Web bengali.cri.cn   
চীনে ইন্টারনেট মেসেঞ্জার ‍অ্যাপ্লিকেশন উইচ্যাট এবং এর প্রতিষ্ঠাতা
  2019-09-02 08:53:40  cri

২০১১ সালে চীনের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান টেনসেন্ট হোল্ডিংস লিমিটেড একটি অ্যাপ্লিকেশন চালু করে, যার মাধ্যমে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা একে অন্যকে ফ্রি টেক্সট মেসেজ পাঠাতে পারবেন। পাঁচ বছর পর আজ উইচ্যাট (WeChat) দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় মেসেজিং সার্ভিসে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ৬৫ কোটি লোক উইচ্যাট ব্যবহার করে থাকে। লক্ষ লক্ষ চীনা ব্যবহারকারীরা উইচ্যাট এর মাধ্যমে বন্ধুদের টাকা প্রেরণ, জিনিস কেনাকাটা এমনকি চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্টও ঠিক করেন। একটি সাধারণ বার্তা আদান-প্রদান অ্যাপ্লিকেশন এখন ইন্টারনেটের প্রাণকেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু তাই নয়, এর জনপ্রিয়তা ফেইসবুককেও ছাড়িয়ে গেছে। এশিয়াতেই এ বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে।

চীনে এমন কোনো স্মার্টফোন ব্যবহারকারীকে পাওয়া যাবে না, যার উইচ্যাট অ্যাকাউন্ট নেই। চাকুরিজীবি, ব্যবসায়ী, ছাত্র সবাই এটি ব্যবহার করে। অবস্থা এখন এমন পর্যায়ে গিয়েছে যে লোকেরা এখন আর বিজনেস কার্ড আদান-প্রদান করে না; তারা তাদের উইচ্যাট ইউজার নেইম আদান-প্রদান করে থাকে।

উইচ্যাটের উত্থানের সঙ্গে চীনের মধ্যবিত্ত সমাজের উত্থানও নিবিড়ভাবে জড়িত। দেশের অনেক ইন্টারনেট ব্যবহারকারীই তাদের ইন্টারনেটের প্রথম পাঠ নিয়েছেন উইচ্যাট ব্যবহারের মাধ্যমে। চীনে টেক্সট মেসেজ খুবই ব্যয়বহুল। অ্যাক্টিভেট এর মতে চীনে মোবাইলে টেক্সট মেসেজ প্রেরণের খরচ যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ২৬গুণ বেশি। এটাই দেশটিতে মেসেজিং অ্যাপ্লিকেশন জনপ্রিয় করার অন্যতম প্রধান কারণ। উইচ্যাট চালু করার পরে আস্তে আস্তে আরো নানা ধরনের সেবা প্রদান করা শুরু হয়। এর একটি ফিচার আছে অনেকটা ওয়াকি-টকির মতো। উইচ্যাট ব্যবহারকারী তাদের কথা রেকর্ড করে অডিও মেসেজ আকারে পাঠাতে পারে। এর আরেকটি মজার ফিচার হচ্ছে "ড্রিফট বটল" ("Drift Bottle")। এ সেবার আওতায় কোন উইচ্যাট ব্যবহারকারী ভার্চুয়াল বোতলে করে মেসেজ পাঠিয়ে দেয় এবং আরেকজন ব্যবহারকারী যদি সেই বোতলটি কুড়িয়ে নেয় তাহলে সে প্রেরকের সাথে যোগাযোগ করতে পারে।

২০১৩ সালে উইচ্যাট পেমেন্ট সেবা প্রদান করা শুরু করে। এ ধরনের সেবা চালু করার পেছনে টেনসেন্টের মূল উদ্দেশ্য ছিল আলিবাবা গ্রুপ হোল্ডিংস লিমিটেড এর পেমেন্ট সেবা "আলি-পে" কে চ্যালেঞ্জ করা। সফলভাবে এ কাজটি করার পরে উইচ্যাট তাদের মেসেজিং সার্ভিসের মাধ্যমে আরও নানা ধরনের সেবা দেওয়া শুরু করল যেমন-রেস্টুরেন্ট বুকিং, ট্যাক্সি ভাড়া করা ইত্যাদি।

