Web bengali.cri.cn   
কফিহাউসের আড্ডা: ঈশিতা শহীদ সামসের সঙ্গে আড্ডা; চীনে দুই সন্তানের নীতি ও বাস্তব
  2018-09-21 10:44:18  cri


জীবনে চলার পথে "কত স্বপ্নের রোদ ওঠে, আর কত স্বপ্ন মেঘে ঢেকে যায়! কতজন এলো-গেলো কতজনই আসবে- কফিহাউসটা শুধু থেকে যায়।" প্রিয় বন্ধুরা, কফিহাউসও থাকবে আর এই ২০ মিনিট আমি আছি আপনাদের সঙ্গে। শেয়ার করবো জীবনের অনেক কথা।

সুপ্রিয় শ্রোতা আমি ইয়াং ওয়েই মিং স্বর্ণা। সাপ্তাহিক 'কফিহাউসের আড্ডা' অনুষ্ঠানে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। এ সপ্তাহে আড্ডার বিষয় হচ্ছে: চীনের পরিবারে দুই সন্তানের নীতি ও বাস্তব। আজকের আড্ডায় আমার সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন, ঈশিতা শহীদ সামস, তিনি বাংলাদেশের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের সমাজবিজ্ঞান বিষয়ক প্রভাষক। বর্তমান তিনি পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যা গবেষণা ইনস্টিটিউটে পি এইচ ডি অধ্যয়ন করছেন।

১. চীনে দুই সন্তান নীতির প্রেক্ষাপট

আপনারা জানেন, জনসংখ্যার বিস্ফোরণ ঠেকাতে ১৯৭৯ সালে এক সন্তান নীতি চালু করা হয় চীনে। ২০১৬ সালে এসে অনুমতি দেয়া হয় দুই সন্তান নেয়ার। প্রায় চার দশক পর দুই সন্তান নীতি গ্রহণ করার পর ২০১৭ সালে দেশটিতে জন্মহার বেড়েছে ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। চীনের ন্যাশনাল হেলথ কমিশন বলছে, ২০২০ সাল নাগাদ শিশু জন্মের হার ১ দশমিক ৭ থেকে ২ কোটিতে পৌঁছাবে। ২০৫০ সাল নাগাদ ৩ কোটি তরুণ যোগ দেবে চীনের জনশক্তিতে।

বেইজিং সত্তরের দশকের শেষে এক সন্তান নীতি চালু করে জনসংখ্যাবৃদ্ধি হ্রাস ও খাদ্য নিরাপত্তা বৃদ্ধির আশায়। গ্রামাঞ্চলের দম্পতিরা দু'টি সন্তানের জন্ম দিতে পারতেন যদি প্রথমটি একটি কন্যাসন্তান হতো। লংখ্যালঘু উপজাতিক সম্প্রদায়ের দম্পতিরা একটি অতিরিক্ত সন্তান নিতে পারতেন।

২. এক সন্তান নীতির ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলো

এক সন্তান নীতির ফলে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ঠেকানো গেলেও একই সাথে কমেছে তরুণ ও যুবকদের সংখ্যাও। অন্যদিকে চীনের জনশক্তিতে বেড়েছে বয়স্কদের সংখ্যা।

অনেকেই এক সন্তান নীতিকে চীনের বয়স্কনির্ভরতার জন্য দায়ী করলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, গত তিন দশকে চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি এই নীতি। এই নীতির ফলে বাবা-মাকে সন্তানের পেছনে কম খরচ করতে হয়েছে, ফলে তাঁদের সঞ্চয় বেড়েছে। পাশাপাশি সন্তানের শিক্ষার পেছনে বাবা-মা খরচও বেশি করতে পেরেছেন, ফলে মানসম্মত শিক্ষাও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। এই প্রজন্মের বেশিরভাগই উচ্চশিক্ষিত এবং তাঁরা অর্থনীতিতে বেশ কার্যকর ভূমিকা রেখে চলেছে।

তবে আছে এর বিপরীত দিকও। এক সন্তান নীতির ফলে প্রচুর পরিবার বাস্তবে বৃদ্ধ বয়সে দেখভালের অভাব রয়েছে। এক সন্তানের উপরে চাপ বেড়েছে। ফলে চীনের যে পারিবারিক ঐতিহ্য, তাও অনেক পরিবর্তন হতে হয়েছে। একমাত্র সন্তানের একাকিত্ব অবশ্যই একটি ব্যাপার। সুখে-দুঃখে ভাইবোনেরা একে অন্যের কাঁধে হাত রাখা যায়। একা সন্তান তো সেই সুযোগ পাবে না। তাছাড়া সন্তান কোথায় থাকছে, কার কাছে থাকছে, সেটা তার বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে, একমাত্র সন্তানের জ্ঞানগত ও সামাজিক বিকাশ দেরিতে হয়। বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তারা সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা থেকে পিছিয়ে থাকে। সাধারণত এ ধরনের সন্তানের জীবনে একা সমস্যার সমাধান করার প্রয়োজন হয় না বলে বন্ধুবান্ধব, সহপাঠী বা কারও সঙ্গে দ্বন্দ্ব হলে তা নিরসনের দক্ষতা অনেক ক্ষেত্রে তাদের তৈরি হয় না। মধুর সম্পর্ক দীর্ঘায়িত করার দক্ষতাও কম থাকে। তবে একা সন্তান মানেই জেদি ও স্বার্থপর হয়, এই মত সমর্থন করে না অনেকেই। এখানে পরিবেশ মূল কথা। বাবা মা নিজে সন্তানকে ভাগাভাগি (শেয়ার করা) শিখিয়ে দিতে পারেন এবং সন্তানও সেটা খুব ভালোভাবে ধারণ করতে বলে আমাদের বিশ্বাস।

