

প্রিয় শ্রোতা, লি খ্য ছিয়াংয়ের সাংবাদিক সম্মেলন নিয়ে এখন শুনুন একটি প্রতিবেদন।
২০১৪ সালে চীনে ৭.৪ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়। বিগত ২৪ বছরে এটি ছিল চীনের সর্বনিম্ন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। এদিকে, চলতি বছর চীন সরকার প্রায় ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ঠিক করেছে। বিষয়টি বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এ প্রসঙ্গে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি খ্য ছিয়াং সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, চীনের অর্থনীতি নতুন স্বাভাবিক অবস্থায় প্রবেশ করেছে। এ অবস্থায় চলতি বছর ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনও সহজ হবে না। লি খ্য ছিয়াং এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন,
"চীনা অর্থনীতির মোট পরিমাণ বেড়ে ১০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। এ অবস্থায় ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও, তা মধ্যম মানের একটি অর্থনীতির বার্ষিক আয়ের সমান হবে।"
তিনি বলেন, যদি গুণগত মান ও মুনাফার ওপর জোর দেওয়া হয় এবং চীনের অর্থনীতিকে নিম্ন-মধ্য পর্যায় থেকে উচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করার প্রচেষ্টা চালানো হয়, তবে অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ সময় ধরে চীনা অর্থনীতির মধ্য ও উচ্চ প্রবৃদ্ধির গতি বজায় থাকবে। এতে চীনের আধুনিকায়নের ভিত্তি মজবুত হবে এবং এটা হবে বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের বড় অবদান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন,
"আমি বহুবার বলেছি, নতুন স্বাভাবিক অবস্থায় আমরা চীনের অর্থনীতিকে উপযুক্ত স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবো। যদি গতি মন্থর হওয়ার কারণে কর্মসংস্থান ও আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, অর্থাত্ অর্থনীতি উপযুক্ত স্থানের একেবারে নিম্ন সীমায় পৌঁছে যায়, তখন আমরা বাজারের ওপর সবার আস্থা ধরে রাখতে সঠিক নীতি গ্রহণ ও বাজার স্থিতিশীল করার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণের মাত্রা জোরদার করবো। বিগত কয়েক বছরে আমরা স্বল্পমেয়াদী কোনো নীতি গ্রহণ করিনি। বলা যায়, যথাযথ নীতি গ্রহণের মাধ্যমে প্রতিকূল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সুযোগ আমাদের সামনে আছে। আমাদের থলেতে এখনো অনেক কৌশল রয়ে গেছে, যা আমরা ব্যবহার করতে পারি।"
লি খ্য ছিয়াং বলেন, যদি 'সবাই এক মন নিয়ে কাজ করি', তবে চীনের অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি ও মৌলিক অবস্থা স্থায়ীভাবে ভালোর দিকেই যাবে।
চীনে সরকার ও বাজারের সম্পর্ক স্পষ্ট করে তুলতে এবং বাজারে প্রাণশক্তি যোগাতে গত দু'বছরে জোরালোভাবে প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে আনার ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের কাজ চলেছে। প্রধানমন্ত্রী লি দাবি করেন, গত বছর চীনের অর্থনৈতিক গতি তুলনামূলকভাবে মন্থর থাকলেও, কর্মসংস্থানের হার বেড়েছে। প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে আনা এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তিনি স্বীকার করেন, প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে আনা এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ প্রক্রিয়ায় কিছু সমস্যা রয়েছে গেছে, যা দূর করা জরুরি।
লি খ্য ছিয়াং বলেন,
"প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে আনা এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ সরকারে অভ্যন্তরে সাধিত একটি বিপ্লব। ক্ষমতা ভাগ করলে স্বার্থে আঘাত লাগে। এ আঘাত নখ কাটার মতো নয়, বরং কবজি কেটে ফেলার মতো যন্ত্রণাদায়ক। যতই ব্যথা লাগুক, তা সহ্য করতেই হবে। চলতি বছর চীন সরকার যে সব কাজের ওপর গুরুত্ব দেবে সেগুলো হচ্ছে: সার্বিকভাবে অ-প্রশাসনিক অনুমোদন প্রক্রিয়া বাতিল করা; আইন বহির্ভূতভাবে ক্ষমতার ব্যবহার রোধ করা; ক্ষমতার তালিকা ও দায়িত্বের তালিকা প্রথমে প্রদেশ পর্যায়ে প্রকাশ করা এবং পরের বছর তা শহর ও জেলা পর্যায়ে প্রকাশ করা। এসব তালিকা প্রকাশ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে, জনসাধারণকে এ কথা স্পষ্টভাবে আশ্বস্ত করা যে, কোনো অবস্থাতেই ক্ষমতার অপব্যবহার করা যাবে না।"
