Web bengali.cri.cn   
পাখির সঙ্গে সহাবস্থান: একটি গ্রামের গল্প
  2018-07-25 12:41:45  cri

 

'হাস্‌! কিছু বলো না। ওরা আসছে।' আঙুল দিয়ে ইশারা করলেন গ্রামের বাসিন্দা নং ওয়ে হং। দেখা গেল কয়েকটি ছোট পাখি বনের ভিতরে উড়ছে এবং পাথরের উপর একে একে এসে বসছে।

চীন-ভিয়াতনাম সীমান্তের কুয়াং সি প্রদেশের লং চৌ জেলার লং হেং গ্রাম চুয়াং জাতিঅধ্যুষিত। এটি একটি পাহাড়ি গ্রাম। এ গ্রাম নং কাং জাতীয় প্রাকৃতিক সংরক্ষণ অঞ্চলে অবস্থিত। গ্রামের মানুষ বংশ পরম্পরায় কার্স্ট পাহাড়ে বাস করে আসছেন। একসময় গ্রামবাসীরা ছিলেন দরিদ্র। কিন্তু এই পাখিগুলো তাদের জীবন পাল্টে দিয়েছে।

প্রতিদিন সকালে নং ওয়ে হং তার মা কিছু পানি ও bread worms নিয়ে বাড়ির পেছনের বনে প্রবেশ

করেন। বনের ভিতর বড় একটি পাথর আছে এবং প্রতিদিন দশ-বারো ধরনের পাখি এখানে এসে খাবার খায়। নং ওয়ে হং প্রতিদিন দু'বার এখানে পানি ও খাবার রাখতে আসেন।

নং কাং জাতীয় প্রাকৃতিক সংরক্ষণ অঞ্চল বিশ্বের বিরল কার্স্ট এলাকায় গ্রীষ্মমন্ডলীয় মৌসুমী বৃষ্টিজনিত জঙ্গল এবং এখানে পশুপাখির সংখ্যা প্রচুর।

 

২০০৫ সালে কুয়াং সি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক চৌ ফাং ও তার ছাত্র চিয়াং আই উ যখন নং কাং জাতীয় প্রাকৃতিক সংরক্ষণ অঞ্চল পরিদর্শন করেন, তখন তারা একটি নতুন ধরনের পাখির সন্ধান পান, যা এর আগে সংশ্লিষ্ট কোনো বইতে আন্তর্ভুক্ত হয়নি। তারা এ পাখির নাম দেন নংকাংসুইমেই। পরে চৌ ফাং ও চিয়াং আই উ প্রামাণ্য জার্নাল 'the Auk'-এ নিজের গবেষণাকাজের ফলাফল নিয়ে একটি প্রবন্ধ লেখেন। নংকাংসুইমে পাখিটি বিশ্বের স্বীকৃতি পায়। তখন থেকে নং ওয়ে হং আবিষ্কার করেন যে, গ্রামে পাখিপ্রেমী ও আলোকচিত্রীদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তাদের অনেকে কৃষকদের বাড়িতে টাকার বিনিময়ে থাকা-খাওয়ার সুবিধা চাইতে শুরু করলেন।

নংকাংসুইমেইর সংখ্যা ২ হাজারের চেয়ে কম এবং এগুলো আন্তর্জাতিক প্রাকৃতিক সংরক্ষণ ইউনিয়নের 'প্রায় বিলুপ্ত' প্রাণীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। গ্রামবাসীরা প্রথমবারের মতো জানল যে, তাদের গ্রামটি বিরল প্রজাতির পাখির স্বর্গ। তা ছাড়া, গ্রামে আরও শতেক ধরনের পাখির বাস।

নং ওয়ে হংয়ের গ্রামে পাখিপ্রেমী ও আলোকচিত্রীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে লাগল। স্থানীয় মানুষের কাছে তারা 'পাখিবন্ধু' নামে পরিচিত। এদিকে, স্থানীয় মানুষের কাছে পাখি জীবনের সাধারণ একটি অংশ। গ্রামবাসীরা প্রতিদিন পাখি দেখতে পারেন, তাদের কিচিরমিচির শুনতে পারেন। তবে পাখি-অনুরাগীদের কাছে নিজেদের চোখে বিরল প্রজাতির পাখি দেখা ও সেগুলোর ছবি তোলা সৌভাগ্যের ব্যাপার।

