Web bengali.cri.cn   
প্রসঙ্গ: স্বাস্থ্যখাতে দারিদ্র্যবিমোচন
  2018-08-01 09:53:51  cri

২০১৬ সালের অগাস্ট মাসে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং জাতীয় স্বাস্থ্য সম্মেলনে 'জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে অগ্রাধিকার' কৌশল উত্থাপন করেন এবং 'স্বাস্থ্যকর চীন' ধারণা পেশ করেন। এ প্রেক্ষাপটে, দেশের নানা পর্যায়ের সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিভাগ কাজ করছে। সম্প্রতি বেইজিং ও দেশের অন্যান্য জায়গার ২০০টি চিকিত্সা সংস্থার চিকিত্সক ও স্বেচ্ছাসেবক, বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিকসহ এক হাজারের বেশি মানুষ সি ছুয়ান প্রদেশের কান নান তিব্বত জাতির স্বায়ত্তশাসিত বিভাগে এক সপ্তাহের বড় পরিসরের গণ-চিকিত্সাসেবা তত্পরতায় অংশ নেয়। আমাদের সহকর্মী স্যুয়ে ফেই ফেই শিখাও সে-অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। আজকের 'পুবের জানালা' অনুষ্ঠানে আমরা এর প্রসঙ্গে একটি প্রতিবেদন শোনাবো। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় অংশে থাকবে শিখার একটি সাক্ষাত্কার।

গণ-চিকিত্সাসেবা তত্পরতার অংশ হিসেবে ছিল স্থানীয় জনগণকে বিনামূল্যে চিকিত্সাসেবা প্রদান, অর্থসাহায্য প্রদান, হার্টের অসুখ পরীক্ষা ও সংশ্লিষ্ট চিকিত্সাসেবা প্রদান, স্থানীয় চিকিত্সকদের প্রশিক্ষণদান, চীনের ঐতিহ্যবাহী ওষুধের জন্য বনজসম্পদ রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ, এবং 'স্বাস্থ্যকর গ্রাম' গড়ে তোলার মাধ্যমে দারিদ্র্যবিমোচনের ধারণা বাস্তবায়ন।

Beijing University of Chinese Medicine এর তং চি মেন হাসাপাতালের অস্ত্র চিকিত্সা বিভাগের পরিচালক সি সিয়াও কুয়াং এবার স্থানীয় হাসপাতালে বিনামূল্য চিকিত্সাসেবা দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন দরিদ্র পরিবারের সদস্যদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে চিকিত্সাসেবা দিয়েছেন। এই কাজের অংশ হিসেবে তিনি পাহাড়ি অঞ্চলের একটি দরিদ্র পরিবারের একজন নারীকে চিকিত্সাসেবা দেন। ওই নারী একজন hypokalemicperiodic paralysis রোগী। তার শরীরের বিভিন্ন অংশ প্যারালাইসিসে আক্রান্ত। তার শ্বাসনালীর মাংসপেশীও আক্রান্ত হবার আশঙ্কা ছিল। এ রোগীর নাম আই চিও এবং তার বয়স ৪০। রোগের কারণে তিনি কোনো কৃষিকাজ করতে পারছিলেন না এবং নিজের শিশুদের যত্ন নেওয়াও তার জন্য কঠিন একটি ব্যাপার ছিল। অনেক বার জেলা হাসপাতালে গেলেও সঠিক রোগ নির্ণয় করা হয়নি। এবার বেইজিং থেকে আসা দুজন চিকিত্সক তার রোগ সঠিকভাবে নির্ণয় করেন এবং তাকে বিনামূল্যে ওষুধ দেন। তার স্বামী সাংবাদিককে জানান, "স্ত্রী অসুস্থ থাকলে ভীষণ সমস্যা। আমাদের তিনটি শিশু। আমি একা ওদের যত্ন নিতে পারি না। ডাক্তার সাহেব আমাদের বাসায় এসে আমাদেরকে অনেক সাহায্য করেছেন এবং আমাদের সমস্যারও সমাধান করেছেন।"

চিকিত্সাসেবা দেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের দারিদ্র্যবিমোচনের লক্ষ্যেও বিভিন্ন কাজে অংশ নেন তারা। লি ইউং The General Hospital of the Chinese people's Armed Police Force-এর চীনের ঐতিহ্যিক চিকিত্সা বিভাগের পরিচালক। তা তান নামে একটি উপজেলার একটি দরিদ্র পরিবারে যান তিনি এবং ডাক্তার সি সিয়াং কুয়াংকে সঙ্গে নিয়ে তিনটি শিশুকে শিক্ষার জন্য অর্থ-সহায়তা দেন। তিনি বলেন, "তিনটি শিশু অনাথ। তাদের মা তৃতীয় সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় মারা যান এবং তাদের বাবা গেল বছর লিভার ক্যান্সারের কারণে মারা যান। তাদের দাদা-দানির বয়স ৭০ বছরের বেশি এবং তাদের কোনো আয় নেই। দুজন প্রবীণ তিনটি শিশুকে লালনপালন করতে পারছিলেন না। তাই, দাদা-দাদি শিশুগুলোকে অনাথাশ্রমে পাঠাতে চেয়েছিলেন।" লি ইউং তাদের অবস্থা জেনে নিজের পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করেন এবং তিনটি শিশুকে অর্থ-সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি আশা করেন, তার সাহায্যে তিনটি শিশু শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে এবং পাহাড়ি অঞ্চলের বাইরে জীবন গড়তে সক্ষম হবে।

