

0819
|
ইয়াং হুয়ান নাটকে ওয়েন ছেং রাজকুমারীর চরিত্রে অভিনয় করেন। নাটকে যারা অভিনয় করেছেন তাদের মধ্যে তিনিই হান জাতির একমাত্র প্রতিনিধি। বাকিরা সবাই তিব্বতি। শুরু থেকেই তিনি রাজকুমারীর চরিত্রে অভিনয় করে আসছেন। তিনি জানালেন, শুরুর দিকে রাজকুমারীর চরিত্রের জন্য ৫ জন অভিনেত্রী ছিলেন। এখন তিনি একাই রয়ে গেছে। তিনি বলেন, "শুরুর দিকে আমরা নাটক করতাম পাহাড়ের পাদদেশে স্থাপিত মঞ্চে। চারপাশে দর্শকদের জন্য কোনো আসন ছিল না। মঞ্চ আমার কাছে বন্ধুর মত। আমি সবসময় মঞ্চে থাকতে পছন্দ করি। রাজকুমারীর চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেতে আমাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। তীব্র ইচ্ছাশক্তির কারণেই আমি তা অর্জন করেছি। এ নাটকের প্রতি আমার ভালবাসাও গভীর।"
তিব্বত স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চলের সাংস্কৃতিক জগত তেমন উন্নত নয়। ২০১২ সালের শেষ নাগাদ শুরু হয়েছিল নাটকটি মঞ্চস্থ করার যাবতীয় কর্মকাণ্ড। সে কাজ শেষ হয়ে নাটকটি প্রথম মঞ্চস্থ হয় ২০১৩ সালের আগস্ট মাসের শুরুর দিকে। ৮ মাস লেগেছে নাটক রচনা, মঞ্চনির্মাণ ও মহড়ার কাজে। লা শা শহরের প্রচার বিভাগের প্রধান ছাং তুই এ নাটক তৈরির উদ্দেশ্য তুলে ধরেন এভাবে, "এ নাটকের মাধ্যমে সবাই ইতিহাসকে পড়তে পারেন এবং জাতীয় মহাঐক্যের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে পারেন। কারণ, ওয়েন ছেং রাজকুমারী ও তার স্বামী সুংজেইন গামবোর গল্প হাজার বছর আগের জাতীয় মহাঐক্যসম্পর্কিত একটি কাহিনী।"
লা শা'র ভৌগোলিক অবস্থা ও অন্যান্য কারণে কোনো নাটকের উন্মুক্ত মঞ্চায়ন কঠিন কাজ। চীনের বিভিন্ন শহরে উন্মুক্ত মঞ্চে নাটক হতে দেখা যায়। তবে 'ওয়েন ছেং রাজকুমারী' নাটকটি ভিন্ন ধাঁচের । লা শা'র ভাইস-মেয়র উ ইয়া সুং বলেন, "চীনের অন্যান্য শহরে উন্মুক্ত মঞ্চে কিংবদন্তি অবলম্বনে রচিত নাটক হতে দেখা যায়। তবে ওয়েন ছেং রাজকুমারীর গল্প ঐতিহাসিক। এ নাটকের প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় নেয়া হয়ে সত্য ঘটনা থেকে। এ নাটকের মাধ্যমে আমরা এক হাজার বছর আগের হান ও তিব্বতি জাতির একতা ও তিব্বতের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারি।"
তিব্বতে পর্যটনশিল্প উন্নয়নের ফলে সেখানে পর্যটকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। আর তাই এখানে বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের চাহিদাও বাড়ছে। আগে পর্যটকরা লাশা শহরে দিনে পোতালা ভবন ও Jokhang Templeসহ নানা দর্শনীয় স্থানই কেবল দেখার সুযোগ পেতেন। রাতে তাদের জন্য করার কিছু থাকত না। 'ওয়েন ছেং রাজকুমারী' নাটক দর্শকদের জন্য রাতেও কিছু করার চাহিদা পূরণ করেছে।
