Web bengali.cri.cn   
প্রসঙ্গ: চীনের এক্সপ্রেস শিল্পের উন্নয়ন
  2018-10-17 09:08:33  cri

 

সুপ্রিয় শ্রোতা, চলতি বছর চীনের সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ নীতি চালুর ৪০তম বার্ষিকী এবং গেল ৪০ বছরে চীনে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। আগের অনুষ্ঠানে আমরা চীনের এক্সপ্রেস বিতরণ ও প্যাকেজ ডেলিভারি শিল্প এবং এতে জড়িত মানুষের জীবন নিয়ে কথা বলেছি। আসলে চীনের এক্সপ্রেস শিল্প বা পণ্য সরবরাহ শিল্পের যাত্রা শুরু হয় গত শতাব্দীর আশির দশকে, ঠিক সংস্কার ও উন্মুক্তকরণের শুরুর দিকে। তখন থেকে ঐতিহ্যিক মেইলের বদলে চীনা মানুষ বেশি করে এ পদ্ধতির মাধ্যমে পণ্য পাঠানো শুরু করে। এক পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ২০১৮ সালে চীনের এক্সপ্রেস প্যাকেজ হবে ৪৯০০ কোটি। এ সংখ্যার পেছনে যেমন রয়েছে চীনের অর্থনীতির লক্ষ্যণীয় উন্নয়ন, তেমন রয়েছে চীনা মানুষের জীবনরীতির পরিবর্তন।

যখন এক্সপ্রেস শিল্প বা পণ্য সরবরাহ শিল্পের কথা আসে, তখন একটি পেশা কথা উল্লেখ না-করলেই নয়। আর সেটি হচ্ছে সরবরাহ-কর্মী। যারা এ কাজ করছেন, তাদের সংখ্যাও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারা চীনের এক্সপ্রেস শিল্প ও ইন্টারনেটে খুচরা-বিক্রি শিল্পের অপরিহার্য অংশ। ভোক্তারা বাড়িতে বসে কেনাকাটা করতে পারেন তাদের জন্যই।

২৫ বছর বয়সি সিয়াও ওয়াং চিং তুং কোম্পানির একজন সরবরাহ-কর্মী। তিনি দু'বছর ধরে এ কাজ করছেন। আগে তিনি নিজের বাড়িতে একটি দোকান খুলেছিলেন। কিন্তু তার ব্যবসা সফল হয়নি। পরে তিনি বেইজিংয়ে এসে নতুন জীবন শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। সরবরাহ-কর্মীরা যত বেশি কাজ করেন, তত বেশি আয় করেন। তিনি এমন একটি গ্রুপের প্রতিনিধি, যারা এক্সপ্রেস পণ্য বিতরণসংশ্লিষ্ট কাজ করার পাশাপাশি, নিজেও একজন অনলাইন ক্রেতা। সিয়াও ওয়াং জানান, ব্যস্ততার কাজ তাকে পরিপূর্ণ করে। তিনি বলেন, প্রতিবছরের ১৮ জুন, চিং তুংয়ের অনলাইন কেনাকাটা উত্সব এবং ওই দিনে প্রায় সব পণ্যে ডিসকাউন্ট পাওয়া যায়। তাই প্রতিবছরের ১৮ জুনের কাছাকাছি কয়েক দিন তার জন্য সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। তখন প্রতিদিন ভোর ৩টায় তার কাজ শেষ হয় এবং চার ঘন্টা পর সকাল ৭টায় আবার শুরু হয়। তিনি বলেন, বেশি অর্থ উপার্জন করতে চাইলে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। চীনা মানুষের ক্রয়ক্ষমতা দিন দিন বাড়ছে এবং সরবরাহ-কর্মীদের জন্য এটা একটি সুযোগ। ভবিষ্যতে এ শিল্পের আরও উন্নয়ন ঘটবে।

বর্তমানে চীনে সিয়াও ওয়াংয়ের মতো সরবরাহ-কর্মীর সংখ্যা ৩০ লাখ এবং প্রতিদিন তারা ১৩ কোটি প্যাকেজ ক্রেতা বা ক্লায়েন্টের কাছে পৌঁছে দেন। সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ নীতি চালু হবার পর, চীনের অর্থনীতি উন্নয়নের সাথে সাথে পণ্য পাঠানোর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে এবং পরিবহনসহ অবকাঠামো পরিস্থিতি উন্নয়নসাধন ও তথ্যপ্রযুক্তির সংস্কার এক্সপ্রেস বিতরণ শিল্পের জন্য বড় সুযোগ সৃষ্টি করো। ১৯৮০ সালে চায়না পোস্ট চালু করে প্রথম এক্সপ্রেস সেবা এবং আশির দশকের শেষ দিনে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় এক্সপ্রেস শিল্প বাজার। সেসরকারি এক্সপ্রেস কোম্পানির দ্রুত উন্নয়ন গোটা শিল্পের উন্নয়নে চালিকাশক্তি যোগায়। এক্সপ্রেসবিষয়ক ওয়াবসাইট সিইসিএসএসের প্রধান উপদেষ্টা সু ইউং বলেন, ১৯৯২ সালে তত্কালীন নেতা তেং সিয়াও পিং দক্ষিণ চীন পরিদর্শন করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি ভাষণ দেন। তখন থেকে সংস্কার ও উন্মক্তকরণের চাহিদা পূরণে চীনে শুরু হয় বেসরকারি এক্সপ্রেস ব্যবসা। শুরুতে বাণিজ্যিক প্যাকেজ, দলিল ও কাস্টমস পত্র ও চুক্তিসহ নানান জিনিস বিতরণ করা হতো। তখনকার কোম্পানিগুলোর মধ্যে দুটি এখনও আছে: সুন ফেং ও শেন থুং। বর্তমানে চীনের আছে ৭টি তালিকাভুক্ত এক্সপ্রেস কোম্পানি এবং ৩০ হাজারটি (অতালিকাভুক্ত?) এক্সপ্রেস কোম্পানি।

