Web bengali.cri.cn   
আমার স্বপ্নময় চীন- তাছলিমা আক্তার লিমা
  2018-03-26 09:42:30  cri

আমি বলছি সে এক স্বপ্নময় চীনের কথা। কারণ, রেডিওতে চীনের, চীন দেশের অপার সৌন্দর্যের ধারা শুনতে বা শ্রবণ করতে করতে স্বপ্নে যেন ঐ দেশে হারিয়ে যেতাম এবং যখন শ্রোতাসম্মেলনে ঐদেশের মানুষকে প্রথম দেখলাম বিশেষ করে মাদাম ইউকে দেখে তখন মনে হলো এযেন স্বপ্ন দেশের পরী। আমি প্রথম যখন চীনে চিঠি লিখলাম আর আমার প্রথম চিঠির জবাব ঐপার থেকে রেডিওতে ভেসে আসল এবং ঐদেশের মানুষের কন্ঠে, সে যেন এক অন্যরকম অনুভূতি। প্রজাপতি যেমন ফুলে ফুলে উঠে বেড়ায়, নীল আকাশে পাখি উড়ে বেড়ায়, নদীর স্রোতগুলো ঢেউ খেলে যায়, মিষ্টি হাওয়ায় যেমন ফুলেরা দোলে তেমনি আমার মন নেচে উঠেছিলো সেদিন। আর সে দেশকে দেখার স্বপ্ন আঁকতে থাকলাম মনে মনে। দেখানো ভালোবাসা নয় অন্তর দিয়ে শুনতাম রেডিওর অনুষ্ঠান। আর স্বত:স্ফূর্ত ভালোবাসার টানে লিখে যেতাম হাজারো চিঠি। আর এই ভালোবাসার প্রতিদান ঠিকি পেলাম আমি হঠাৎ একদিন। সে হলো আমার স্বপ্নময় চীন দেশে যাওয়ার টিকেট।

২০১৩ সালে বিশ্বের ৬৫টি ভাষায় সম্প্রচারিত চীনের একমাত্র সরকারী বেতার "চীন আন্তর্জাতিক বেতার (সিআরআই)"-এর ৪১১২টি দেশী-বিদেশী বেতার শ্রোতাসংঘ ও ওয়েবসাইট ফ্যান ক্লাবের মধ্যে পরিচালিত "সিআরআই শ্রেষ্ঠ শ্রোতাসংঘ পুরস্কার ২০১৩" প্রতিযোগিতায় আমাদের সাউথ এশিয়া রেডিও ক্লাব বছর জুড়ে চীনের সংস্কৃতি বিনিময়, সিআরআই-এর অনুষ্ঠান প্রচার ও বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে চীনের বন্ধুত্ব জোরদারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন করায় শ্রেষ্ঠ পুরস্কার লাভ করে। এবং ক্লাবের প্রতিনিধি হয়ে আমি চীনে ভ্রমণের সুযোগ পায়। এই ধরনের সৌভাগ্যময় সুযোগ সবার ভাগ্যে আসেনা। যাক, অবশেষে আমি আমার স্বপ্নময় চীনে যাব এই ভেবে আনন্দে উৎফুল্লে প্রস্তুতি নিচ্ছি, কেনাকাটা করছি। ফোনে সবাইকে জানাচ্ছি। আমার বন্ধু-বান্ধব, আত্নীয়-স্বজন সবাইতো খুবই অবাক যে আমি চীনে যাবো। আমার মনে হয় বাংলাদেশের কোন শ্রোতাক্লাব থেকে কোন মেয়ে শ্রোতা এই প্রথমবার চীন দেশে ভ্রমণ করবে। শুধু তাই নয়, আমার জীবনেও এই প্রথম বিদেশ ভ্রমণ করা।

 