চীনের দ্বিতীয় বৃহত্তম ই-কমার্স সাইট 'জেডি ডট কম' এর শপিং সাইট জেডি মল এর প্রধান নির্বাহী শেন হাউ-ইয়ু বলেন, "এটি (উইচ্যাট) একটি গেটওয়ের মতো যার মাধ্যমে একজন ব্যবহারকারী অনেক সেবা পায়; যেমন-বিনোদন, তথ্য ইত্যাদি।" 'জেডি ডট কম' এর স্টেইক হোল্ডার টেনসেন্ট হোল্ডিং এবং এ কারণে উইচ্যাট ব্যবহারকারীরা চ্যাট অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে জেডি ডট কম এও কেনাকাটা করতে পারেন।

উইচ্যাট এর সবচেয়ে জনপ্রিয় ফিচারের একটি হচ্ছে "ভার্চুয়াল এনভেলপ।" উইচ্যাট ব্যবহারকারীরা এই এনভেলপে করে একে অন্যকে টাকা দিতে ও নিতে পারেন। চীনে 'নববর্ষ' সবচেয়ে বড় উৎসব এবং এ উৎসবে লাল খামের মধ্যে লোকজন টাকা-পয়সা লেনদেন করেন। এ লাল খামকে বলা হয় হোংপাও (Hongbao)| উইচ্যাটের "ভার্চুয়াল এনভেলপ" এই ধারণার উপরে ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। ২০১৪ সালে চান্দ্র নববর্ষের সময় উইচ্যাটের এ ফিচারটি ছাড়া হয়। কিন্তু উইচ্যাট ব্যবহারকারীরা সারা বছরই এখন এটি ব্যবহার করে থাকেন। লিন-চুই-লু চীনের কুয়াংতোং প্রদেশের সেনজেন শহরের একটি স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। তার বয়স ২৭ বছর। সম্প্রতি তারই অফিসের এক সহকর্মী তার জন্যে নিকটবর্তী কেএফসি থেকে দুপুরের খাবার ক্রয় করেন। লিন তাকে উইচ্যাট হোংপাওয়েরর মাধ্যমে ১২ ইউয়ান (১.৮৫ ডলার) পাঠান। তিনি আরো বলেন যে সপ্তাহে কয়েকবার তিনি উইচ্যাট হোংপাওয়ের মাধ্যমে টাকা প্রদান করেন, এমনকি বন্ধুদের জন্মদিনেও তাদেরকে হোংপাও পাঠান। উইচ্যাট এর মাধ্যমে লিন খাবার, সিনেমার টিকেট এবং ট্যাক্সিও ভাড়া করে থাকেন।

লিন নিজেই বলেন যে অন্যান্য যে কোন অ্যাপ্লিকেশনের তুলনায় তিনি উইচ্যাট বেশি ব্যবহার করে থাকেন।

উইচ্যাটের প্রতিষ্ঠাতা চাং সিয়াও লুং-এর জীবনী

চাং সিয়াও লুং, ১৯৬৯ সালের ৩ ডিসেম্বর চীনের হুনান প্রদেশের শাও ইয়াং শহরের তুংখৌ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি হলেন মোবাইলফোন অ্যাপ্লিকেশন উইচ্যাটের প্রতিষ্ঠাতা। চীনের টেনসেন্ট কোম্পানির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট তিনি।

চাং সিয়াও লুং চীনের হুয়াচুং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় Huazhong University of Science and Technology থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি চীনের ই-মেইল অ্যাপ্লিকেশন-ফক্সমেইল সৃষ্টি করেছেন। টেনসেন্ট কোম্পানিতে যোগ দেয়ার পর উইচ্যাট অ্যাপ্লিকেশন চালু করেন। তিনি 'উইচ্যাট পিতা' হিসেবে পরিচিত। 'দ্য ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল' তাকে '২০১২ সালে চীনের উদ্ভাবনী ব্যক্তি' হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে। এ ছাড়া তিনি '২০১৩ সালে চীনের বিজ্ঞান ক্ষেত্রের বার্ষিক ব্যক্তি' হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছেন। এই পুরস্কার নির্বাচন কমিশনের কথা: ১৯৯৬ সালে ফক্সমেইল তার হাতে জন্ম হয়েছে এবং ৪০ লাখ ই-মেইল ব্যবহারকারী এতে লাভবান হয়েছে। ২০০৭ সালে তিনি একটি কর্মদলের নেতৃত্ব দিয়ে নিখুঁত পণ্য উত্পাদনের লক্ষ্যে কিউকিউ ইমেইল পুনর্গঠন করেন। ২০১০ সালে চাং সিয়াও লুং সাফল্যের সঙ্গে উইচ্যাট চালু করেন এবং এর মাধ্যমে চীনের মোবাইল ইন্টারনেটের বাজার সৃষ্টি করেন। ২০১৩ সালে তিনি অব্যাহতভাবে উইচ্যাটকে সুসংহত করেছেন। উইচ্যাট পে আরো জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, কোটি কোটি লোক উইচ্যাট ব্যবহার করছেন।