পরিবারের এক মাত্র সন্তান হিসেবে নিজে দায়িত্বের চাপও বেশি বোধ করা হয় যেতে পারে। যেমন কেউ কেউ বলে, 'সব সময় মনে হয়, আমার ভাইবোন না থাকায় আমার কাছে আব্বু-আম্মুর প্রত্যাশা বেশি। তাঁরা আমার পেছনে অনেক ব্যয় করে। আমাকে তাই তাঁদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে হবে। আমাকে বেঁচেও থাকতে হবে। তা না হলে তাঁদের কোনো অবলম্বন থাকবে না। উল্টোভাবে মনে হয়, তাঁরা না থাকলে আমার কী হবে।'

৩. দুই সন্তান নীতি চালুর পর দম্পতিদের কি মতামত?

আপনারা জানেন, ২০১২ সালে চীনে জনসংখ্যার অনুপাতে শ্রমশক্তি কমতে শুরু করে। ২০১৩ সালের শেষ দিকে চীন পরিবার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের বাধা-নিষেধ শিথিল করা হয়। যেসব দম্পতি দ্বিতীয় সন্তান নিতে আগ্রহী তাঁদের বলা হয় আবেদন করতে। ২০১৫ সালে দুই সন্তান নীতি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হয়। নতুন আইন অনুসারে দম্পতিরা একটি দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দিতে পারেন।

'ওহ! একটাই! আর নেননি কেন?''আর ঝামেলা পোহাতে চাননি বুঝি!' 'ও একা কীভাবে থাকে?''একা যখন, তখন নিশ্চয় অনেক জেদি, স্বার্থপর!' এক সন্তানের মা-বাবাকে জীবনে কতবার যে এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। অনেকে প্রশ্নের পর নিজের মতামতও দিয়ে দেন, 'ভাইবোন না থাকলে মা-বাবার আহ্লাদে-আশকারায় মাথায় ওঠে, কারও সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারে না।' এক সন্তান বিষয়ে সামাজিক কিছু সমস্যার কথা জানালেও আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে একজন মানুষের জীবনযাপনে নিজস্ব পরিকল্পনা ও স্বাতন্ত্র্যকে তাঁরা গুরুত্ব দিচ্ছেন।

এবং চীনে সন্তান প্রতিপালনের যা খরচ, তার পরিপ্রেক্ষিতে দম্পতিরা আর সন্তান চান না – বলে অনেকের ধারণা।

চীনের মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এক সন্তানে থেমে যাওয়ার ব্যাপারে প্রত্যেকের গল্প ভিন্ন। তাঁদের মধ্যে কারও কারও বাড়িতে সন্তান দেখভালের লোক না থাকায় একজনের বেশি তাঁরা নিতে চান না। সন্তান পালনে আর্থিক বিষয়টি জড়িত থাকায় অনেকে এক সন্তানের পেছনে বেশি ব্যয় করে সন্তানের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে মনোযোগ দেন। অনেকে প্রথম সন্তান জন্ম দেওয়ার সময়ের অসুস্থতা কাটিয়ে উঠতে না পেরে দ্বিতীয় সন্তানের ব্যাপারে আগ্রহ পান না। আবার অনেকের প্রাকৃতিকভাবেই এক সন্তানের বেশি হয় না। অনেকে বিয়ের স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয়ে ভোগা থেকে সন্তানের সংখ্যা বাড়াতে চান না। আবার সবকিছু অনুকূলে থাকলেও অনেকে জীবনযাপনে নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতে একটি সন্তানেই সন্তুষ্ট থাকেন।

পেইচিংয়ে কর্মজীবী দম্পতিরা বেশি সমস্যায় পড়েন। এমন পরিবারগুলো বেশির ভাগই পেইচিংয়ের বাইরে থেকে এসেছে। তাঁদের পরিবারে সন্তানকে দেখভালের লোক থাকে না। বদ্ধ ঘরে গৃহকর্মীর ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে তাঁরা সন্তানের জন্য নিরাপদ বোধও করেন না।

মা-বাবা হওয়ার অদম্য আগ্রহ প্রাকৃতিক। প্রত্যেকেই জীবনে সন্তানের সাধ পূরণ করতে চান। তবে সন্তানকে একা বড় করার যে ঝক্কির মধ্য দিয়ে তাঁদের যেতে হয়, তাতে দ্বিতীয় সন্তানে তাঁরা আগ্রহ পান না। যেকোনোভাবে একটি সন্তান নিয়ে জীবনের পরিকল্পনা করে নেন তাঁরা।

৪. দুই সন্তান নেওয়ায় উত্সাহের ব্যবস্থা কি?

(স্বর্ণা/তৌহিদ)

© China Radio International.CRI. All Rights Reserved.
16A Shijingshan Road, Beijing, China. 100040