গত আগষ্ট মাসে এথেন্সে অনুষ্ঠিত অলিম্পিক গেম্সে চীনের দৌড়বিদ লিউ সিয়াং ১১০ মিটার প্রতিবন্ধক দৌড়ে ১২.৯১ সেকেন্ড সময় নিয়ে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করে স্বর্ণপদক জয় করেছেন । অলিম্পিকের জন্মস্থানে , ২১ বছর বয়সী লিউ সিয়ান -- এক চীনা মানব ও এক এশিয়ার মানব , যিনি হলদে বর্ণের ক্রীড়াবিদদের দৌড়ে পিছিয়ে থাকার ইতিহাস অতিক্রম করেছেন । ' ওস্তাদ , আপনি চিন্তা করবেন না '। মাঠে প্রবেশের আগে লিউ সিয়াং তার ওস্তাদ সুন হাই পিংকে এ কথা বলেছেন । সুন হাই পিং তার কাঁধে মৃদু আঘাত করলেন । লিউ সিয়ান সহাস্য মুখে অলিম্পিক স্টেডিয়ামে প্রবেশ করলেন । ৭৫ হাজার দর্শক তাকে স্বাগত জানিয়েছেন , চুড়ান্ত প্রতিযোগিতা শুরু হলো। লিউ সিয়ান তার কোচ সুন হাই পিংকে ' ওস্তাদ ' ডাকতে পছন্দ করেন । কিন্তু দু জনের মধ্যকার সম্পর্ক বাবা ও ছেলের মতো । তাদের দুজনের মধ্যে প্রথম দেখা হয় ১৯৯৮ সালের গ্রীষ্মকালে । সুন হাই পিং দেখামাত্রই লিউ সিয়ানকে পছন্দ করলেন । সমবয়সী ছেলেদের মধ্যে লিউ সিয়াং বেশ লম্বা । তা সত্ত্বেও তার দৌড় দেয়ার কৌশল বেশী ভালো নয় , তবে ছন্দের অনুভুতি ভালো , এটা হলো জন্তগত সুবিধা । সুন হাই পিং মনে মনে লিউ সিয়ানকে প্রশিক্ষণ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন । লিউ সিয়ান দু বছর হাই জাম্প চর্চা করেছেন এবং সাংহাই শহরের তরুন বিজয়ী পুরস্কার পেয়েছেন । কিন্তু এক বার শরীর পরীক্ষার সময় ভূল করে ধারণা করা হয় যে লিউ সিয়াং বেশী লম্বা হবে না এবং মনে করা হয় যে তার শরীরের উপরের অংশ লম্বা আর কোমরের নীচের অংশ লম্বা নয় বলে হাই জাম্পের উপযোগী নয় । তাই তিনি ক্রীড়াস্কুল থেকে বের হলেন । এখন লিউ সিয়ানের উচ্চতা ১.৮৮ মিটার , তার হাত পাও লম্বা । শরীরের এই গড়ন দৌড়ের পক্ষে খুবই উপযোগী । ছোটবেলার সেই হালকা-পাতলা ছেলে যে অবশেষে এতো লম্বা হবে -- সুন হাই পিং ছাড়া আর কেউ জানতেন না ।  জন্মের সময় লিউ সিয়ানের ওজন ৪.৫ কেজি , তার বাবা মা হলেন সাংহাই শহরের ফুখুও অঞ্চলের সাধারণ শ্রমিক । বাবা লিউ শুয়ে গেন হলেন পানি কম্পানির গাড়ি চালক , মা চি ফেন হুয়া হলেন খাবার তৈরী কারখানার শ্রমিক । দু জনের কারো খেলার সংগে কোনো সম্পর্ক নেই । লিউ সিয়াং তাদের একমাত্র সন্তান । ভীষন আদরের ছেলে । পাছে ক্রীড়াস্কুলে লিউ সিয়ানের কষ্ট হয় , তাই তাকে বেশী খেলাধুলা করতে দিতেন না । তখন কোচ সুন হাই পিং খেলোয়াড়দের নিয়ে বাইরে প্রতিযোগিতার কাজে ব্যস্ত , প্রতিযোগিতার সময়ও লিউ সিয়ানের কথা তার মনে পড়ে । ফিরে এসে দেখেছেন লিউ সিয়ান ক্রীড়া স্কুল ছেড়ে দিয়েছেন । তিনি প্রথম বার তার সহকর্মীদের সংগে রাগ করলেন । তিনি সোজা লিউ সিয়ানের বাসায় গিয়েছেন । লিউ সিয়ানের বাসার সামনে তিনি লিউ সিয়ানের বাবার সংগে অনেকক্ষন কথা বলেছেন । তিনি লিউ সিয়ানের বাবাকে বলেছেন , লিউ সিয়ানের খুব ভালো প্রতিভা আছে , খেলা না করলে খুব দুঃখের ব্যাপার