৬৫ বছর বয়সী হ্য নান প্রদেশের লুও ইয়াং শহরের ওয়াং কুও ছিউং ১০ বছর ধরে পাখির ছবি তুলছেন। চলতি মার্চ মাসে বিরল প্রজাতির পাখির ছবি তোলার জন্য তিনি আসেন নং কাং অঞ্চলে। তিনি জানালেন, এখানে দেশের অন্য জায়গার চেয়ে বেশি প্রজাতির পাখির ছবি তোলা যায়।

দীর্ঘকাল ধরেই নং কাং গ্রামের মানুষের কাছে এসব পাখির বিশেষ কোনো কদর ছিল না। এমনকি গত শতাব্দীর ৭০ ও ৮০-র দশকে তাদের মধ্যে পাখি শিকার ও খাওয়ার অভ্যাসও ছিল। দরিদ্র পাহাড়ি অঞ্চলে পাখি খাওয়া সাধারণ একটি ব্যাপার ছিল। স্থানীয় মানুষের বিশেষ একটি ক্ষমতা আছে যে তারা মুখ দিয়ে বিশেষ একটি শব্দ করতে পারে এবং এ শব্দ শুনে পাখিরা মানুষের কাছে আসে। তাদের এ ক্ষমতা একসময় পাখি শিকারের কাজে লাগত।

গত শতাব্দীর ৯০-এর দশকে চীনে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন জারি করা হয় এবং নং কাং গ্রামে পাখি শিকার বন্ধ হয়। তবে গ্রামবাসীর দারিদ্র্য দূর হয়নি। এবার পাখি এ গ্রামের দারিদ্র্য সমস্যার সমাধান করেছে! গ্রামে পাখিপ্রেমী ও আলোকচিত্রীর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। এখানে তাদের খেতে হয়, থাকতে হয়। তারা এ-জন্য গ্রামবাসীর সাহায্য নেন। গ্রামবাসীরা তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেন, তাদের গাইড হিসেবে কাজ করেন।

গ্রামের যুবকরা নতুন এক ধরনের কাজের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েন। তারা পাখি-গাইড হিসেবে কাজ করেন। তাদের গাইডেন্সে পর্যটকরা দ্রুত পাখিদের অবস্থান খুঁজে বের করেন। তা ছাড়া, গ্রামের যুবকরা পাখিদের ডাকতে পারেন। বিশেষ শব্দ করে পাখিদের ডাকেন তারা। কোনো কোনো গাইড পর্যটকদের থাকা-খাওয়ার ও যাতায়াতের ব্যবস্থাও করে দেন। এধরনের সেবার জন্য তারা পর্যটকদের কাছ থেকে দৈনিক ১০০ থেকে ২০০ ইউয়ান করে নেন। কুয়াং তুং প্রদেশের সু কুও মিন মাত্র অবসর নিয়েছেন এবং চলতি বছর তিনি প্রথমবারের মতো নং কাংয়ে এসে পাখির ছবি তোলেন। তিনি বলেন, ছবি তুলে সন্তুষ্ট না-হওয়া পর্যন্ত তিনি যাবেন না। তাই, প্রতিদিন তিনি গ্রামে ব্যয় করছেন ৩০০ থেকে ৪০০ ইউয়ান।

দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পর্যটক ও পাখিপ্রেমীরা একদিকে গ্রামবাসীর আয় বাড়াতে ভূমিকা রাখছেন এবং অন্যদিকে পরিবেশ সংরক্ষণে সবাইকে উত্সাহ দিচ্ছেন। প্রাকৃতিক সংরক্ষণ অঞ্চলের একজন বনরক্ষক বলেন, "ভাল বন না থাকলে পাখিও থাকবে না। পাখি না থাকলে মানুষ এখানে আর আসবে না। এ বন ও পাখিগুলো আমাদের সম্পদ।"

জেলার একজন ক্যাডার জানান, যেমন মানুষ পানি ছাড়া বেঁচে থাকতে পারে না, তেমন বন পাখির জন্য প্রয়োজন। আগে স্থানীয় মানুষ বন পুড়িয়ে জমি বার করে গর্ত করত এবং বন এতে হতো ক্ষতিগ্রস্ত। তবে এখন কেউ বনের গাছ কাটে না বা পোড়ায় না।

