Web bengali.cri.cn   
চীনা কোম্পানি হুয়াওয়েইই এবং এর প্রতিষ্ঠাতা রেন চেং ফেই
  2019-09-20 19:38:04  cri

হুয়াওয়েইই টেকনোলোজিস হচ্ছে চীনের একটি বহুজাতিক নেটওয়ার্কিং এবং টেলিকমিউনিকেশন উপকরণ প্রস্তুতকারী ও সেবা প্রদানকারী কোম্পানি। এর সদরদপ্তর কুয়াংতুংয় প্রদেশের শেনচেনে অবস্থিত। ২০১২ সালে এরিকসনকে টপকে এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় টেলিকমিউনিকেশন উপকরণ নির্মাতার স্থান দখল করে নেয়।

১৯৮৭ সালে পিপলস লিবারেশন আর্মির সাবেক ইঞ্জিনিয়ার রেন চেংফেই হুয়ায়েই প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুর দিকে হুয়ায়েই শুধু ফোনের সুইচ প্রস্তুত করতো, কিন্তু ব্যবসা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক তৈরি, অপারেশনাল ও কনসাল্টিং সেবা প্রদান এবং চীনের ভেতর ও বাইরে সামগ্রী সরবরাহ শুরু করে কোম্পানিটি। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হুয়াওয়েই কোম্পানিতে ১৭০,০০০ মানুষ কাজ করত; যাদের মধ্য প্রায় ৭৬,০০০জনই গবেষণা ও উন্নয়ন বা রিসার্চ এন্ড ডেভলপমেন্ট বিভাগে কর্মরত।

চীন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, জার্মানি, কলাম্বিয়া, সুইডেন, আয়ারল্যান্ড, ভারত, রাশিয়া এবং তুরস্কে, হুয়ায়েইয়ের ২১ টি R&D প্রতিষ্ঠান আছে এবং ২০১৪ সালে এরা গবেষণার জন্য ৬.৪ বিলিয়ন ইউএস ডলার বরাদ্দ করে।

২০১৬ সাল শেষ নাগাদ, হুয়াওয়েইয়ের ১.৭ লাখ কর্মী ছিল। হুয়াওয়েইয়ের পণ্য এবং তাদের উত্থাপিত টেলিযোগাযোগ প্রস্তাব ও প্রকল্প বিশ্বের ১৭০টিরও বেশি দেশে প্রয়োগ করা হয়েছে, তা বিশ্বের টেলিযোগাযোগ কোম্পানির সবচেয়ে শক্তিশালী ৫০টির মধ্যে ৪৫টিতে প্রয়োগ করা হয়েছে এবং হুয়াওয়েইয়ের পণ্য বিশ্বের ৩০ শতাংশ জনগণকে সেবা দিচ্ছে।

২০১৬ সালের অগাস্ট মাসে, চীনের শিল্প ও বাণিজ্য কমিশন '২০১৬ সালে চীনের বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে শক্তিশালী ৫শ' কোম্পানির তালিকায় হুয়াওয়েই ৩৯৫ বিলিয়ন ইউয়ানের বার্ষিক আয় নিয়ে তালিকার শীর্ষস্থান দখল করে। ২০১৭ সালের ৬ জুন, '২০১৭ সালে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান ১শ' ব্র্যান্ডের' তালিকায় হুয়াওয়েই ৪৯ নম্বর স্থান অধিকার করে। ২০১৮ সালের ১৯ জুলাই, যুক্তরাষ্ট্রের 'ফরচুন' ম্যাগাজিন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ৫শ' কোম্পানির তালিকা প্রকাশ করে, হুয়াওয়েই এতে ৭২তম স্থান দখল করে। ২০১৮ সালে প্রকাশিত 'চীনের ৫শ' মূল্যবান ব্র্যান্ডের' তালিকায় হুয়াওয়েই ষষ্ঠ স্থানে ছিল।

