|
||||||||||||||||||||||||||||
ওয়াং পাওথিয়েন চীনের আনহুই প্রদেশের ফুনান জেলার একজন কৃষক। দু বছর আগে তাঁর ১৭ বছর বয়সী ছেলে ওয়াং সিনের আকস্মিক গুরুতর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয় এবং চিকিত্সা ব্যর্থ হওয়ায় তার মৃত্যু হয়। দুঃখভারাক্রান্ত ওয়াং পাওথিয়েন এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন । তিনি ছেলের যকৃত, কিডনি ও চোখের কর্ণিয়াসহবেশ কয়েকটি অঙ্গ দান করেন। ছেলের এ কয়েকটি অঙ্গ সাতজনকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। অঙ্গ-দান সম্পর্কে ওয়াং পাওথিয়েন বলেন, এতে তাঁর পরিবার এবং উপকারভোগী দুপক্ষই সান্ত্বনা পায়। তিনি বলেন, "আমার ছেলের প্রধান আকাঙ্ক্ষা ছিল একজন জনহিতৈষী মানুষ হওয়া। আমরা দুজন স্থির করেছিলাম যে, আমাদের দুজনের মধ্যে যখন একজনের মৃত্যু হবে, তখন জীবিত জন মৃতের দেহ ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান করে দেবে।"
অঙ্গ-দান ব্যবস্থা এবং সনাতন ধারণার প্রভাবসহ নানা কারণে চীনে এমন লোকের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত, যারা মারা যাওয়ার পর নিজের অঙ্গ দান করতে ইচ্ছুক। চীনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, প্রতি বছর চীনে ১৫ লাখ রোগীর অঙ্গ প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অভাবে ১৫ লাখ রোগীর মধ্যে মাত্র ১ শতাংশ অঙ্গ-প্রতিস্থাপনের সুযোগ পায়। এর অর্থ হলো এই যে, অঙ্গ প্রতিস্থাপনের দরকার হওয়া রোগী এবং অঙ্গ দানকারীর অনুপাত ১৫০:১। কিন্তু এ অনুপাত যুক্তরাষ্ট্রে ৫:১ এবং ব্রিটেনে ৩:১। চীনে অঙ্গের উত্স সম্পর্কে স্বাস্থ্য-উপমন্ত্রী হুয়াং চিয়েফু খোলাখুলিভাবে বলেন, স্বেচ্ছায় অঙ্গ দানের অভাব রয়েছে বলে চীনে পাওয়া বেশির ভাগ অঙ্গ আসে বন্দী অবস্থায় মৃতবরণকারীদের থেকে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে নিন্দিত। তিনি বলেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় এমন মানুষের সংখ্যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনে ব্যাপকভাবে কমে গেছে এবং সাবধানে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার প্রবণতা চীনে প্রচলিত হয়ে উঠছে। এ কারণে মৃত-বন্দীদের থেকে পাওয়া অঙ্গের সংখ্যা বিপুল হারে কমে গেছে। পাশাপাশি মৃত-বন্দীদের অঙ্গে ছত্রাক এবং জীবাণু সংক্রমণের হার অত্যন্ত বেশি। এ কারণে চীনে অঙ্গ গ্রহণকারীরোগীদের জীবিত থাকার হার বিশ্বমানের তুলনায় কম।
উপমন্ত্রী হুয়াং চিয়েফু বলেন, "অঙ্গউত্স সমস্যার সমাধান এখন দান-ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে করতে হবে। এ ব্যাপারে আমরা আস্থাবান। আমাদের সরকারও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।"
বর্তমানে একটি দেশব্যাপী অঙ্গ-দান ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে এবং এর পরীক্ষামূলক কাজ ১৬টি প্রদেশ ও কেন্দ্রশাসিত মহানগরে চালানো হচ্ছে। চীনের রেডক্রস সোসাইটির ভাইস-চেয়ারম্যান হাও লিননা জানান, তারা দু বছর ধরে অঙ্গ-দান ব্যবস্থার পরীক্ষামূলক কাজ চালিয়ে আসছেন। মৃত্যুর পর চীনা নাগরিকদের অঙ্গ-দানের কাজ প্রথম ধাপ এগিয়েছে। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, "দু হাজার বারো সালের ১৫ মার্চ পর্যন্তমোট ২০৭জন হৃদপিণ্ড, যকৃত ও কিডনিসহ মোট ৫৪৬টি অঙ্গ দান করেছেন। এতে পাঁচশ'রও বেশি লোকের প্রাণ বেঁচেছে।"
হাও লিননা আরও বলেন, সারা দেশে যুক্ত ও আইনসঙ্গত অঙ্গ বিতরণ ও ভাগাভাগি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা অঙ্গ প্রতিস্থাপন উন্নয়নের নিশ্চয়তাবিধান করেছে। গত বছর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সংস্থা প্রাথমিকভাবে বন্টন ও ভাগাভাগি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে এবং ব্যবস্থাটি পরীক্ষামূলকভাবে চালানো হচ্ছে। দান করা অঙ্গেরসংখ্যা কম বলে যে এলাকায় অঙ্গ দান করা হয় সে এলাকায় আগে অঙ্গটি ব্যবহারের নীতি অনুযায়ী অঙ্গ বন্টন করা হয়। এ সম্পর্কে হাও লিননা বলেন, "অঙ্গ-দান ও অঙ্গ প্রতিস্থাপনের দীর্ঘকালীন কাজের জন্য অঙ্গ বিতরণে একটি দেশীয় উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা ও তথ্য নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে সাম্য, ন্যায় ও উন্মুক্ততার ভিত্তিতে অঙ্গ বিতরণ সমস্যার সমাধান করা যায়।"
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উল্লেখ করেন, অঙ্গের অভাব মেটাতে চাইলে কেবল আইন ও প্রাসঙ্গিক ব্যবস্থা হলেই হবে না, আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পুরানো ধারণা পরিবর্তন করা এবং জনসাধারণের অঙ্গ দানের চেতনা উন্নত করা। আনন্দের বিষয় হলো, চীনের ১২টি প্রদেশে রেডক্রস সোসাইটিপরিচালিত জরিপ থেকে জানা গেছে, বর্তমানে ৭০ শতাংশ মানুষ অঙ্গ দান করতে ইচ্ছুক। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, ক্রমাগত আরও বেশি মানুষ ভালবাসা দান এবং অঙ্গ দানের মাধ্যমে অন্যের মধ্যে নিজের জীবন সঞ্চার করার সারিতে যোগ দিচ্ছেন। এর ফলে হাজার হাজার মুমূর্ষু রোগীর বাঁচবে।


| © China Radio International.CRI. All Rights Reserved. 16A Shijingshan Road, Beijing, China. 100040 |