Web bengali.cri.cn   
চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলাদেশে বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ
  2018-05-21 10:32:14  cri

বাংলাদেশে চীনা রাষ্ট্রদূত চাং জুও সম্প্রতি দেশটির বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামে একটি চীনা শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেন। এসময় তিনি চট্টগ্রামের মেয়র ও চীনা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক আলোচনাসভায় যোগ দেন। সভায় তিনি বলেন, বাংলাদেশে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত স্থানীয় নাগরিকদের সঙ্গে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ানো। প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগও উন্নত করতে হবে। আজকের অনুষ্ঠানে আমরা আমাদের সাংবাদিক ইউ কুয়াং ইউয়ের চট্টগ্রাম থেকে পাঠানো এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন আপনাদের সামনে পেশ করব।

চট্টগ্রাম বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত। শহরটির জনসংখ্যা প্রায় ১৭.৫ লাখ। এখানে কয়েক হাজার চীনা বাস করেন। এদের মধ্যে আছেন বিভিন্ন চীনা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাবৃন্দ। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এ.জে.এম. নাসির উদ্দিন। তার সঙ্গে বৈঠকে রাষ্ট্রদূত চাং জুও বলেন, "চীন ও বাংলাদেশের মৈত্রী সুদীর্ঘকালের। চীনারা চট্টগ্রামে ব্যবসা করছেন ৬ শতাধিক বছর ধরে। চীন আরও বেশি চীনা প্রতিষ্ঠানকে চট্টগ্রামে বিনিয়োগ করতে উত্সাহিত করছে। আমরা আশা করি, চট্টগ্রামের স্থানীয় সরকার ও মিস্টার মেয়র চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে চট্টগ্রামের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে উত্সাহিত করে যাবেন এবং প্রয়োজনীয় সাহায্য-সহযোগিতা দেবেন। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সহজতর ও অনুকূল ব্যবসা-পরিবেশ গড়ে তোলার অনুরোধ জানাই আমরা।"

এসময় মেয়র নাসির চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করায় ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগকারীদেরকে আরও অনুকূল পরিবেশ ও সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করছে। সরকার আশা করে, চীনা বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াবেন। বাংলাদেশ একটি বড় বাজার। বাংলাদেশ আশা করে, চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের এই বড় বাজারের সুপ্তশক্তি কাজে লাগাবেন।

তৈরিপোষাক বাংলাদেশের নেতৃস্থানীয় শিল্প। চট্টগ্রামে পোষাক-উত্পাদনকারী চীনা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি। কুয়াংতুং প্রদেশের চাং ওয়েন শেং ১৯৯২ সালে বাংলাদেশে আসেন। ২০ বছর ধরে তিনি ব্যবসা করছেন। ২০১২ সালে তিনি চট্টগ্রামে 'নতুন যুগ' শীর্ষক পোষাক কোম্পানি গড়ে তোলেন। বর্তমানে তাঁর কোম্পানিতে ১৯ জন চীনা কর্মকর্তা ও ২৫০০ জন স্থানীয় কর্মী ও কর্মকর্তা কাজ করছেন। কোম্পানিটি মূলত জিন্স, ব্যাকপ্যাক, আন্ডারওয়্যার ও নীটওয়্যার উত্পাদান করে এবং সেগুলো ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করে।

চা ওয়েন শেং বললেন, "বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছি। এটি দেশটির জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। আগামী বছর থেকে বাংলাদেশি রফতানি-পণ্যের ওপর কর বসানো হবে। অথচ চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগ করছে মূলত এই কারণে যে, এখান থেকে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানে পণ্য রফতানি করতে কোনো শুল্ক দিতে হয় না। এ ছাড়া, বাংলাদেশের শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক বেতনও বৃদ্ধি পাবে। বাস্তবতা হচ্ছে, চীনে একটি প্যান্ট তৈরির পেছনে কাজ করেন ৩০ থেকে ৪০ জন শ্রমিক; অথচ বাংলাদেশে প্রায় ৬০ জন প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশকে কাঁচামালও আমদানি করতে হয়। এ-অবস্থায় আমরা কী করব? পণ্যের মূল্য বাড়াব, নাকি মান কমাব?"

