Web bengali.cri.cn   
কুয়াং তুং প্রদেশের লিয়ান নান ইয়াও জাতির স্বায়ত্তশাসিত জেলার লিয়ান সুই গ্রাম
  2015-12-02 14:48:28  cri


কুয়াং তুং প্রদেশের ছিং ইউয়ান শহরের লিয়ান নান ইয়াও জাতির স্বায়ত্তশাসিত জেলার লিয়ান সুই একটই গ্রাম। এ গ্রামের জমি খুবই অনুর্বর। এখানে পাহাড়-পর্বত বেশি। ২০০৮ সালের আগে এখানে শুধু প্রবীণ ও শিশু দেখা যেতো। গ্রামটি ছিল দ্ররিদ্র এক সংখ্যালঘু জাতির আবাসস্থল। ২০০৯ সালে কুয়াং তুং প্রদেশে শুরু হয় বিশেষ দারিদ্র্য বিমোচন ও উন্নয়ন প্রকল্প। সরকারের সাহায্যে গ্রামের রাস্তা পুনর্গঠন করা হয় এবং পরিবেশ উন্নত করা হয়। গ্রামবাসীরাও পাহাড়ের উপর থেকে নেমে আসে সমতল ভূমিতে। তারা অর্থকরী ফসল চাষ শুরু করে; শুরু করে গেস্ট হাউস ব্যবসা।

লিয়ান নান ইয়াও জাতির স্বায়ত্তশাসিত জেলা সান পাই উপজেলার উপ-প্রধান এবং লিয়ান সুই গ্রামের প্রধান পান চে হুই বলেন, কুয়াং তুংর প্রাদেশিক সরকারের সমর্থনে বিগত কয়েক বছরে সিয়ান সুই গ্রাম অনেক উন্নত হয়। তিনি বলেন, "গ্রামের বার্ষিক মোট আয় আগের ৪০ হাজার ইউয়ান থেকে বেড়ে ২ লাখ ২৫ হাজার ইউয়ানে দাঁড়িয়েছে।"

গ্রামবাসী এখন মূলত চার ধরনের কাজ করে। তারা রেশমগুটির চাষ করে, ক্যামেলিয়া চাষ করে, বন্য শূকর লালন-পালন করে এবং গেস্ট হাউস ব্যবসা পরিচালনা করে। তবে এ চার প্রকল্প শুরুর আগে, গ্রামবাসীরা এ সম্পর্কে ছিল অজ্ঞ। শুরুর দিকে তারা এসব কাজে অংশ নিতে অনিচ্ছুক ছিল। তাই শুরুর দিকে লিয়ান সুই গ্রামের নেতাকে নিয়ে একটি দল প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সেই দল এসব কাজ শরু করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। গ্রামের প্রধান পান চিয়ে হুই বলেন, "অনেক গ্রামবাসী ঝুঁকি নিতে চাননি। তাই আমরা প্রথমে এ প্রকল্পগুলোতে কাজ করি। আমাদের সাফল্য বাকিদের অনুপ্রাণিত করেছে এসব কাজ করতে।"

গ্রামের নেতার নেতৃত্বে বর্তমানে লিয়ান সুই গ্রামের ১০টি পরিবার গেস্ট হাউস ব্যবসা করছেন। ৩৬ বছর বয়সী গ্রামবাসী থাং হাও সান কুই একটি গেস্ট হাউসের মালিক। বাইরে ১২ বছর মতো কাজ করেন থাং হাও সান কু। মাত্র গত বছরের পয়লা জানুয়ারি তিনি নিজের জন্মস্থানে ফিরে আসেন এবং শুরু করেন গেস্ট হাউস ব্যবসা। তার বাসায় পর্যটকদের জন্য বৈশিষ্টপূর্ণ গ্রামীণ খাবারের ব্যবস্থা আছে; আছে থাকার সুব্যবস্থা। পর্যটকরা এখান থেকে গ্রামীণ পণ্যও ক্রয় করতে পারেন। বর্তমানে তার গড় বার্ষিক আয় বেড়েছে ৮ হাজার ইউয়ানের চেয়ে বেশি। তার গেস্ট হাউএ হংকং ও কুয়াং চৌসহ নানা জায়গার পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। থাং হাও সান কুই বলেন, "আমার গেস্ট হাউসে যে চীনাবাদাম, মিষ্টি আলু, মিষ্টি কুমড়া ও ভুট্টা পাওয়া যায়, তার সবই আমি নিজে উত্পাদন করি। প্রতি বছর বিশেষ উত্সব ও দিবসে আমাদের কৃষিপণ্য ভালো বিক্রি হয়। আমার গেস্ট হাউসে এক দিন থাকলে ৫০ ইউয়ান দিতে হয়। তবে বিশেষ উত্সবে ভাড়া ১২০ ইউয়ান পর্যন্ত হয়। যদি কোনো পর্যটক আমার এখানে খেতে চান, তবে তাকে আরও ৪০ থেকে ৫০ ইউয়ান ব্যয় করতে হবে। প্রতিবার খাবারের সময় আমি অন্তত ৮টি ডিস সরবরাহ করি। গত মে মাসে হংকংয়ের একটি গ্রুপ আমার গেস্ট হাউসে এক সপ্তাহের মতো ছিল। তারা আমাকে বলেছে, সুযোগ পেলে তারা এখানেই থেকে যেত।"

