গ্রাম পুনরুদ্ধারে যুবশক্তি
  2020-07-15 09:06:09  cri

তারা উলটা পথে চলে আসেন। তারা বড় শহরে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে পরে নিজ নিজের গ্রামে ফিরে আসেন। তাদের বয়স ৩০ বছরের চেয়ে কম এবং গ্রামের দারিদ্র্যবিমোচন ও পুরুদ্ধারে নিজ নিজের ভূমিকা পালন করছেন।

ওয়াং লিয়ান, ২৫ বছর বয়সী একটি মেয়ে। লম্বা ও ফরসা, মুখে সবসময় মৃদুহাসি। তিনি ইউয়ু সি জেলার সবচেয়ে কম বয়সী গ্রাম-প্রধান। কয়েক বছর আগে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন, ওয়াং লিয়ান ছুটিতে ফিরে আসেন গ্রামে এবং দেখেন, গ্রামের বাইরে যেতে চাইলে প্রবীণদের ১ ঘন্টা হাঁটতে হয়। গ্রামের বাস্তবতা দেখে তিনি মনে মনে একটি সিদ্ধান্ত নেন: স্নাতক হবার পর গ্রামে ফিরে আসবেন। ২০১৭ সালে তিনি স্নাতক হন এবং সরাসরি গ্রামে ফিরে আসেন। স্নাতক হবার আগে তিনি সিপিসির একজন সদস্য হন। তার মতে, গ্রামের পুনরুদ্ধার একের পর এক প্রজন্মের মানুষের পরিশ্রমের মাধ্যমে বাস্তবায়তি হওয়া সম্ভব। তাই তিনি হতে চান এ মানুষদের একজন।

গ্রামে ফিরে আসার পর তিনি গ্রামের পুরাতন প্রধানের সঙ্গে গিয়ে প্রতিটি পরিবারের খোঁজ-খবর নেন। সবাই তাকে একটি ছোট মেয়ে হিসেবে গণ্য করতে শুরু করে। ওয়াং লিয়ান ভাবলেন, শুধু কাজের মাধ্যমে নিজের দক্ষতা দেখাতে হবে। তার প্রথম কাজ ছিল আবাদি জমির জরিপ করা। প্রতিদিন ভোর ৪-৫টায় তিনি জরিপদলের সঙ্গে শুরু করেন প্রতিদিনের কাজ। গ্রীষ্মকালে তারা কয়েক মাস কাজ করেন। তীব্র রোদে তার ত্বক নষ্ট হয়ে যায়। তবে গ্রামের ৮০টি পরিবারের পুরাতন বাড়িঘরের মাপ এবং চাষের জমি পুনরুদ্ধারকাজ সফলভাবে শেষ হয়।

 

২০১৮ সালে ওয়াং লিয়ান সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়ে গ্রামের প্রধান নির্বাচিত হন। তার নেতৃত্বে গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয় উচ্চ পর্যায়ের চা-কারখানা এবং বন্যা মৌসুম আসার আগে নতুন বাঁধও নির্মিত হয়। গ্রামে টানা তিন বছর অনুষ্ঠিত হয় চা সংস্কৃতি উত্সব এবং তাদের চা প্রতিকেজি ২০০ ইউয়ান দামে বিক্রি হয়। গ্রামের মানুষ এখন ওয়াং লিয়ানের কথা বলেন, সবসময় তার প্রশংসা করেন। ওয়াং লিয়ানের মতো, গ্রামে ফিরে আসা বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। ২০১৩ সালে ইউয়ু সি জেলায় চালু হয় 'বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের গ্রামে ফিরে আসা' নামের কার্যক্রম এবং তখন মাত্র ৫৫ জন ছাত্রছাত্রী এতে অংশগ্রহণ করে। ২০১৯ সালে ২৯৫ জন নাম তালিকাভুক্ত করে। আর চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে আরও ১৬৩ জন শিক্ষার্থী এ কার্যক্রমে অংশ নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। সারা জেলায় ১৮৫ জন স্নাতক শিক্ষার্থী গ্রামের প্রধান হয়েছেন।