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভোদাফোন ও হুয়াওয়েই প্রথমবারের মত ৫জি টেলিযোগাযোগ পরীক্ষা শেষ করে। ২০১৯ সালের ৯ অগাস্ট হুয়াওয়েই আনুষ্ঠানিকভাবে 'হার্মোনি ওএস' সিস্টাম প্রকাশ করেছে। গত ২২ অগাস্ট, ২০১৯ সালে চীনের বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ৫শ' কোম্পানির তালিকা প্রকাশিত হয়, হুয়াওয়েই ৭২১.২ বিলিয়ন ইউয়ানের আয় নিয়ে এই তালিকার শীর্ষ স্থানে রয়েছে।

হুয়াওয়েইয়ের সিইও রেন চেং ফেই

রেন চেং ফেই, ১৯৪৪ সালের ২৫ অক্টোবর চীনের কুইচৌ প্রদেশের আনসুন শহরের চেননিং জেলায় জন্মগ্রহণ করেন।

তাঁর পরিবারে ছয় ভাইবোন। তার বাবা রেন মো সুন গ্রামের মাধ্যমিক স্কুলের একজন শিক্ষক। শিক্ষকের পরিবার রেন চেং ফেইয়ের জীবনের ওপর খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। তাঁর বাবা-মা জ্ঞান এবং ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার ওপর অনেক গুরুত্ব দেন, পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ হলেও বাবা মা কখনওই নিজের ছেলেমেয়েকে স্কুল থেকে সরিয়ে নেন নি।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হওয়ার পর রেন চেং ফেই বাহিনীতে যোগ দেন এবং নির্মাণ সৈন্য হিসেবে সেবা দিয়েছেন।

১৯৮৭ সালে রেন চেং ফেই অনেক কষ্ট করে ২১ হাজার ইউয়ান অর্থ সংগ্রহ করে হুয়াওয়েই কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে, হুয়াওয়েই চীনের হংকং বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চলের এক কোম্পানির জন্য program-controlled switchboard SPC exchanges বিক্রির মাধ্যমে কোম্পানির 'প্রথম ব্যারেল সোনা' অর্জন করতে সক্ষম হন।

২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে রেন চেং ফেই কোম্পানির অভ্যন্তরীণ অনলাইন ফোরাম অর্থাত্ বিবিএসে একটি প্রবন্ধ পোস্ট করেছেন। তিনি এই প্রবন্ধে ঘোষণা করেন যে, হুয়াওয়েইয়ের প্রত্যেক কর্মীই কোম্পানির শেয়ার লাভ করতে পারেন। প্রত্যেক কর্মীই কোম্পানির মালিক হতে পারেন। তিনি জানান, তাঁর বাবা মা'র ধৈর্য ও নিঃস্বার্থ চরিত্রের প্রভাবে তিনি এমন উদ্যোগ নিতে পেরেছেন। যাতে হুয়াওয়েইয়ের প্রত্যেক কর্মী কোম্পানির কল্যাণ থেকে উপকৃত হতে পারে। এ ছাড়া রেন চেং ফেই হুয়াওয়েইয়ের সিইও'র পালাক্রমিক ব্যবস্থাপনাও চালু করেন। প্রত্যেকেই ছয় মাসের মত সিইও'র দায়িত্ব পালন করতে পারেন; এর উদ্দেশ্য কোনো একজনের সিদ্ধান্তের কারণে কোম্পানি ব্যর্থতা ঠেকানো। এর আরেকটি উদ্দেশ্য, কোনো একজনের ক্ষমতা বেশি স্থায়ী না হওয়া এবং কোনো এক ব্যক্তির লোভী হয়ে ওঠা ঠেকানো।

২০১৮ সালের ২২ মার্চ, হুয়াওয়েই ঘোষণা করে যে, রেন চেং ফেই আর কোম্পানির বোর্ড চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন না, এর পরিবর্তে তিনি কোম্পানির বোর্ড সদস্য হয়ে থাকবেন।

বন্ধুরা, এবার আমরা দেখি রেন চেং ফেই এ পর্যন্ত কয়টি পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন।