গ্রামে সাংবাদিকদের সঙ্গে দেখা হয় একজন পর্যটক ট লি'র সঙ্গে। তিনি হে নান প্রদেশ থেকে নিজে গাড়ি চালিয়ে এসেছেন লিয়ান সুই গ্রামে। তিনি তার ভ্রমণের অভিজ্ঞতা শেয়ার করলেন এভাবে, "আমি ইন্টারনেট থেকে লিয়ান সুই গ্রাম সম্পর্কে জেনেছি। আমার বন্ধুরাও এ জায়গা সম্পর্কে ভালো কথা বলেছে। তারা বলেছে, কুয়ান চৌ শহরের কাছে এ গ্রাম খুব সুন্দর ও বৈশিষ্টপূর্ণ। আমি নিজেও এখানে এসে দেখলাম সবই খুব সুন্দর।"

গেস্ট হাউস ছাড়া, চার প্রকল্পের মধ্যে রেশমগুটির চাষ এবং তুঁত গাছ চাষ শিল্পও দিন দিন উন্নত হচ্ছে। থাং ইয়া মু কুই ৫ বছরের মতো রেশমগুটির চাষ করছেন। তার বাত্সরিক আয় ২০-৩০ হাজার ইউয়ান বেড়েছে। থাং ইয়া মু কুই বলেন, "প্রতি বছরের মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত রেশমগুটি চাষ করি। তুঁত গাছের পাতা প্রতি কেজির দাম ৩২ ইউয়ান এবং প্রতি বছর তুঁত গাছের পাতা বিক্রি করলে আমি পাই ২৫ হাজার ইউয়ান। তা ছাড়া, তুঁত গাছের পাতা রান্না করা হয় বলে রেস্তোরাঁগুলোও এ পাতা আমার কাছ থেকে ক্রয় করে।"

লিয়ান সুই গ্রামের চার প্রকল্প একদিকে গ্রামবাসীদের আয় বৃদ্ধি করেছে এবং তাদের জীবনমানও উন্নত করেছে। তবে এখানে ঐতিহ্যিক সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং আধুনিকায়নের মধ্যে রয়েছে কিছুটা দ্বন্দ্ব। যেমন, ইউয়াও জাতির প্রবীণরা পাহাড়ে বসবাস করতেন। পাহাড়ের নীচে আসায় তাদের আচার-ব্যবহার ও রীতি-নীতিতে পরিবর্তন হয় এবং ঐতিহ্যিক সংস্কৃতি বিলুপ্ত হয়ে যায়। অন্যদিকে, সারা চীন এখন আধুনিকায়ন ও উন্নয়নের পথে রয়েছে বলে ইয়াও জাতির গ্রামকেও একই পথ অবলম্বন করতে হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে সাংবাদিক Party School of the Central Committee of CPC-র আন্তর্জাতিক কৌশল গবেষণালয়ের অধ্যাপক লি ইউয়ুন লংকে জিজ্ঞেস করেন। অধাপ্যক লি চীনে মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষজ্ঞ। একবার তিনি লিয়ান সুই গ্রামের দারিদ্র্য-বিমোচন প্রকল্প পরিদর্শন করেন। ঐতিহ্যিক সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও আধুনিকায়নের দ্বন্দ্ব সম্পর্কে তিনি বলেন, "দরিদ্র ও অনুন্নত প্রাকৃতিক পরিবেশসম্পন্ন এলাকাকে উন্নত করতে হলে উক্ত এলাকার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমাদের উচিত দু'দিক থেকে ব্যাপারটি বিবেচনা করা। একদিকে, এটা সমাজের উন্নয়ন। পাহাড়ে ইয়াও জাতির উন্নয়ন সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে, ইয়াও জাতির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা উচিত। তবে এ সংরক্ষণ মানে হবে সমাজের আধুনিকায়নের সাথে সাথে ঐতিহ্যের ভিত্তিতে নতুন সংস্কৃতি জন্ম দেওয়া।"

অধাপ্যক লি ইউয়ুন লংয়ের বিশ্লেষণ অনুসারে, বর্তমানে চীনে দ্রুত আধুনিকায়ন হচ্ছে এবং ইয়াও জাতির ঐতিহ্যিক জীবনযাপন নীতি ও আধুনিকায়নের মধ্যে দ্বন্দ্ব অনিবার্য। এ অবস্থায় বিভিন্ন পক্ষের উচিত ইয়াও জাতির মানুষকে সাহায্য করা এবং তাদের মূল সংস্কৃতির ভিত্তিতে আধুনিকায়ন বাস্তবায়ন করা।

লি ইয়ুন লং আরও বলেন, "যদি এ উন্নয়নের প্রক্রিয়া একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া হয় তাহলে লাগে দীর্ঘ সময়। সবার জন্য এ পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া সহজতর হয়। কারণ, তারা এ পরিবর্তনকে প্রাকৃতিক একটি প্রক্রিয়া মনে করে। তবে আধুনিক সমাজে এ সব পরিবর্তন দ্রুত ঘটে। তার মানে দশ-বারো বছরে ঘটে যায় শত বছরের পরিবর্তন। তখন এ পরিবর্তন অনেকের জন্যই সহজে গ্রহণ করা মুশকিল হয়। ইয়াও জাতির মানুষ বা সরকার—দু'পক্ষেরই উচিত আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ায় ঐতিহ্যিক সংস্কৃতি সংরক্ষণের জন্য প্রচেষ্টা চালানো।"(শিশির)

সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন
মন্তব্য
Play
Stop
ওয়েবরেডিও
বিশেষ আয়োজন
অনলাইন জরিপ
লিঙ্ক
© China Radio International.CRI. All Rights Reserved.
16A Shijingshan Road, Beijing, China. 100040