প্রায় এক শ বছর আগে, এ জায়গায় এক দল ২০ বছর বয়সী তরুণরা স্থাপন করেছিলেন বিপ্লবের ঘাঁটি। তখন থেকে এ ভূমি নিয়ে স্বপ্ন দেখছেন একেক প্রজন্মের যুবক-যুবতীরা।

অন্য একটি জেলা, চিন চাই জেলায় ২২ বছর বয়সী এক যুবক স্কুলের স্নাতক প্রক্রিয়া শেষ করার আগেই গ্রামে কাজ করা শুরু করেন। এর আগে তিনি শাংহাই ও নিংপো—এই দুটি শহরে কাজের সুযোগ পেয়েছেন। তবে তিনি গ্রাম বাছাই করেন। তিনি জেলায় সবচেয়ে তরুণ একজন গ্রাম-প্রধান। তা ছাড়া, গ্রাম কমিটির সব সমদস্যের গড় বয়স ২৮ বছর। কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যায়ের স্নাতক এবং কেউ কেউ অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক। তারা সবাই নিজ নিজ গ্রামে ফিরে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। কাও ওয়ান গ্রামের সিপিসির পুরাতন সদস্য ছেন ছুয়ান ফু বলেন, গেল কয়েক বছরে, প্রধানের নেতৃত্বে গ্রামে উন্নয়ন হয়, নির্মিত হয় সিমেন্টের রাস্তা, গ্রামে চালু হয় বাস। সবাই তাদের কাজের প্রশংসা করেন।

যুব মানুষের আছে নতুন ধারণা ও জ্ঞান যা গ্রামের পুনরুদ্ধারে কাজে লাগে। চিন শান গ্রামের একটি কারখানায় ৬৫ বছর বয়সী ছুতার লি ওয়েন তিং কাজ করছেন। এখন তার বার্ষিক আয় ৫০ হাজার ইউয়ান এবং তিনি বলেন, এটা সম্ভব হয়েছে সিয়াও হংর সাহায্যে। সিয়াও হংয়ের পুরো নাম ফাং হং। তিনিও গ্রামে ফিরে নিজস্ব ব্যবসা দাঁড় করান। বিশ্ববিদ্যায়ে তিনি ইংরেজি শিখেছেন এবং পরে শাংহাইয়ে একজন শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। ৬ বছর আগে ২৫ বছর বয়সী ফাং হং গ্রামে ফিরে আসেন এবং গ্রামের ৩৬০ জন নারী, দরিদ্র মানুষ ও ছুতার নিয়ে গঠন করেন একটি গ্রুপ। তারা গাছের শাখা, খড় এবং লতা দিয়ে হ্যান্ডব্যাগ, ছোট আসবাব তৈরি করা শুরু করেন। ফাং হং নিজের নকশা ও তৈরি এ পণ্যগুলো বিশ্বের ৪০টি দেশ ও অঞ্চলে বিক্রয় করেন এবং প্রতি পরিবারের আয় ৩৫ হাজার ইউয়ান করে বেড়েছে। দরিদ্র গ্রামও বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত হয়।

