রাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সম্পর্কেও পত্রিকায় তুলে ধরেছি । সুযোগ পেলে আমি বাংলাদেশ যেতে চাই ।
ছাত্রছাত্রীদের আরো বেশি বাংলাদেশকে জানার জন্য বাংলা বিভাগের পরিচালক ইউ কুয়াং য়ুএ ছাত্রছাত্রীদের জন্য বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ধর্ম, খাদ্যশস্য, রীতিনীতি , পরিবহন ব্যবস্থা এবং জাতীয় পাখি ও পশুসহ বিভিন্ন বিষয় জানিয়েছেন ।
ছাত্রছাত্রীরা ম্যাডাম ইউ'র কথা শোনার পর , আন্তরিকভাবে নিজেদের কথাগুলো বলেছেন এবং ২০০৮ সালের অলিম্পিক গেমসের অপেক্ষা করছে । পঞ্চম শ্রেণীর ক বিভাগের ছাত্রী চাও ইউ শান বলেছে: "
ম্যাডাম ইউ'র কথা শোনার পর, আমি জানতে পারলাম যে, বাংলাদেশের ছাত্রছাত্রীরা খুবই শিষ্টাচারসম্পন্ন ও মেঠাবী । আমরা তাদের সঙ্গে মৈত্রীর বন্ধন স্থাপন করার পর, ভালভাবে তাদের শিষ্টাচার শিখতে পারবো । শুনেছি বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের দৃশ্য খুবই সুন্দর এবং গ্রামাঞ্চলের মানুষ খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ ও আন্তরিক। বাংলাদেশে বিশ্বের সবচেয়ে দৈর্ঘ্য সাগরের বেলাভূমি আছে এবং অনেক নদীও আছে । এসব তথ্য আমার জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছে এবং ভালো লাগছে । ২০০৮ সালে পেইচিং অলিম্পিক গেমস আসন্ন হবে, পেইচিং'এর ছাত্রী হিসেবে আমি অলিম্পিক গেমসের স্বেচ্ছাকর্মী হতে চাই এবং বাংলাদেশের বন্ধুদের পেইচিংকে জানার জন্য ভালো পরিসেবা দেবো ।
ম্যাডাম ইউ'র পরিচয় ছাড়া, চীনে বাংলাদেশ দূতাবাসের দ্বিতীয় সচিব ফৈয়াজ মুর্শিদ কাজি এবং কয়েক জন বাঙ্গালী ছাত্রছাত্রী বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত গেয়েছেন । ছোট ছোট বন্ধুরা তা খুবই পছন্দ করেছে ।
এ অনুষ্ঠান শেষে বাঙ্গালী ছাত্রছাত্রীরা প্রাথমিক স্কুলের ছাত্রদের সঙ্গে মজার বাস্কেটবল প্রতিযোগিতা করেছে । যদিও তাদের বয়স কম, কিন্তু তাদের বাস্কেটবলের মান পেইচিংয়ের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে শীর্ষ স্থানে রয়েছে ।
আনন্দময় পরিবেশের মধ্য দিয়ে প্রতিযোগিতাটি শেষ হয় । এবারের কার্যক্রম বাঙ্গালী ছাত্রছাত্রীদের হৃদয়ে গভীর ছাপ ফেলেছে । পেইচিংয়ে লেখাপড়া করা বাঙ্গালী ছাত্র গালিব সাত্তার বলেছে, হোপিংলি প্রাথমিক স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা বাঙ্গালী বন্ধুদের সঙ্গে বাস্কেটবল খেলার সময় জন্য খুবই আনন্দ পেয়েছে । তারা বলেছে , আমরা মনে করি তাঁরা ভালভাবে বাস্কেটবল খেলতে পারেন । কিন্তু তখন খুব উত্তেজনাময় মনে হয় । আমি বাংলাদেশকে পছন্দ করি, সুযোগ পেলে সেখানে যেতে চাই ।
এবারের কার্যক্রম সম্পর্কে বাংলাদেশ দুতাবাসের দ্বিতীয় সচিব ফৈয়াজ বলেছেন, এবারের কার্যক্রমের উদ্যোক্তা হোপিংলি প্রথম নম্বর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষয়িত্রী ম্যাডাম থেং ইয়া চিয়ে কার্যক্রমের তাত্পর্য সম্পর্কে বলেছেন ,
আজ আমাদের খুবই ভালো লাগছে যে, বাংলাদেশের প্রাথমিক স্কুলের সঙ্গে মৈত্রীর বন্ধন স্কুল স্থাপন করতে পেরেছি । আমি মনে করি , বিভিন্ন দেশের মধ্যে বিনিময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ, আশা করি আজকের কার্যক্রমের মাধ্যমে আমাদের ছাত্রছাত্রীরা আরো বেশি বৈদেশিক সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারবে ।