২০১৪ সালে নংকাং জাতীয় প্রাকৃতিক সংরক্ষণ অঞ্চল ও কুয়াং সি লিউ চৌ পাখি পর্যবেক্ষণ কমিটির উদ্যোগে নংকাং গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয় 'পাখি পর্যবেক্ষণ বেস' এবং আরও বেশি স্থানীয় মানুষ এ শিল্পে অংশ নেওয়া শুরু করে। পাখি পর্যবেক্ষণ, পাখি সংরক্ষণ ও এর সংশ্লিষ্ট পর্যটন শিল্প চেন দ্রুত উন্নত হয়।

নং ওয়ে হংয়ের বাড়ির ছাদ একটি পাখি পর্যবেক্ষণ স্পট এবং প্রায় প্রতিদিন পাখি-অনুরাগীরা এখানে এসে পাখিদের আগমনের অপেক্ষা করেন। তাদের উদ্দেশ্যে মাত্র একটি: বিখ্যাত একটি পাখি Sultan Tit-এর ছবি তুলতে চান তারা। ২০১৪ সালে নং ওয়ে হং নিজের বাড়িতে একটি পারিবারিক হোটেল খোলেন।।

পো না গ্রামের মেং চেন হাই একটি দরিদ্র পরিবারের সদস্য ছিলেন এবং তিনি ৩ বছরের মতো পাখি-গাইড হিসেবে কাজ করেন। তিনি তিনটি স্পট গড়ে তোলেন, যেখানে নানা ধরনের পাখির ছবি তোলা যায়। গত বছরের শ্রমিক দিবসের ছুটির সময় অনেক পর্যটক এখানে আসেন এবং ওই সময় একটি পাখি পর্যবেক্ষণ স্পটের আয় হয় গড়ে ১৫০০ ইউয়ান। চলতি বছর তিনি নতুন আয়ের ব্যবস্থা করেন। তিনি একটি ফুলের বাগান করেন। পর্যটকরা নিজেদের পছন্দ অনুসারে বাগান থেকে ফুল সংগ্রহ করতে পারেন। মেং চেং হাই এভাবে দারিদ্র্যমুক্ত হন।

২০১৭ সালে নং কাংয়ে পর্যটকের সংখ্যা ৮ হাজারের বেশি ছিল, যা ২০১৬ সালের ৪ গুণ। এ শিল্পের আয় ১০ লাখের বেশি। বর্তমানে নংকাং গ্রামের ৫টি ছোট অংশে চালু হয়েছে পাখি পর্যবেক্ষণব্যবস্থা। পাখি-গাইডের সংখ্যা ১৮ জন এবং পাখি পর্যবেক্ষণ স্পট ২০টির বেশি। এখানে বর্তমানে পারিবারিক হোটেল ১০টি এবং ৪৭টি দরিদ্র পরিবার এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। পাখি পর্যবেক্ষণের ব্যস্ত মৌসুমে প্রতি পরিবার দু'তিন মাসে ৪০-৫০ হাজার ইউয়ান আয় করে থাকে।

নংকাং পাখি পর্যবেক্ষণ বেস এখন কুয়াং সি প্রদেশের বৃহত্তম একটি বেস। গেল বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে এখানে অনুষ্ঠিত হয় ৫ দিনব্যাপী 'রহস্যময় নংকাং' আন্তর্জাতিক পাখি পর্যবেক্ষণ দিবস এবং এর মাধ্যমে গ্রামটি আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। গ্রামের রাস্তা উন্নত হয়, পার্কিং-ব্যবস্থা উন্নত হয়, দূষিত পানি পরিশোধনের ব্যবস্থাসহ অবকাঠামো উন্নত হয়। গ্রামটি বদলে যায় পুরোপুরি।

গ্রামের মানুষ এখন আর পাখি শিকার করেন না, বরং রক্ষা করেন। তারা নিজেদের বাড়ির সামনে পাখি-অনুরাগীদের তোলা পাখির ছবি ঝুলিয়ে রাখেন এবং সেগুলোতে পাখির নামও উল্লেখ থাকে। নং ওয়ে হং গম্ভীরভাবে বলেন, "আমাদের গ্রাম ও জীবন সুন্দর হয়ে গেছে। আমরা সবাই বুঝি এ বন, এ পাখিগুলো আমাদের সম্পদ এবং প্রতিটি গাছ ও প্রতিটি পাখিকে ভালভাবে রক্ষা করা উচিত আমাদের।" (শিশির/আলিম)

© China Radio International.CRI. All Rights Reserved.
16A Shijingshan Road, Beijing, China. 100040