যুব মানুষ নবায়ন ও নতুন পদ্ধতি পছন্দ করেন। তারা গ্রামের উন্নয়নে নতুন শক্তি ও আশা যোগান। থিয়ান সিয়াং চুই গ্রামে, গ্রামবাসিন্দাদের কাছে ২৬ বছর বয়সী চা ইউন ছি হলেন এমন একজন মানুষ 'যিনি বিশ্রাম নিতে জানেন না'। বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বাণিজ্য নিয়ে লেখাপড়া করেছেন। তার শিক্ষা গ্রামে কাজে লেগেছে। তিনি অনলাইনে একটি দোকান খুলেন এবং ট্রেডমার্ক নিবন্ধন করেন। পরে তার উদ্যোগে গ্রামে নির্মিত হয় হিমায়ক এবং ঠান্ডা চেইন। তার সাহায্যে অনলাইন দোকান চালু হবার পর মাত্র ২ মাসে বিক্রির পরিমাণ ১ লাখ ছাড়িয়েছ এবং প্রতি পরিবারের আয় ৫০০০ ইউয়ান করে বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রতিবছরের জুন মাস, বিশ্ববিদ্যায়ের স্নাতক সময়। আন হুই প্রাদেশিক সরকার একটি ঘোষণাপত্র প্রকাশ করে এবং ৭০০ জন স্নাতক ছাত্রছাত্রী বাছাই করা গ্রামে নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেয়। কেন্দ্রীয় সরকার থেকে স্থানীয় সরকার পর্যন্ত দক্ষ যুব মানুষের মাধ্যমে গ্রাম পুনরুদ্ধার বাস্তাবায়ন করতে উত্সাহ দেয়। ২০১৯ সালের শেষ দিকে আন হুই প্রদেশের ৯০ হাজারের বেশি গ্রাম-প্রধানের মধ্যে ৩৮.৩ শতাংশ বিশ্ববিদ্যায় স্নাতক। কোনো কোনো জায়গায় যুবক-যুবতীদের আকর্ষণ করতে বিশেষ সুবিধা ও সুযোগ প্রদান করা হয়। যেমন থাই হু জেলা গ্রামের বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক প্রধানের জন্য চালু করে নিজস্ব ব্যবসা দাঁড় করানোর বিশেষ তহবিল। প্রতিবছর ১০ লাখ ইউয়ান অর্থ ও ২০ লাখ ইউয়ান ঋণ সরবরাহ করা হয় সেই তহবিল থেকে। টাকাগুলো কেবল গ্রামের বিশ্ববিদ্যায় স্নাতক প্রধানের উদ্যোগে নেওয়া প্রকল্পে ব্যয় করা হবে।

কুয়ান হ্য গ্রামের উ সং ছিং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হবার পর প্রথমে গ্রামে তার ব্যবসা ব্যর্থ হয়। তার উদ্যোগে একটি ছত্রাক সমবায়ে ৩ লাখের বেশি ইউয়ান ক্ষতি হয়। প্রাদেশিক সরকার তাকে বড় কোম্পানিতে পাঠায় এবং সেখানে তিনি ব্যবস্থাপনা শেখেন। পরে তাকে বিশেষ আর্থিক সুবিধা দেওযা হয়। এখন তিনি গ্রামের সিপিসি কমিটির উপ প্রধান এবং বিখ্যাত ছত্রাক 'বিশেষজ্ঞ'। তার নেতৃত্বে ৩০০টি দরিদ্র পরিবারের বার্ষিক আয় ৮০০০ ইউয়ান করে বৃদ্ধি পায়।

যুব মানুষের গ্রামে কাজ করার জন্য দক্ষতা ছাড়া প্রতিজ্ঞাও গুরুত্বপূর্ণ। চান সিয়াও ফাং চে চিয়াং ও কুয়াং তুং প্রদেশে কয়েক বছরের মতো কাজ করার পর ফিরে এসেছেন লি সু গ্রামে। এ গ্রাম খুবই দরিদ্র একটি গ্রাম এবং শুরুতে তার হাতে একটি নামতালিকা ছাড়া আর কিছু ছিল না। নাম-তালিকায় লেখা আছে ৩২৬টি দরিদ্র পরিবারের মানুষের নাম। চান সিয়াও ফাং এ নাম-তালিকা অনুযায়ী দু'মাসের মধ্যে প্রতিটি পরিবারে গিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলেন। রাতে প্রতিটি পরিবারের আসল অবস্থা অনুযায়ী তাদের জন্য বিশেষ দারিদ্র্যবিমোচন পরিকল্পনা তৈরি করেন। লি শু গ্রামের দারিদ্র্যবিমোচন পথে দেখা যায় চান সিয়াও ফাংয়ের অক্লান্ত পরিশ্রম ও পদচিহ্ন। তার প্রচেষ্টায় গ্রামের দারিদ্র্যের হার ৩০ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ০.৩৬ শতাংশে।

গ্রাম যুবক-যুবতীদের জন্য একটি মঞ্চ সৃষ্টি করেছে এবং এখানে তারা সংগ্রামের অর্থ খুঁজে পাচ্ছেন। (শিশির/আলিম/রুবি)

© China Radio International.CRI. All Rights Reserved.
16A Shijingshan Road, Beijing, China. 100040