বাংলাদেশে চীনের বিভিন্ন আকারের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ছাড়াও, অনেক সরকারি মাঝারি ও বৃহৎ উদ্যোগ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন হচ্ছে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। এসব কোম্পানির মাধ্যমে চীনা প্রযুক্তিও এদেশে এসেছে। চায়না হার্বার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড চট্টগ্রামে চীনা শিল্প এলাকার পরিকল্পনা প্রণয়নের দায়িত্ব পালন করছে। এটি হল বাংলাদেশে প্রথম চীনের সরকারি অর্থনৈতিক এলাকা পরিকল্পনা। এলাকাটির আয়তন ৩.৫ বর্গকিলোমিটার। এতে প্রায় ৩০০টি প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করতে পারবে। এই এলাকায় চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ওয়ান-স্টপ সেবা সরবরাহ করা হবে।

চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশান চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে মাল্টি-লেন রোড টানেল (Multi-lane road tunnel under the Karnaphuli River) তৈরি করছে। এতে মোট অর্থ ব্যয় হবে ৭০.৫৮ কোটি মার্কিন ডলার। প্রকল্পের মোট দৈর্ঘ্য ৯২৯৩ মিটার। এর মধ্যে সুড়ঙ্গ ৩৩১৫ মিটার। প্রকল্পটি ৫ বছর মেয়াদি। কোম্পানির বাংলাদেশ শাখার দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ফাং মিং বলেন, প্রকল্পটি নির্মিত হওয়ার পর শুধু যে বাংলাদেশের পরিবহনব্যবস্থা উন্নত হবে, তা নয়; বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার করিডোরের নির্মাণকাজ ও আঞ্চলিক যোগাযোগেও অগ্রগতি অর্জিত হবে।

চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশের তেল কোম্পানির সঙ্গে 'বাংলাদেশ একক পয়েন্ট মুরিং এবং ডাবল পাইপলাইন প্রকল্পের ইপিসি চুক্তি' স্বাক্ষর করে। প্রকল্প অনুযায়ী, সমুদ্রে ও স্থলে ২২০ কিলোমিটার দীর্ঘ তেল-পাইপলাইন নির্মিত হবে। ২০২১ সালের জুলাই মানে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। চীনা তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইন ব্যুরোর নিরাপত্তা জেনারেল পর্যবেক্ষক হু লি ফেং বলেন, "বর্তমানে বাংলাদেশে একটি তেল শোধনাগার রয়েছে। এর বার্ষিক উত্পাদন-ক্ষমতা প্রায় ১৫ লাখ টন। বাংলাদেশের অর্থনীতি উন্নত হচ্ছে, কিন্তু তেলের উত্পাদন-ক্ষমতা অপর্যাপ্তই রয়ে গেছে। সেজন্য বাংলাদেশের তেল কোম্পানি উত্পাদন-ক্ষমতা বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উত্পাদন-ক্ষমতা ৪৫ লাখ টনে উন্নীত হবে।"

এ-সম্পর্কে রাষ্ট্রদূত চাং জুও বলেন, "চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত উচ্চপ্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলা করা। মানকে সবসময় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। স্থানীয়দের সঙ্গে আত্মার সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে এবং এ-সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে। এভাবে বিদেশে বিনিয়োগের সাফল্য অর্জিত হতে পারে।"

বাংলাদেশ ছিল বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলির মধ্যে একটি। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে দেশটি অর্থনীতিতে টানা ৬ শতাংশেরও বেশি হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে। এখন বাংলাদেশ হল দক্ষিণ এশিয়ায় অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় দেশগুলোর অন্যতম। 'এক অঞ্চল, এক পথ' ও 'বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর' উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ অধিক থেকে অধিকরত চীনা প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেও সক্ষম হচ্ছে। (ছাই/আলিম)

© China Radio International.CRI. All Rights Reserved.
16A Shijingshan Road, Beijing, China. 100040