লামা ধর্ম ও হুয়াং ধর্মের মন্দির ইয়োনহে ভবন


       পেইচিংয়ে অনেক বৈশিষ্ট্যময় প্রাচীন স্থাপত্য কর্ম আছে । তবে হান , মান , মঙ্গোলিয় আর তিব্বত এই চারটি জাতির বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন প্রাচীন স্থাপত্য শুধু একটি , তাহলো ইয়োনহে ভবন ।  

  ইয়োনহে ভবন হলো বিখ্যাত তিব্বতী বৌদ্ধধর্মের মন্দিরগুলোর অন্যতম। মন্দিরটির মোট আয়তন ৬০ হাজার বর্গকিলোমিটার । এতে প্রায় এক হাজার ছোট বড় ঘর আছে । ছিং রাজবংশের দ্বিতীয় রাজা খানসি ১৬৯৪ সালে তার চতুর্থ ছেলে ইংচেনের জন্য ইয়োনহে ভবন নির্মাণ করেন । ১৭২৩ সালে ইংচেন রাজা হন । তাই তিনি রাজপ্রাসাদে থাকতে শুরু করেন । ইংচেন ইয়োনহে ভবনের অর্ধেক ভাগ তার অন্যতম প্রাসাদ হিসেবে ব্যবহার করেন , বাকী অর্ধেক ভাগ হুয়ান ধর্মের মন্দির হিসেবে লামা চানচিয়াহুথুকেথুকে উপহার দেন । 

  হুয়াং ধর্ম লামা ধর্মের একটি শাখা । তার প্রতিষ্ঠাতা রোপোচাই চাকবা আট বছর বয়সেসন্ন্যাসী হন । ( তাঁর আরেক নাম রোসানচাপা , খৃষ্টীয় ১৩৫৭ সালে তার জন্ম , ১৪১৯ সালে তার মৃত্যু হয় ) সতের বছর বয়সে তিনিলামা ধর্ম গবেষণা করতে তিব্বতে যান , পরে এই ধর্ম তিব্বতের ক্ষমতাসীন ধর্মে পরিণত হয় । এই ধর্মের লোকেরা হলুদ রংয়ের পোশাক পরেন বলে লামা ধর্মকে হুয়ান ধর্মও বলা হয় । রোপোচাই চাকবা লামা ধর্মের সংস্কারে বিরাট অবদান রেখেছিলেন । দালাইলামা ও পেচেন দুজনই তার ছাত্র ছিলেন ।  

  ইয়োনহে ভবন মন্দিরে প্রাচীন স্থাপত্য ও পুরাকীর্তি বেশি । এই সব স্থাপত্য ও পুরাকীর্তির মধ্যে তিন পুরাকীর্তি বিশেষ উল্লেখযোগ্য । 

  প্রথম বৈশিষ্ট্যময় পুরাকীর্তি হলো ফারুন প্রাসাদের পিছনে রাখা পাঁচ শ’ আরাহাটের পাহাড় । চার মিটার উচু ও তিন মিটার লম্বা এই পাহাড় রক্ত চন্দন গাছের কাঠ দিয়ে খোদাই করা হয়েছে । দূর থেকে এই কাঠের খোদাই কর্ম দেখলে এই পাঁচ শ’ আরাহাটের পাহাড়ে পাহাড় , পাইন গাছ , প্যাগোডা আর প্যাভিলিয়ন দেখা যায় । পাহাড়ে সরু পাথরের পথের পাশে একটি পাথরের সেতু । পাঁচ শ’ আরাহাট ছোট হলেও প্রতি আহারাটের ভঙ্গি ভিন্ন , দেখতে অনেকটা জীবন্ত মনে হয় । দুঃখের বিষয় হলো ইতিহাসে বার বার যুদ্ধের দরুন কিছু আহারাট নষ্ট হয়েছে । বতর্মানে এই কাঠের খোদাই কর্মে চার শ’ ৪৯জন আহারাট আছে , বাকি ৫১টি আহারাট নষ্ট হয়ে গেছে । 

  ইয়োহে ভবনের দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য পুরাকীর্তি হলো উয়ান ফু প্রাসাদে রক্ষিত হাস্য বৌদ্ধদেবের প্রতিকৃতি । উয়ানফু প্রাসাদের আরেক নাম বৃহত বৌদ্ধদেব প্রাসাদ । ইয়োনহে ভবন মন্দিরে উয়ানফু প্রাসাদ সবচেয়ে বড় । এই প্রাসাদের উচ্চতা ৩০ মিটার । কাঠের তৈরি এই প্রাসাদ দেখতে তিন তলার একটি দালান । কিন্তু ভিতরে প্রবেশ করে দর্শকরা আবিষ্কার করেন এই প্রাসাদ আসলে তিনতলা উচু একটি বড় প্রাসাদ । এই প্রাসাদে রাখা হয়েছে বিশ্ববিখ্যাত সাদা চন্দনের কাঠদিয়ে খোদাই করা হাস্য বৌদ্ধদেবের প্রতিকৃতি । হাস্য বোদ্ধদেবের উচ্চতা ২৬ মিটার । প্রতিকৃতিটির আট মিটার ভূগর্ভে রয়েছে । দর্শকরা শুধুপ্রতিকৃতির উপরের ১৮ মিটার দেখতে পান । 

