Web bengali.cri.cn   
চীনের সংস্কার ও উন্মুক্তকরণের ৪০ বছরে চীনা চলচ্চিত্রে যেসব ঘটনা 'প্রথম' বার ঘটে (প্রথম পর্ব)
  2019-10-10 15:46:41  cri

চলতি বছর হলো গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার ৭০তম বার্ষিকী। ৭০ বছরের মধ্যে বিশেষ করে সংস্কার ও উন্মুক্তকরণের ৪০ বছরের মধ্যে চীনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশাল পরিবর্তন হয়েছে। এ ৪০ বছর হলো চীনের চলচ্চিত্র শিল্পের শুরুর দিক থেকে প্রাণবন্ত দিকে চলে যাওয়ার প্রক্রিয়া। গত ৪০ বছরে নতুন নতুন প্রযুক্তি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করে চীন।

কোনো কোনো লোক বলে থাকেন, চলচ্চিত্র হলো ঘনীভূত জীবন। চিরস্মরণীয় একটি চলচ্চিত্র হলো একটি সময়ের সংক্ষিপ্তসার, এটি একটি প্রজন্মের স্মৃতিও বটে। এসব আলোছায়া রেকর্ড করা ফিল্ম যুগের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন হচ্ছে এবং চীনের বিশাল পরিবর্তন স্বচোক্ষে দেখা যাচ্ছে।

গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের বড় স্ক্রিনের 'প্রথম চুম্বন'

১৯৭০ সালের ৩০শে অক্টোবর সমগ্র চীনের সাহিত্য ও শিল্প ব্যক্তিদের চতুর্থ সম্মেলন বেইজিংয়ে জাঁকজমকপূর্ণভাবে শুরু হয়। তত্কালীন প্রেসিডেন্ট তেং সিও পিং চীনের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিসি)-র কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ এক ভাষণ দেন। এই সম্মেলনটিকে চীনের সাহিত্য ও শিল্পের ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক হিসেবে মনে করা হয়। তখন থেকে চীনের চলচ্চিত্র শিল্পে দ্বিতীয় বসন্তকাল দেখা দেয়।

১৯৮২ সাল হলো চীনের সংস্কার ও উন্মুক্তকরণের দ্বিতীয় বছর। সেই বছর চীনের শেনচেন, চুহাই, শানথৌ ও সিয়ামেন শহরে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠিত হয়। 'চেতনার মুক্তি' শ্লোগান সারা সমাজে ধ্বনিত হয়। তখন 'অ্যারেস্ট' এবং 'সান্দাকান নাম্বার ৮' সহ জাপানের ব্যাপক চলচ্চিত্র ও টিভি নাটক চীনে আমদানি করা হয়।

সেই বছর 'রোমান্স অন লুসান মাউন্টেইন' নামে চীনা চলচ্চিত্রটি সিনেমা হলে প্রদর্শিত হয়। চলচ্চিত্রে লুশান পাহাড়ে দু'জন তরুণ-তরুণীর মিলিত হওয়া এবং পরস্পরকে ভালোবাসার গল্প তুলে ধরা হয়। এতে চীনের তাইওয়ান প্রণালীর দু'পারের জনগণের মাতৃভূমির একীকরণের আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয়। এই চলচ্চিত্রটি বেশ কয়েকটি 'প্রথম' ইতিহাস সৃষ্টি করে। এটি হলো চীনের প্রথম রঙ্গিন প্রশস্ত পর্দার চলচ্চিত্র। শুধু তাই নয়, গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এ চলচ্চিত্রের প্রধান অভিনেতা অভিনেত্রী চীনা দর্শকদেরকে বড় স্ক্রিনে প্রধান চরিত্রের প্রথম চুম্বনও উপহার দেন।

