v চীন আন্তর্জাতিক বেতারv বাংলা বিভাগv চীনের বিশ্ব কোষ
China Radio International
পর্যটনসংস্কৃতিবিজ্ঞানখেলাধুলাকৃষিসমাজঅর্থ-বাণিজ্যশিক্ষার আলো
চীনা সংবাদ
বিশ্ব সংবাদ
চীনের কণ্ঠ
সংবাদ ব্যক্তিত্ব
সংবাদের প্রেক্ষাপট
নানা দেশ
কুইজ
আবহাওয়া

মহা মিলন ২০০৮ পেইচিং অলিম্পিক গেমস

ভয়াবহ ভূমিকম্প দক্ষিণ-পশ্চিম চীনে আঘাত হেনেছে

লাসায় ১৪ মার্চ যা ঘটেছিল

ইয়ুন নান প্রদেশ

দক্ষিণ এশিয়া

তৃতীয় নয়ন
আরো>>
(GMT+08:00) 2006-09-27 21:07:29    
রিকশাওয়ালা ছেং ফিং

cri
    ২০০৬ সালের ৫ জুলাই ৪০ বছর বয়সী ছেং ফিংয়ের জন্যে একটি বিশেষ দিন ছিল । কেননা বিশ বছরের নিরলস প্রচেষ্টা ও দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার পর শেষ পর্যন্ত তিনি মাস্টার ডিগ্রী পড়ার সুযোগ পেয়েছেন । একজন রিকশাওয়ালা থেকে তিনি একজন মাস্টার ডিগ্রীর ছাত্র হয়েছেন । কি করে এটা সম্ভব হয়েছে । আজকের অনুষ্ঠানে তার কাহিনী শোনাচ্ছি আমি শি চিং উ ।

    গত এপ্রিল মাসের এক দিন । ইয়ুন নান বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজিত মাস্টার ডিগ্রীর ছাত্রদের এক ভর্তি পরীক্ষায় একজন বয়স্ক শিক্ষার্থী পরীক্ষকতদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে । এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক , এবারের পরীক্ষার প্রধান পরীক্ষক লিন ছাও মিন তখনকার দৃশ্য বর্ণনা করে বলেছেন ,

    সেসময় আমি তাকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছিলাম । পেশায় তার ভালো জানাশোনা আছে । তাছাড়া তার দৃঢ় মনোবল রয়েছে । আমি তার এই মনোবলের খুবই প্রশংসা করি । তার প্রচেষ্টা ও অধ্যবসায় দেখেও আমি মুগ্ধ হয়েছি ।

    অধ্যাপক লিন যে শিক্ষার্থীর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন , তার নাম ছেং ফিং । পরীক্ষায় তার অতুলনীয় আচরণ উপস্থিত পরীক্ষকদের মনে গভীর ছাপ ফেলেছে । পরীক্ষার পর ছেং ফিং অবাধে ইয়ুন নান বিশ্ববিদ্যালয়ের মানব ইন্সটিটিউটের জাতীয় ইতিহাস বিভাগের মাস্টার ডিগ্রী পড়ার ভর্তিপত্র পেয়েছেন । এর আগে তিনি উত্তর-পূর্ব চীনের চি লিন প্রদেশের চিউ থাই নগরে রিকশা চালিয়ে জীবনযাপন করতেন । তিনি ৬ বছর ধরে ঝড় ও বৃষ্টির মধ্যে রিকশা চালিয়েছেন ।

    ১৯৮৬ সালে ছেন ফিং উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল থেকে পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্যে পরীক্ষা দিলেন । তিনি ৫১০ পয়েন্ট পেলেন । এই পয়েন্ট চীনের সুবিখ্যাত পেইচিং বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্কালীন ভর্তির পয়েন্টকে ছাড়িয়ে গেল । অথচ ছেন ফিং চীনা গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্যে দরখাস্ত করেছিলেন । এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির পয়েন্ট পেইচিং বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়েও বেশি ছিল । অবশেষে তিনি এই দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনোটিতে পড়ার সুযোগ পেলেন না । তবে তার একজন সহপাঠী তার চেয়ে কম পয়েন্ট পেয়েও পেইচিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন । যখন তার সেই সহপাঠী পড়ার জন্যে রেল স্টেশনে গেলেন , তখন তিনি তাকে বিদায় দিতে গেলেন । তখনকার দৃশ্য এখনো তার মনে গেঁথে আছে । তিনি বলেছেন ,

    বিদায় নেয়ার সময় আমি ও তার বোন তার স্যুটকেস নিয়ে রেল স্টেশনে গেলাম । তখনকার দৃশ্য মুছে ফেলার মত নয় । তিনি চীনের প্রখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন । আমি ফেল করেছি । এই বিরাট ব্যবধান চিরদিন আমার মনে অম্লান হয়ে থাকবে ।

    এই কল্পনাতীত ফেল ছেন ফিংয়ের মনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে । এটা তার মনে কালো ছায়া ফেলেছে । তবে সেসময় থেকে তিনি নিজের জন্যে আরো উচ্চতর প্রত্যাশা - মাস্টার ডিগ্রী পড়ার অঙ্গিকার করেন ।