২০০৫ সালে রেন চেং ফেই যুক্তরাষ্ট্রের 'টাইমস্‌' ম্যাগাজিন নির্বাচিত বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী একশ' ব্যক্তির তালিকায় স্থান পান। ২০১১ সালে রেন চেং ফেই ১.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্পদ নিয়ে প্রথমবারের মত 'ফোর্বস ধনীদের' তালিকায় স্থান করে নেন। ২০১৬ সালে আইটি ক্ষেত্রে ধনী ব্যক্তির তালিকায় রেন চেং ফেই ১০.৫ বিলিয়ন ইউয়ানের সম্পদ নিয়ে ৩৫তম স্থানে ছিলেন। ২০১৮ সালের ২৪ অক্টোবর, রেন চেং ফেইকে চীনের সংস্কার ও উন্মুক্তকরণের ৪০ বছরে একশ' জন শ্রেষ্ঠ বেসরকারি শিল্পপতির তালিকায় নির্বাচিত করা হয়। ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে, যুক্তরাষ্ট্রের 'টাইম' ম্যাগাজিনের প্রকাশিত বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী একশ' মানুষের তালিকায় রেন চেং ফেই স্থান করে নেন।

রেন চেং ফেই-এর মন্তব্য

যখন যুক্তরাষ্ট্র হুয়াওয়েইয়ের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করত, তখন রেন চেং ফেই গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাত্কারে তাঁর মন্তব্য তুলে ধরতেন। তাঁর মন্তব্য থেকে আমরা কোম্পানি, দেশের সম্পর্ক, জীবন সম্পর্কে তার মনোভাব জানতে পারি।

'আমরা যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিকে ধন্যবাদ জানাতে চাই'

রেন চেং ফেই বলেন, ৩০ বছরে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সঙ্গে উন্নত হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি আমাদেরকে 'হাটাহাটি'র পদ্ধতি শিখিয়েছে। সবাই জানে, যেসব কোম্পানিকে আমরা সেবা দেই, তারা অধিকাংশই মার্কিন কোম্পানি।

দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের যন্ত্রাংশ উত্পাদন কোম্পানি আমাদেরকে বিরাট সমর্থন দিয়েছে। বিশেষ করে আজকের মতো এমন সংকটময় মূহূর্তে, তারা আমাদেরকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে, আমরা খুব কৃতজ্ঞ।

রেন চেং ফেই আরো বলেন, মার্কিন রাজনীতিকরা খুব সম্ভবত আমাদের সামর্থ্যকে ছোট করে দেখেছেন। টেলিযোগাযোগ খাতের সবচেয়ে আধুনিক বিষয়ে, অন্তত ফাইভজি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আমাদের ওপর অল্প প্রভাবও ফেলতে পারে না। এটা ছাড়া আগামী দুই তিন বছরের মধ্যে বিশ্বের অন্য কোনো কোম্পানি আমাদেরকে ছাড়িয়ে যেতে পারবে না। এ বিষয়ের আমাদের হুয়াওয়েইয়ের সামর্থ ও আত্মবিশ্বাস আছে।

'আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে বর্জন করবো না'।

সাংবাদিকরা জিজ্ঞেক করেন, হুয়াওয়েইয়ের কি যুক্তরাষ্ট্রের চিপ লাগবে। রেন চেং ফেই বলেন, আমাদের সবসময় যুক্তরাষ্ট্রের চিপ দরকার। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের চিপ কিনবো, আমরা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আমাদের চিপও বিক্রি করবো, আমরা আমাদের চিপকে আরও উন্নত করবো, তাই আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে বর্জন করবো না, এটা খুবই সংকীর্ণ চিন্তাধারা। আমরা বিশ্বের উন্নত মানের কোম্পানির সঙ্গে উন্নত হতে পারবো।