সেই সময় চীনের খুব কম প্রেমনির্ভর চলচ্চিত্রের মধ্যে অন্যতম একটি হিসেবে 'রোমান্স অন লুসান মাউন্টেইন' চলচ্চিত্রটি সেই প্রজন্মের মানুষের মনে সবচেয়ে ক্ল্যাসিকাল স্মৃতি তৈরি করে।

তা ছাড়া, চলচ্চিত্রটি দর্শকদের একান্ত নতুন এক জগত সৃষ্টি করে এবং চীনের প্রেমের চলচ্চিত্রের নতুন অধ্যায় উন্মোচন করে। এখন চীনের লুশান শহরে'রোমান্স অন লুসান মাউন্টেইন' নামে একটি সিনেমা হল আছে। কয়েক ডজন বছর ধরে সেই সিনেমা হলে প্রতিদিন কেবলমাত্র 'রোমান্স অন লুসান মাউন্টেইন' এই চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়। যা গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড সৃষ্টি করে।

৩০ বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে। সেই সময় যারা এ চলচ্চিত্র উপভোগ করেন, তারা নিজেরা এখন মাতাপিতায় পরিণত হয়েছেন। গোটা প্রজন্মের মানুষের ভাবানুভূতি বহন করা এই চলচ্চিত্রটি এখন পর্যন্ত তরুণ-তরুণীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকে।

দুনিয়া-কাঁপানো চীনের মূল-ভূভাগের 'প্রথম কুংফু চলচ্চিত্র'

১৯৮২ সাল হলো সংস্কার ও উন্মুক্তকরণের চতুর্থ বছর। সেই বছর তৃতীয় জরিপ থেকে জানা যায় যে, চীনের লোকসংখ্যা ১০০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। 'চীনের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সমাজতন্ত্র' প্রতিষ্ঠার বিষয়টি তখন প্রথমবারের মতো উত্থাপন করা হয়। সেই বছর 'পরিবার পরিকল্পনা' চীনের মৌলিক নীতি হিসেবে নির্ধারিত হয়। একই বছর 'দ্যা শাওলিন টেম্পল' নামে চলচ্চিত্রটি প্রদর্শিত হয় এবং যা দুনিয়া-কাঁপানো চীনের মূল-ভূভাগের প্রথম কুংফু চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে। এতে দর্শকেরা প্রথমবারের মতো চীনের কুংফু উপভোগ করেন এবং যা বিশ্ব চলচ্চিত্র-ইতিহাসে তাত্পর্যসম্পন্ন।

এ চলচ্চিত্রের বক্সঅফিসের দিক থেকে বলা যায়, ১৯৮২ সালে এই চলচ্চিত্রের টিকিটের দাম ছিলো মাত্র এক চিও, তবে যা ১৬ কোটি ইউয়ান রেনমিনপির বক্সঅফিস সৃষ্টি করে। একই বছর চলচ্চিত্রটি হংকংয়ে প্রদর্শিত হয়। যা ১ কোটি ৬১ লাখ ৬০ হাজার হংকং ডলারের রেকর্ড সৃষ্টি করে এবং হংকং কুংফু চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেকর্ড ভেঙে ফেলে। 'দ্যা শাওলিন টেম্পল' নামে চলচ্চিত্রটি হংকং ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডসের সেরা মার্শাল আর্ট কোচের পুরস্কার অর্জন করে।

জাপানে এ চলচ্চিত্রটি প্রদর্শিত হওয়ার পর ৪০০ কোটি ইয়েনের (জাপানি মুদ্রা) বক্সঅফিস সৃষ্টি করে। দক্ষিণ কোরিয়ায় এ চলচ্চিত্রটি ৫১০ কোটি উনের (দক্ষিণ কোরিয়ার মুদ্রা) বক্সঅফিস সৃষ্টি করে। তারপর পূর্ব এশিয়া তথা সারা বিশ্বে বিখ্যাত হয়ে ওঠে এ চলচ্চিত্র। ফলে চীনের উশু ঢেউ সৃষ্টি হয় সারা বিশ্বে।

আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবে সর্বোচ্চ পুরস্কার অর্জন করা চীনের 'প্রথম ফিচার ফিল্ম'

১৯৮৭ সাল হলো সংস্কার ও উন্মুক্তকরণের নবম বছর। সেই বছর চীনে বাসার দাম হলো প্রতি বর্গমিটার ৪০৮ ইউয়ান। এ বছর চীনে যুক্তরাষ্ট্রের ফাস্ট ফুড কোম্পানি কেএফসি'র প্রথম রেস্তোরাঁ আনুষ্ঠানিকভাবে খোলা হয়। সেই বছর 'রেড সোর্ঘাম' নামে চলচ্চিত্রটি প্রদর্শিত হয়। এতে চীনা জাতির জাপানি আগ্রাসনবিরোধী প্রতিরোধযুদ্ধের সময় এক নারী ও পুরুষের প্রেমের গল্প ও বেদনাদায়ক ভাগ্য তুলে ধরা হয়। এ চলচ্চিত্রটি 'গোল্ডেন রুস্টার অ্যাওয়ার্ডস' ও 'হান্ড্রেড ফ্লাওয়ার্স অ্যাওয়ার্ডসের' সেরা ফিচার ফিল্মের পুরস্কার অর্জন করে এবং বার্লিন চলচ্চিত্র উত্সবে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার লাভ করে। এটি হলো এই পুরস্কার অর্জন করা প্রথম এশীয় চলচ্চিত্র। এই চলচ্চিত্র বিশ্ব চলচ্চিত্র অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়নও সৃষ্টি করে।

কান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবের সর্বোচ্চ পুরস্কার বা 'দ্যা গোল্ডেন পাম অ্যাওয়ার্ড' অর্জন করা 'প্রথম চীনা চলচ্চিত্র'

১৯৩৩ সাল হলো সংস্কার ও উন্মুক্তকরণের ১৫তম বার্ষিকী। সেই বছর চীন প্রথমবারের মতো অলিম্পিক গেমস আয়োজনের জন্য আবেদন করে। বেইজিং মাত্র দুটি ভোটের ব্যবধানে সিডনির কাছে পরাজিত হয়। সেই বছর 'ফেয়ারওয়েল মাই কনকুবাইন' নামে চলচ্চিত্রটি প্রদর্শিত হয়। এতে বেইজিং অপেরার মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির আমেজ তুলে ধরা হয়। ১৯৯৩ সালে চলচ্চিত্রটি চীনের মূল-ভূভাগে প্রদর্শিত হয় এবং দর্শকসংখ্যা এক কোটি ছাড়িয়ে যায়। সেই সময় টিকিটের দাম ছিলো মাত্র ৪ ইউয়ান এবং এ চলচ্চিত্রটি ৪ কোটি ৮০ লাখ ইউয়ান রেনমিনপির বক্সঅফিস সৃষ্টি করে।

১৯৯৪ সালে চলচ্চিত্রটি যুক্তরাষ্ট্রে প্রদর্শিত হয় এবং সেই পর্যন্ত সেদেশে প্রদর্শিত সকল ডোমেস্টিক চলচ্চিত্রের বক্সঅফিসের রেকর্ড ভেঙ্গে ফেলে। এ চলচ্চিত্রটি একইসঙ্গে কান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবে 'দ্যা গোল্ডেন পাম অ্যাওয়ার্ড' এবং মার্কিন 'গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ডসের' শ্রেষ্ঠ বিদেশি ভাষার পুরস্কার অর্জন করা একমাত্র চীনা চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে। এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের 'টাইমস' পত্রিকার নির্বাচিত 'বিশ্বের ইতিহাসে শত শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের' তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। (লিলি/টুটুল)

© China Radio International.CRI. All Rights Reserved.
16A Shijingshan Road, Beijing, China. 100040