সহপাঠীর চোখে সবচেয়ে ভালো খেলার মানুষ:

লেখাপড়ার সময় চাং সিয়াও লুং-এর অনেক শখ ছিল। যে কোনো বিষয় হোক, অল্প সময় চর্চার পর চাং সিয়াও লুং দক্ষ হয়ে উঠতেন। বিলিয়ার্ড, টেনিস, বোলিং, পিসি গেমস, তিনি সবসময় সবার মধ্যে সবচেয়ে ভালো খেলতে পারতেন। খেলার পাশাপাশি লেখাপড়াতেও তিনি খুব ভালো ছিলেন।

ফক্সমেইলের প্রতিষ্ঠাতা:

১৯৯৪ সালের শরত্কালে, ২৪ বছর বয়সী চাং সিয়াও লুং হুয়াচুং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি খুব টেলিযোগাযোগ বিভাগে একটি স্থায়ী চাকরি পেয়ে যান। এ চাকরি সবার দৃষ্টিতে ছিল খুব মূল্যবান। কিন্তু চাং সিয়াও লুং তা মনে করতেন না। তাই তিনি এই স্থায়ী চাকরি ছেড়ে গতিময় ইন্টারনেট শিল্পে যোগ দেন।

তখন চীনে যারা ইন্টারনেট শিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের অধিকাংশই একটি ক্ষেত্রে একটি পণ্য উত্পাদন করেন। যেমন কেউ সামাজিক যোগাযোগের সফট্ওয়ার তৈরি করেন, কেউ সার্চ ইঞ্জিন উন্নত করেন ইত্যাদি। চাং সিয়াও লুংও এভাবেই নিজের ইন্টারনেট জীবন শুরু করেন। তখন কেউ কল্পনা করতে পারেনি যে, চাং সিয়াও লুং ফক্সমেইলের মত এত উন্নত জিনিস তৈরি করতে পারবেন।

১৯৯৭ সালে তখনকার কম্পিউটার-বিষয়ক পত্রিকার সাংবাদিক লি সুয়েই লিং স্মরণ করে বলেন, যদি আপনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে একটা হুংকার দিয়ে বলেন: আমি ফক্সমেইলের চাং সিয়াও লুং, নিশ্চয়ই অনেক মানুষ ছুটে এসে আপনার অটোগ্রাফ নিতি চাইবে। সে সময় ফক্সমেইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২০ লাখ ছাড়িয়ে যায়, একে মাইক্রসফটের আউটলুকের সঙ্গে তুলনা করা যায়; একটি ই-মেইল ব্যবস্থা।

২০০০ সালে চাং সিয়াও লুং ১.২ কোটি ইউয়ানের বিনিময়ে ফক্সমেইল অন্য এক ইন্টারনেট কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেন। চাং সিয়াও লুং এভাবে ইন্টারনেট জীবনের প্রথম সাফল্য কুড়িয়ে নেন।

টেনসেন্ট জীবন

২০০৫ সালে চাং সিয়াও লুং টেনসেন্ট কোম্পানিতে যোগ দেন। এটি ছিল চাং সিয়াও লুং-এর ইন্টারনেট জীবনের আরেকটি সুযোগ। ২০১০ সালে চাং সিয়াও লুং টেনসেন্ট কোম্পানির প্রধান মা হুয়া থেংকে মোবাইলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সফটওয়ার উন্নয়নের প্রস্তাব দেন। তিনি মনে করেন, মোবাইল ইন্টারনেটে ভবিষ্যতের সঙ্গে নিশ্চয়ই একটি নতুন যোগাযোগ পদ্ধতি থাকবে। মা হুয়া থেং তার এই প্রস্তাবে সাড়া দেন। এরপর ২০১১ সালে উইচ্যাটের জন্ম হয়েছে। ধীরে ধীরে উইচ্যাটের মাধ্যমে লোকজন আরও বেশি সুবিধা পেতে থাকেন। এখন মোবাইল ইন্টারনেটের ক্ষেত্রে উইচ্যাট অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থানে চলে গেছে। বলা যায়, উইচ্যাট চীনাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় একটি অ্যাপ্লিকেশন।

© China Radio International.CRI. All Rights Reserved.
16A Shijingshan Road, Beijing, China. 100040