    তখন থেকে ছেন ফিং সুদীর্ঘ ও কঠোর পথে পদার্পণ করলেন । তার পরিবারের অবস্থা তেমন ভালো নয় । তাকে কাজ করার সংগে সংগে লেখাপড়া করতে হতো । অক্লান্তভাবে প্রচেষ্টা করেও তিনি বারবার ব্যর্থ হলেন । অথচ জীবনে তার দুর্গতি শুধু তাই ছিল না । ২০০০ সালে তিনি যে স্প্রিং কারখানায় কাজ করতেন , সেই কারখানা দেউলিয়া হয়ে বন্ধ হয়ে গেল । তারপর তিনি রিকশা চালিয়ে জীবনযাপন করতে শুরু করলেন । আস্তে আস্তে তিনি এই পেশার ভালো দিক টের পেলেন । কারণ রিকশা চালালে যেমন উপার্জন করা যায় , তেমনি তার বই পড়ার বেশি সময় পাওয়া যায় । এভাবে তিনি অল্প দিনের মধ্যে নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবেন । তিনি বলেছেন ,

    রিকশায় ওঠার যাত্রী না থাকলে আমার রিকশা আমার জন্যে এক স্বাধীন অবকাশ সৃষ্টি করে । আমি রিকশার কাছাকাছি বসে বই পড়তে পারতাম । যাত্রী থাকলে আমি রিকশা চালাতাম । যাত্রী না থাকলে আমি রিকশার পাশে দাঁড়িয়ে এক হাত রিকশায় রাখতাম , অন্য হাতে বই নিয়ে পড়তাম । রিকশা ভারী হলে আমি জানতে পারতাম যাত্রী এসেছে । তখন সংগে সংগে রিকশা চালাতাম ।

    ছেন ফিং বই পড়তে খুবই পছন্দ করেন । এটা তার সহকর্মীদের জানা ছিল । এই প্রসংগে তার সহকর্মী চাং পাও কোও বলেছেন ,

    ৬ বছর ধরে তার সংগে আমার পরিচয় আছে । রিকশা চালানোর সংগে সংগে তিনি লেখাপড়া করতেন । রিকশা নিয়ে যেখানে যেতেন , তিনি সেখানে বই পড়তেন । অনেক সময় যাত্রীতার রিকশায় ওঠার পরও তিনি টের পেতেন না। যাত্রী বললে পর তিনি রিকশা চালাতে শুরু করতেন ।সন্ধ্যায় যাত্রী না থাকলে তিনি সবসময় রাস্তার বাতির নীচে বই পড়তেন ।

    ছেন ফিংয়ের স্ত্রী লিউ চিং কোনো কোনো সময় তার অসন্তোষ প্রকাশ করতেন । তিনি বলেছেন ,

    অনেক সময় আমি নিজেও সহ্য করতে পারতাম না । তিনি বারবার ব্যর্থ হয়েছেন । দু:সংবাদ পেয়ে তিনি মাঝেমধ্যে কেঁদে ওঠতেন । তখন আমি বলতাম , এই পথ ছাড়া তোমার অন্য বিকল্প নেই ?

    স্ত্রীর সন্দেহ দেখে ছেন ফিং এমন উত্তর দিলেন । তিনি বলেছেন,

    একজন রিকশাওয়ালা হিসেবে আমি বেশি ভাবতে পারি না । ফেল করার সময় আমি সর্বদাই গান গেয়ে গেয়ে নিজেকে উত্সাহ দিতাম । গানের মর্ম এই : ঝড় ও বৃষ্টির মধ্যে আমার এটুকু বেদনা কিছু নয় । আমাকে চোখের জল মুছে ফেলতে হবে । সাধারণত আমি কাঁদি না । লাভ লোকসানের কথা ভাবার সময় আমার ছিল না । ব্যর্থ হওয়ার পরও আমাকে সামনে এগিয়ে যেতে হবে ।

    ছেন ফিংয়ের এই অধ্যবসায়ের ওপর বিভিন্ন লোকের ভিন্ন মনোভাব রয়েছে । কেউ কেউ মনে করে , ২০ বছরের সময় একজনের জন্যে অত্যন্ত মূল্যবান । তার সদ্ব্যবহার করা উচিত । কোনো কোনো লোক তার আচরণ উপলব্ধি করতে পারেন । ইয়ুন নান প্রদেশের রাজধানী খুয়েন মিং শহরের একজন নাগরিক ওই ছুন বলেছেন ,

    আমার মনে হয় , অর্থনৈতিক দিক থেকে তার বাছাইয়ের কোনো মূল্য নেই । তবে মানসিক দিক থেকে এর মূল্য আছে । অনেক সময় মানুষ সম্পূর্ণভাবে টাকার জন্যে বেঁচে থাকেন না । নিজের ওপর চ্যালেঞ্জ করে মানসিক অভিসন্ধি বাস্তবায়ন করতে পারলে অনেকে বড় আনন্দিত হন ।

    অন্য লোক যাই বলুক না কেন , ছেন ফিং ইয়ুন নান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্যে এখন মাল গুছানোর কাজে ব্যস্ত আছেন ।