ছেং তু ইউয়ু সাং হে মেই কোম্পানি ওয়েন ছেং রাজকুমারী নাটকের প্রযোজক। কোম্পানির সি ই ও ছিউ ওয়ে জানালেন, লা শা সরকার ওয়েন ছেং রাজকুমারী নাটক মঞ্চায়নে প্রস্তাব দিলে তার কোম্পানি তা লুফে নেয়। এ প্রসঙ্গে ছিউ ওয়ে বলেন, "লা শা বিশ্ববিখ্যাত একটি দর্শনীয় স্থান এবং প্রতি বছর এখানে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ করে। আমি বিশ্বাস করি, ভবিষ্যতে লা শা পর্যটকদের কাছে আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠবে। আমরা সবসময় একটা কথা বলি: জীবনে অন্তত একবার তিব্বতে যাওয়া উচিত। তিব্বতের ব্যাপারে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগ্রহ বেশি। আমরা মনে করি পর্যটনশিল্পের জন্য এটি বড় বাজার। তা ছাড়া, ওয়েন ছেং রাজকুমারীর গল্পও চীনে সুপরিচিত। সব কিছু ভেবেই আমারা এ নাটকে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেই।"
আসলে এ নাটকে বিনিয়োগের ব্যাপারে শুরুর দিকে কোম্পানি খানিকটা দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। পরে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত হল। আবার মঞ্চ নির্মাণের সময় বিরূপ আবহাওয়া বাধা হয়ে দাঁড়াল। এ সব সমস্যা মোকাবিলা করেই নাটকটি আলোর মুখ দেখে। শেষ পর্যন্ত নাটকটি ব্যাপক সাফল্যও অর্জন করে। যারা-ই এ নাটক দেখেছেন, তারা-ই প্রশংসা করেছেন। চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে এ নাটকের বক্স অফিস ৮ কোটি ইউয়ান ছাড়িয়ে যায়। আশা করা হচ্ছে বছর শেষে তা ১৫ কোটি ইউয়ান ছাড়িয়ে যাবে।
মজার একটি ব্যাপার হল, এ নাটকের অভিনেতাদের ৯৯ শতাংশই স্থানীয় তিব্বতি সাধারণ মানুষ। পেশাদার অভিনেতা আছেন মাত্র ১০ জন। নাটকে যে নৃত্য আমরা দেখি তা সবই স্থানীয় মানুষ ছোটবেলা থেকেই পারফর্ম করে আসছে। তাই তাদের কোনো প্রশিক্ষণ লাগেনি।
লা শা প্রচার বিভাগের প্রধান চান তুই বলেন, এ নাটক স্থানীয় মানুষের আয় বাড়িয়ে দিয়েছে।
তিনি বলেন, 'স্থানীয় মানুষ দিনে নিজের কাজ করে এবং রাতে এখানে অভিনয় করে। এতে তাদের দু'টি বাড়তি পয়সা আয় হয়। এ নাটক তিব্বতের সাংস্কৃতিক ও আর্থনীতিক উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় ঐক্যের জন্য সহায়ক।'
২৫ বছর বয়সী লুও তান নাটকে নাচ করেন। প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টায় থিয়াটারে আসেন এবং রাত ৯টায় নাটক শুরু হয়। দিনে তিনি ড্রাইভিং স্কুলে প্রশিক্ষণও নিচ্ছেন। ভবিষ্যতে চালক হিসেবে কাজ করতে চান তিনি। নাটকে অভিনয় করার সময়ই তার পরিচয় হয় পা সাংয়ের সঙ্গে। পরে তারা বিয়ে করেন। তাদের এক বছর বয়সী একটি ছেলে আছে। নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে দু'জন প্রতি মাসে ৫ হাজার ইউয়ান আয় করেন।
নাটক 'ওয়েন ছেং রাজকুমারী' নাটকে বিনিয়োগকৃত অর্থের ৩২ শতাংশ সরকারি ও ৬৮ শতাংশ বেসরকারি খাত থেকে আসা। তিব্বতে এই প্রথম মিশ্র বিনিয়োগে একটি নাটক চলছে। নাটককে কেন্দ্র করে এতদঞ্চলে পর্যটন প্রমোট করার চিন্তাও চলছে। ছেং তু ইউয়ু সাং হে মেই কোম্পানি সি ই ও ছিউ ওয়ে জানালেন,
"আমরা এক বা দুই দিনের প্যাকেজ চালু করব। পর্যটকরা এ প্যাকেজের আওতায় গ্রামীণ পরিবেশে থাকবেন এবং নাটক উপভোগ করবেন। পর্যটকরা এখানে অবস্থান করলে এখানকার আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটবে।"(শিশির)