আমরা এবং বাংলাদেশের প্রাথমিক স্কুলের বিনিময় কার্যক্রমের ছাত্রছাত্রীরা বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও রীতিনীতি জানার পাশাপাশি ভালভাবে পেইচিংয়ের ইতিহাসও জানতে পারবে । এভাবেই তারা বাঙ্গালী বন্ধুদের জন্য পেইচিংকেও পরিচয় করিয়ে দেবে । অলিম্পিক গেমসের মৈত্রীর বন্ধন স্কুলে পরিণত হতে পারায় আমরা খুব খুশি ।
পেইচিং অলিম্পিক গেমসকে স্বাগত জানানোর জন্য স্কুলের ভবিষ্যত বিস্তারিত পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেছন, আজ হচ্ছে আমাদের প্রথমবার বাঙ্গালী বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের দিন । আমি দেখেছি, আমাদের ছাত্রছাত্রীরা বাংলাদেশের আরো বেশি তথ্য জানতে আগ্রহী । ভবিষ্যতে আমরা অন্যান্য কার্যক্রমও আয়োজন করবো । যেমন পেইচিংয়ে অবস্থানরত বাঙ্গালী শিশু, ছাত্রছাত্রী এবং বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মীদের সঙ্গে সম্মিলিত কর্মসূচীর আয়োজন । ১৪ এপ্রিল পয়লা বৈশাখে হবে বাংলাদেশের নববর্ষ, তখন আমরা বাংলাদেশ দূতাবাসের উদযাপন অনুষ্ঠানে অংশ নেবো।২০০৮ অলিম্পিক গেমস চলাকালে বাংলাদেশের খেলোয়াড়গণ পেইচিংয়ে আসলে, আমরা তাঁদের আমন্ত্রণ করে স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে মহাপ্রাচীরে যাবো, চীনের ডাম্পলিং খাবো এবং অলিম্পিক গ্রামে প্রবেশ করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেবো । সুযোগ পেলে আমরা ছাত্রছাত্রীদেরকে কয়েকটি বাংলা বাক্য , শব্দ এবং সম্ভব হলে গানও শেখাবো, যাতে বাঙ্গালী বন্ধুদের খুব সহজে আমাদের বোঝা সম্ভব হয় ।
তা ছাড়া হোপিংলি প্রাথমিক স্কুল তুংছেং এলাকার শিক্ষা কমিটির বৈদেশিক কার্যালয়ের মৈত্রীর বন্ধন কার্যক্রম বিষয়ক দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা তুয়ান কো চেং বিশেষ অতিথি হিসেবে কার্যক্রমে অংশ নেয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছেন । এবারের কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি বলেছেন, মৈত্রীর বন্ধন পরিকল্পনা হচ্ছে তুংছেং এলাকার শিক্ষা কমিটি নির্ধারিত ছাত্রছাত্রীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষামূলক বিষয় । আজকের কার্যক্রম হচ্ছে এ পরিকল্পনার একটি দৃষ্টিনন্দন শুরু । পেইচিং সরকারের নেতৃবৃন্দরা চীনের শিক্ষার অবস্থা অনুযায়ী মৈত্রীর বন্ধন পরিকল্পনা ছাত্রছাত্রীদের অলিম্পিক সম্পর্কে আরো বেশি জানানোর জন্য সহায়ক উদ্যোগ নিচ্ছে এবং আগামী বছর পেইচিং অলিম্পিক গেমসের আয়োজনের জন্য প্রস্তুতিমূলক কাজও করছে । আজ হচ্ছে আমার অংশ নেয়া প্রথম অলিম্পিক মৈত্রীর বন্ধন কার্যক্রম । এ সেমিষ্টার তুংচেং এলাকার অন্যান্য স্কুলেও অব্যাহতভাবে এ ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে । অলিম্পিক গেমসের আগে আমরা বিভিন্ন দেশের বন্ধুদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় বিনিময় করবো । অলিম্পিক গেমস চলাকালে আমাদের ছাত্রছাত্রীরা খেলোয়াড়দের নৈপূণ্য প্রদর্শনে উত্সাহ দেয়ার জন্যে উল্লাস করবে ।
দেখতে দেখতে চমত্কার কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে কখন যে ছাত্রছাত্রীদের হাসিখুশিতে সময় পার হয়ে গেছে বুঝতে পারি নি । আমি বিশ্বাস করি আজ হচ্ছে একটি ভালোলাগার মত প্রশগনীয় শুরু । আমরা আশা করি ভবিষ্যতে চীন ও বাংলাদেশের ছাত্রছাত্রীরা আরো বেশি বিনিময় ও যোগাযোগের মাধ্যমে ২০০৮ পেইচিং অলিম্পিক গেমস এবং চীন ও বাংলাদেশের দীর্ঘায়ু কামনা করে মৈত্রীর জন্য আরো বেশি অবদান রাখবে।
|