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের দুর্নীতি দমন প্রক্রিয়া জোরদার হয়েছে। গত বছর দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে অর্জিত হয় লক্ষণীয় সাফল্য। চলতি বছর এ ক্ষেত্রে কতোটা অগ্রগতি অর্জিত হতে পারে জানতে চাইলে লি খ্য ছিয়াং বলেন,
"ক্ষমতার স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে; সমাজের তত্ত্বাবধান মেনে নিতে হবে; সরকারি কর্মকর্তাদের আত্মসংযম চেতনা উন্নীত করতে হবে। ক্ষমতাকে নিজের স্বার্থে নয়, শুধু জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় আমরা ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য শাস্তির পক্ষে এবং কাজ না-করার বিপক্ষে। অলস মন নিয়ে প্রশাসনিক কাজ করতে দেওয়া হবে না। ঢোকার জন্য দরজা প্রশস্ত করা হয়েছে, কর্মকর্তার মুখ সুন্দরতর হয়েছে, অথচ কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না, কর্মকর্তা দায়িত্ব নিয়ে কাজ করছেন না—এমন অবস্থা আমরা বরদাস্ত করবো না।"
চলতি বছর চীনের জনগণের জাপান-বিরোধী যুদ্ধ এবং বিশ্বের ফ্যাসিবাদ-বিরোধী যুদ্ধ বিজয়ের ৭০তম বার্ষিকী। চীন-জাপান সম্পর্ক প্রসঙ্গে লি খ্য ছিয়াং বলেন,
"কেবল চীন নয়, বিশ্বের অনেক দেশ চলতি বছর নানা ধরনের স্মরণীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডিকে মনে রাখা, এমন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি প্রতিরোধ করা, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের বিজয়ের সুফল আর যুদ্ধোত্তর আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা আর ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক আইন রক্ষা করা, মানবজাতির স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করা। এখন চীন ও জাপানের সম্পর্ক সত্যিই তিক্ত। এর মূল কারণ হচ্ছে, যুদ্ধ আর ইতিহাস সম্পর্কে সঠিক উপলব্ধি না থাকা। সঠিক ইতিহাসবোধ থাকার মানে, ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা এবং ভবিষ্যতে সে অনুসারে চলা। একজন রাষ্ট্রীয় নেতা যেমন পূর্বপুরুষের কৃতিত্বের ভাগ নিতে কুণ্ঠিত হন না, তেমনি তার উচিত পূর্বপুরুষদের অপরাধের দায়িত্বও স্বীকার করা। যদি জাপানের নেতারা সঠিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাসকে দেখেন ও সবসময় একই অবস্থানে থাকেন, তবে চীন-জাপান সম্পর্ক উন্নয়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং চীন ও জাপানের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কোন্নয়নের জন্যও সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি হবে।"
বিশ্বের বৃহত্তম উন্নয়নশীল দেশ আর সর্বাধিক শিল্পোন্নত দেশ হিসেবে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কও বিভিন্ন পক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। লি খ্য ছিয়াং বলেন, চীন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার ভিত্তিতে বড় রাষ্ট্রের সম্পর্ক
প্রতিষ্ঠা করতে ইচ্ছুক।
তিনি বলেন,
"আমরা চীন-মার্কিন বিনিয়োগ চুক্তির আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছি। এ আলোচনার ভিত্তি হচ্ছে নাগরিকদের সুবিধা এবং নেতিবাচক তালিকা বিনিময়। সম্ভাব্য এ চুক্তি দিয়ে সহযোগিতার সীমা অতিক্রম করা যায়, উন্নয়নের নতুন অবকাশ সৃষ্টি করা যায়। অবশ্য চুক্তিটি এখনো আলোচনা পর্যায়ে রয়েছে। তবে এ আলোচনার মাধ্যমে বিশ্বের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছানো হয়েছে। বার্তাটি হচ্ছে: চীন-মার্কিন অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর হতে যাচ্ছে।"
চীন ও মিয়ানমারের সীমান্তে মিয়ানমারের যুদ্ধবিমানের আন্তর্জাতিক আকাশসীমা লঙ্ঘন এবং চীনের ভূখণ্ডে বোমা নিক্ষেপের ফলে চীনা নাগরিকদের হতাহতের ঘটনাটিও সাংবাদিক সম্মেলনে উঠে আসে। এ প্রসঙ্গে লি খ্য ছিয়াং বলেন,
"আমি নিহতদের আত্মীয়স্বজনদের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জানাই। চীন সরকার, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সামরিক পক্ষ মিয়ানমারের কাছে কঠোরভাবে ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছে। সীমান্ত অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং চীনা জনগণের জানমাল হেফাজত করার সামর্থ্য চীন সরকারের আছে।"
সাংবাদিক সম্মেলনে লি খ্য ছিয়াং ধোঁয়াশা, রিয়্যাল এস্টেট বাজারের উন্নয়ন, গণ উদ্ভাবনসহ বিভিন্ন ইস্যুতেও সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন। (ইয়ু/আলিম)