ক্যাপিটাল মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন আন চেন হাসপাতালের শিশু হৃদরোগ চিকিত্সাকেন্দ্রের ডাক্তাররা উন্নত সরঞ্জাম নিয়ে আসেন। তারা জেলার হাসপাতালে শিশুদের হৃদরোগের পরীক্ষা করেন। ওয়াং সিয়াও ফাং এ বিভাগের উপ-পরিচালক। সকালে তার প্রথম রোগি একটি মেয়ে। তিনি সাংবাদিককে জানান, ১২ বছর বয়সী মেয়েটি জন্ম থেকেই হৃদরোগী, তবে তার অবস্থা গুরুতর নয়। তারা উন্নত চিকিত্সা-সরঞ্জাম দিয়ে শিশুটিকে পরীক্ষা করেন এবং মেয়ের মাকে বিস্তারিতভাবে তার অবস্থা জানান। মেয়ের মা বলেন, ডাক্তার খুব দায়িত্বশীল এবং সার্বিক ও বিস্তারিতভাবে তাকে মেয়ের অবস্থা জানিয়েছেন। আগে তারা অন্য হাসপাতালে গেলেও এমন বিস্তারিত তথ্য জানতে পারেননি। এখন ডাক্তারের কথা শুনে তিনি চিন্তামুক্ত হয়েছেন। বেইজিংয়ের আন ছেন হাসপাতাল শিশু হৃদরোগবিষয়ক সবচেয়ে উন্নত ও পেশাদার হাসপাতাল হিসেবে চিহ্নিত। তবে বেইজিং অনেক দূর ও ব্যয় বেশি বলে তারা কখনও ওখানে যেতে পারেননি। এবার বেইজিংয়ের ডাক্তার তাদের কাছে আসেন এবং তাকে নিজের ফোন নম্বর দেন। ভবিষ্যতে শিশু অসুস্থ হলে সরাসরি ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন তিনি।

আন ছেন হাসপাতালের ডাক্তাররা একটি সেমিনার আয়োজন করেন এবং জন্ম থেকেই হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পর্কে স্থানীয় চিকিত্সকদের প্রশিক্ষণ দেন। তিয়ে পু জেলা হাসপাতালের শিশু বিভাগের পরিচালক সিয়া এন পিং মনে করেন, বেইজিংয়ের চিকিত্সা-বিশেষজ্ঞদের এমন অনুষ্ঠান আয়োজন করা খুব অর্থবহ। এর মাধ্যমে দু'পক্ষের মধ্যে যোগাযোগব্যবস্থা স্থাপিত হয়েছে। এখন থেকে স্থানীয় কোনো রোগীর অবস্থা জটিল হলে, জেলা হাসপাতাল থেকে সরাসরি আন ছেন হাসপাতালে স্থানান্তর করা যাবে। তিনি বলেন, "আমরা পরস্পরের ফোন নম্বর বিনিময় করেছি। ভবিষ্যতে আমরা রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারব এবং আন ছেন হাসপাতালের ডাক্তারদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারব। উপজেলার ডাক্তারদের আমরা প্রশিক্ষণ দেব এবং তৃণমুল পর্যায়ের কোনো হৃদরোগী পাওয়া গেলে আমাদের হাসপাতালে, এমনকি বেইজিংয়ের হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।"

এমন বড় পরিসরে গণ-চিকিত্সাসেবা তত্পরতার আয়োজন ১০ বছর ধরে টানা চলছে। ইয়ান চেন ফেং Beijing University of Chinese Medicine এর তং চি মেন হাসাপাতালের ওটাল্যারিঙ্গওলজি (Otolaryngology) বিভাগের পরিচালক এবং তিনি কয়েক বারের মতো এ-ধরনের আয়োজনে অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি মনে করেন, স্থানীয় মানুষদের বিনামূল্য চিকিত্সা ও ওষুধ দেওয়া ছাড়া, এমন আয়োজনের অন্য অর্থও রয়েছে। তিনি বলেন, "কান নান অঞ্চলের অবস্থা ৫ এমনকি ১০ বছর আগের তুলনায় অনেক ভাল হয়েছে। মানুষের জীবিকার মান এবং স্থানীয় হাসপাতালের অবকাঠামো আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে। আমাদের কাজ আসলে 'স্বাস্থ্যখাতে দারিদ্র্যবিমোচন' করা। আমাদের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যসচেতনতা গড়ে ওঠে এবং এ-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তারা প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও তথ্য জানতে পারেন। তা ছাড়া, স্থানীয় চিকিত্সকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণও দিতে পারি আমরা।"

গেল ১০ বছরে চীনের তিব্বতি জাতি-অধ্যুষিত ৫টি অঞ্চলে এ-ধরনের তত্পরতার আয়োজন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যখাতে দারিদ্র্যবিমোচনকাজে যথেষ্ট অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে এবং হচ্ছে। (শিশিরা/আলিম)

© China Radio International.CRI. All Rights Reserved.
16A Shijingshan Road, Beijing, China. 100040