বর্তমান বিশ্বে, কেউ এই বিশ্ব থেকে আলাদা থাকতে পারে না। আমাদের উচিত এই বিশ্বের সঙ্গে মিলে মিশে থাকা। আমরা মানবজাতির অভিন্ন তথ্যের সমাজ গড়ে তুলবো।

হুয়াওয়েইয়ের নিজের চিপ গবেষণা সম্বন্ধে রেন চেং ফেই বলেন, আমরা নিজেকে উত্সর্গ করেছি, আমরা নিজের পরিবারকেও উত্সর্গ করেছি, শুধুই একটি আদর্শের জন্য'।

কেন আমরা নিজেই চিপ উন্নয়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছি? আমরা নিজের জীবন, পরিবার, সব কিছুই উত্সর্গ করেছি, তা শুধুই আমাদের আদর্শের জন্য। তা হল বিশ্বে সর্বোচ্চ স্থানে দাঁড়ানো। এখন আমাদের লক্ষ্য হলো 'বিশ্বে প্রথম' হওয়া।

রেন চেং ফেই স্মরণ করে বলেন, ২০০০ সালে আমরা ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থ যোগার করেছি এবং কোম্পানিটি মার্কিন এক কোম্পানির কাছে বিক্রি করতে চেয়েছিলাম। তখন সব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, শুধুই যুক্তরাষ্ট্রের সেই কোম্পানির বোর্ডের অনুমোদন পেলে বিক্রির প্রক্রিয়া শেষ হতো। তবে তখন মার্কিন কোম্পানি আমাদের কোম্পানি ক্রয়ের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে। তখন থেকে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, নিজেকে আরও শক্তিশালী করব।

আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘর্ষের জন্য কিছুটা প্রস্তুতিও নিয়েছি। আসলে আমাদের কোম্পানির সে পরিমাণ অর্থ নেই। আমাদের কর দিতে হয় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, আমাদের বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ব্যয় হয় প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, কর্মীদের বেতনের জন্য ব্যয় হয় প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এসব ব্যয় ছাড়া আমরা আরও অনেক অর্থ ও বরাদ্দ দিয়ে নিজের চিপ উন্নত করতে চাই, আসলেই তা খুব কঠিন ব্যাপার। তবে এত বছর ধরে আমরা নিজের আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য লড়াই করে এসেছি।

'কোনো পণ্যের সঙ্গে রাজনীতিকে জড়ানো ঠিক না'।

যদি কেউ বলে, হুয়াওয়েই'র পণ্য ব্যবহার করা মানে চীনকে ভালোবাসা; আর যদি হুয়াওয়েইয়ের পণ্য ব্যবহার না করে- তাহলে চীনকে ভালোবাসা হয় না, এমন মন্তব্যের সঙ্গে আমি একমত না। হুয়াওয়েই শুধুই একটি পণ্য, যদি আপনি পছন্দ করেন, তাহলে আপনি ব্যবহার করবেন। যদি আপনি পছন্দ না করেন, তাহলে আপনি ব্যবহার নাও করতেও পারেন। এটার সঙ্গে রাজনীতি জড়িত করাটা ঠিক না। প্রত্যেকের নিজের প্রিয় পণ্য বাছাই করার অধিকার আছে।

'প্রাথমিক শিক্ষাদান: শিক্ষকের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে'

রেন চেং ফেই বলেন, তার বাবা মা গ্রামের শিক্ষক ছিলেন। আমার মনে হয়, শিক্ষা হলো জনগণের সাংস্কৃতিক গুণ বাড়ানোর পদ্ধতি। শিক্ষা দেশ ও সরকারের অভিন্ন দায়িত্ব। চীনের উন্নতি করতে চাইলে শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এর পাশাপাশি শিক্ষকের ওপরও গুরুত্বও দিতে হবে। সম্মান পেলে সবাই শিক্ষক হতে চাইবে। এর ফলে দেশের উন্নয়ন বাস্তবায়ন করা যাবে।

© China Radio International.CRI. All Rights Reserved.
16A Shijingshan Road, Beijing, China. 100040