হবে । ফলে তার বাবা রাজী হলেন , তবে তার একটি অনুরোধ হলো লিউ সিয়ান শুধ সুন হাই পিনের কাছ থেকে শিখবেন । কয়েক দিন পর তার বাবা গাড়ী চালিয়ে লিউ সিয়ানকে সুন হাই পিংয়ের হাতে তুলে দিলেন । তখন থেকে লিউ সিয়ান উড়ার মতো দৌড় দেয়ার স্বপ্ব দেখতে শুরু করেন । লিউ সিয়ান প্রতিবন্ধক দৌড় ইভেন্টের একজন দুর্লভ প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদ । ২০০২ সালে লিউ সিয়ান প্রথম বারের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় তার যোগ্যতা দেখিয়েছেন । ২০০২ সালের জুলাই মাসে সুইজারল্যান্ডের লুজানে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ট্র্যাক ইউনিয়ানের গ্রা- প্রী প্রতিযোগিতায় তিনি ১৩.১২ সেকেন্ড সময় নিয়ে ১১০ মিটার প্রতিন্ধক দৌড়ে এশিয় রেকর্ড ভংগ করেছেন । বার্মিংহাম বিশ্ব প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার আগে লিউ সিয়ান জেনিভায় অনুষ্ঠিত ইন্ডোর দৌড়-ঝাপ-নিক্ষেপ গ্রাঁ-প্রী প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়েছেন । তিনি সেখানে ৭.৫২ সেকেন্ড সময় নিয়ে ৬০ মিটার প্রতিবন্ধক দৌড়ে নতুন এশিয় রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন । লিউ সিয়ান এই দ্বিতীয় বার এথেন্সে গিয়েছেন । ২০০২ সালে তিনি এথেন্সের শান্তি ও মৈত্রী জিমন্যাসিয়ামে আন্তর্জাতিক ইন্ডোর দৌড়-ঝাপ-নিক্ষেপ প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়েছেন । ভুল বিচারের কারনে তিনি প্রতিযোগিতা ত্যাগ করেছেন । তখন বিজয়ী ছিলেন আলান জোন্স । এবারের অলিম্পিক গেম্সে যখন আলান জোন্স প্রতিযোগিতার সময় হোচট খেয়ে মাটিতে পড়েন , তখন তিনি বুঝেছেন যে লিউ সিয়ানের যুগ এসেছে । লিউ সিয়ান বাবা মাকে খুব ভালোবাসেন । কিন্তু তার বাড়ী ফিরে যাওয়ার সুযোগ খুবই কম । প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার আগে সুন হাই ফিন তাকে বাড়ীর কথা বলতে পছন্দ করেন , এতে লিউ সিয়ানের মন হালকা হতে পারে । প্রত্যেকবার বিদেশে গেলে লিউ সিয়ান বাবা মার জন্য অনেক উপহার কেনেন , তিনি মার জন্য কসমেটিক্স কেনেন , তিনি বলেছেন , এই সব কসমেটিক্স ব্যবহার করে তার মা কম বয়সী দেখাবেন । লিউ সিয়ান এক লক্ষী ছেলে , এটা সবাই জানেন । ২০০২ সালে তার দাদী মৃত্যু বরণ করেন । তখণ তিনি নবম জাতীয় গেম্সে ছিলেন । তার বাবা মা তাকে এই দুঃসংবাদ দেন নি । পরে তিনি এই খবর পেয়ে সারা রাত কেদেছেন । লিউ সিয়ান এখনও প্রেম করেন নি । আজ পর্যন্ত কোনো মেয়ের সংগে কথা বললে তার মুখ লাল হয় । তিনি বলেছেন , বাবা মাকে যত্ন নেবেন --এমন এক প্রেমিকা তিনি খুজবেন । অলিম্পিক গেম্সে স্বর্ণপদক পাওয়ার পর তার প্রথম কাজ হলো বাবা মাকে ফোন করে সুখবর জানানো ।তা বাবা-মা আর সারা পৃথিবীর নাগরিকরা দেখেছেন লিউ সিয়ান লাফ দিয়ে পুরস্কার নেয়ার মঞ্চে উঠেছেন , তার আরো দেখেছেন লিউ সিয়ান জাতীয় পতাকা গায়ে দিয়ে হাত নেড়ে নেড়ে হেসেছেন ।
|