  এই প্রতিকৃতির ব্যাস আট মিটার , ওজন এক শ’ টন । এই হাস্য বৌদ্ধদেবের প্রতিকৃতি পৃথিবীর বৃহত্তম একটি কাঠ দিয়ে খোদাই করা শিল্পকর্ম । ১৯৭৯ সালে এই প্রতিকৃতির মেরামতেরসময় মিস্ত্রীরা আবিষ্কার করেছেন , প্রতিকৃতিটির মাটির নীচেরঅংশ দু শ’ বছর পরও অক্ষত রয়েছে , কাঠ এখনও শক্ত । এতে প্রাচীন চীনের খোদাই শিল্প ও পুরাকীর্তি সংরক্ষনের উন্নত মান পুরোপুরিভাবে প্রমাণিত হয়েছে ।  

  ইয়োহে ভবনের তৃতীয় বৈশিষ্ট্যময় পুরাকীর্তি হলো চাওফো প্রাসাদের চানথানফো । এটি বৌদ্ধদেব শাক্যমুনির একটি প্রতিকৃতি । প্রতিকৃতির পিছনে আলোর বিকিরন রয়েছে । দামী নানমু কাঠ দিয়েএই প্রতিকৃতি ও পিছনের আলোর কিরণ খোদাই করা হয় । এই প্রতিকৃতিদোতলা বাড়ির মতো উচু। পিতলের আয়না প্রতিকৃতির পিছনের আলোর বিকিরনের পিছনে রাখা হয়। সন্ধ্যাবেলার ঝাপসা আলোতে পিতলের আয়নার আলো ও বাতির আলোয় গোটা প্রাসাদ আলোকিত হয় । এই প্রতিকৃতি দুটি সোনালী রংয়ের থামের সঙ্গে সংযুক্ত । এই দুটি থামের উপর খোদাই করা ৯৯টি ড্রাগন আছে , এই ৯৯টি ড্রাগনের ভঙ্গি ভিন্ন । কোনোটি মাথা উচু করে উপরে উঠছে , কোনোটি থাবা বাড়িয়ে এগুচ্ছে । বৌদ্ধদেবের এই প্রতিকৃতি সত্যিই দেখার মতো ।

   ইয়োহে ভবনে উপরে উল্লেখ করা তিনটি পুরাকীর্তি ছাড়া ভবনের স্থাপত্য শৈলী ও অন্যান্য পুরাকীর্তিও বৈশিষ্ট্যময় । যেমন ফারুন প্রাসাদের ক্রস আকারের স্থাপত্য । 

  এই প্রাসাদের উপরে তিব্বতের স্থাপত্য শৈলী অনুসারে তৈরী পাঁচটি সোনালী রংয়ের প্যাগোডা আছে ।এই প্রাসাদ হান ও তিব্বতী জাতির সংস্কৃতি ও শিল্পের মিলিত ফল । তা ছাড়া ইয়োহে ভবনে ছিং রাজবংশের রাজার লেখাএকটি ফলকে লামা ধর্মের উত্স ও লামা ধর্ম সম্পর্কে ছিং রাজকীয় সরকারের নীতি বর্ণনা করা হয়েছে । হান , মান , মঙ্গলিয় আর তিব্বতী এই চারটি জাতির ভাষায়লেখা এই প্রবন্ধ ফলকে খোদাই করা হয় । এতে চীনে সংখ্যালঘুজাতিগুলোর সঙ্গে হান জাতির সংহতি প্রতিফলিত হয়েছে । ১৯৮১ সালে ইয়োহে ভবন খোলার পর প্রতি বছর দশ লক্ষাধিক চীনা ও বিদেশী পর্যটক ভবনে গিয়ে বৌদ্ধদেবের সামনে ধুপ জ্বালিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং ভবনের দৃশ্য ও পুরাকীর্তি পরিদর্শন করেন । ইয়োনহে ভবন শুধু বৌদ্ধধর্মের তীর্থস্থান নয় , এই ভবন হান , মঙ্গলিয় ,মান ও তিব্বতী জাতির সংস্কৃতি ও শিল্পের একটি ভান্ডারও বটে ।