২০০৯ সালে চীনে জারি করা হয় নতুন সংশোধনী পোস্টাল আইন এবং এতে অন্তর্ভুক্ত হয় এক্সপ্রেস শিল্পের মূল নিয়ম এবং একটি ঐক্যবদ্ধ, উন্মুক্ত ও সুশৃঙ্খল এক্সপ্রেস বাজারের জন্য আইনগত নিশ্চয়তা সরবরাহ করা হয়।

পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ২০১৭ সালের শেষ নাগাদ চীনের এক্সপ্রেস ব্যবসার পরিমাণ ১৯৮৮ সালের ১৫৩০ হাজার কোটি থেকে থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০০৫.৬ হাজার কোটিতে। এক্ষেত্রে বার্ষিক গড় বৃদ্ধির হার ৪২ শতাংশ। টানা কয়েক বছর ধরে চীনের এক্সপ্রেস ব্যবসার পরিমাণ বিশ্বে শীর্ষস্থানে আছে। বিতরণ-ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হিসেবে চীনের সরবরাহ-কর্মীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এদিকে, স্মার্ট খুচরা বিক্রি নতুন একটি প্রবণতায় পরিণত হয় এবং সরবরাহ-কর্মী শুধু পরিবহন ও বিতরণ কাজ করেন তা নয়, বরং কমিউনিটিতে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করছেন। এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রায় সব দৈনন্দিন কাজ করতে পারি আমরা। অন্যদিকে, চীনের গ্রামাঞ্চল ও সীমান্ত অঞ্চলে সরবরাহ-কর্মীর সংখ্যাও বাড়ছে। সিয়াও লিউ এখন বেইজিংয়ে লেখাপড়া করছেন এবং তার জন্মস্থান চীনের চি লিন প্রদেশের একটি গ্রাম। তিনি জানান, এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে তার গ্রামের মানুষ বেইজিংয়ের মানুষের মতো একই ধরনের সেবা উপভোগ করতে পারেন।

মাধ্যমিক স্কুলে পড়াকালীন সিয়াও লিউ প্রথম অনলাইনে কেনাকাটা করেন এবং তখনকার একটি প্যাকেজ তার বাড়িতে পৌঁছাতে সময় লেগেছিল এক সপ্তাহ। আর এখন দু'এক দিনে প্যাকেজ তার বাড়িতে পৌঁছে যায়। তার গ্রামের মানুষ অনলাইনে কেনাকাটা করার পাশাপাশি, নিজেরাও ইন্টারনেটে দোকান খুলে ব্যবসা করেন। কৃষিপণ্য ইন্টারনেটের মাধ্যমে দেশের নানা জায়গায় বিক্রয় করেন কোনো কোনো গ্রামবাসী।

২০১৭ সালের শেষ নাগাদ, চীনের গ্রামাঞ্চলে বিতরণ হয় ১০০০ কোটি প্যাকেজ এবং ৬০ কোটি কৃষক অনলাইনে কেনাকেটা করেন। চীনের এক্সপ্রেস কমিটির সাবেক উপ-মহাসবিচ সাও জুং লিন বলেন, ২০০৯ সালের পর এক্সপ্রেস সেবার নেটওয়ার্ক দ্রুত প্রসারিত হয়। চীনের গ্রাম ও সীমান্ত এলাকায়ও তখন এক্সপ্রেস শিল্প প্রবেশ করে। এখন চীনে যে-কোনো একটি জায়গায় মানুষ একই ধরনের পণ্য ক্রয় এবং সেবা উপভোগ করতে পারেন এই এক্সপ্রেস শিল্পের প্রসারের কারণে। এক্সপ্রেস সেবা এখন চীনে সাধারণ একটি সেবায় পরিণত হয়েছে। (শিশির/আলিম)

© China Radio International.CRI. All Rights Reserved.
16A Shijingshan Road, Beijing, China. 100040