যখন আমি আমার মা, বড় ভাই ও ভাই-এর ছেলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমার স্বামীসহ ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের লাউঞ্জে প্রবেশ করলাম। ইমিগ্রেশন রুমে যখন ডুকে পড়লাম তখন আমার মনে খুব ভয় করছিল এবং চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে যাওয়ার আগে কুনমিং এয়ারপোর্ট-এ বিমান থেকে নেমে ইমিগ্রেশন কার্যক্রম শেষ করে ভিন্ন টার্মিনাল দিয়ে পূনরায় বিমানে উঠতে হয়। সেটা জেনেও খুবই ভয় পেলাম যে ঠিকমত অন্য বিমানে উঠতে পারব কিনা। তখন বাংলাদেশ থেকে ৪০ সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের সরকারী একটি টিম বেইজিংয়ে যাচ্ছিল প্রশিক্ষণ নিতে। তাদের কয়েক জনের সাথে কথা বলে মনটা কিছুটা হালকা হল এবং বিমানে উঠে আর একজোড়া বুড়ো-বুড়ির সাথে কথা বলে ভালো লাগলো যে তারা তাদের ছেলের বাসায় যাচ্ছে বেইজিংয়ে, আর তাদের ছেলের বউ হল চীনা মেয়ে। তাদের সাথে গল্প করতে করতে পুরো সময় কেটে গেল। তবে যখন বিমান বেইজিং শহরে নামবে তখন কিছু উপর থেকে অনেক আলোর বিচ্ছুরণ দেখতে পেলাম। কি যে সুন্দর লাগছিলো আলোর মেলা গুলোকে। রাত ঠিক ২টা বাজে। বিমান বন্দরে আমাকে নিতে এসেছিলো সিআরআই বাংলা বিভাগে কর্মরত একটি ছেলে, তার চীনা নাম মোং ফেন সি এবং বাংলা নাম প্রকাশ। তিনি আমাকে চেনেন না বা কখনো সরাসরি দেখেননি, তবে নাম জানেন। বিমানে পরিচিত সেই বুড়ো-বুড়ির ছেলেও এসেছিল তাদেরকে নিতে। কাকতালীয় ভাবে সেই ছেলে এবং প্রকাশ ভাই দুজনে নাম ধরে খুঁজে বের করল আমাকে। সে সময় আমিতো খুবই অবাক এবং অভিভূত এই ভেবে যে এত সুন্দর সুদর্শন একজন ছেলে এসেছে আমাকে রিসিভ করতে। তখন তার কথাবার্তা ছিল শুধু বাংলায়। তিনি আমাকে গাড়ীতে করে নিয়ে যাচ্ছিলেন হোটেলের দিকে। আমি গাড়ীতে বসে স্বপ্নময় চীনের রাত্রীকালীন শহরটা দেখছিলাম। পুরো শহরটাই ছিল আলোকময় উজ্জ্বল। প্রকাশ ভাইয়ের সাথে কথা বলছিলাম আর ভাবছিলাম এ কোন স্বপ্নপুরীর রাস্তা, এত সুন্দর চারিপাশ, নিবর, নির্ঝর, যানজটহীন। গাড়ীটা এসে থামল হোটেলের সামনে। হোটেলতো নয় মনে হল কোন স্বপ্নপুরীর রাজার বাড়ী। তখন প্রকাশ ভাই যথেষ্ট সহযোগিতা করেছেন আমাকে। আমার লাগেজ, হোটেলের রুমের দরজা বন্ধ ও খোলার নিয়ম দেখিয়ে দিয়েছেন এবং সকালে কোথায় নাস্তা খাব তাও বলে দিয়েছেন। হোটেলের রুমের ভিতরে সত্যিই রাজকীয় হাল ছিল।

রাতশেষে সকালে নাস্তা খেতে গিয়ে খাওয়ার আগেই জিবে জল এসে গিয়েছে আমার। হল রুমে লাইনে লাইনে সাজানো নানা রকমের অনেক অনেক খাবার অর্থাৎ বুফে ব্রেকফাস্টে (Buffet Breakfast) খাবারের আইটেম দেখে আমি দিশেহারা। আমি বাহারী ধরনের খাবার দেখব না খাব! এত ধরনের মজার মজার খাবার যেন রাজার খাবারের টেবিলেও হার মানাবে। খাবার দেখতে দেখতে আর কোনটা রেখে কোনটা খাব প্লেট নিয়ে টেবিল সাজাতে সাজাতে আমার খাবারের সময় চলে যাচ্ছিলো। টেবিলে বসলাম খাব ঠিক তখন একজন ওয়েটার এসে বলছিল আমার খাবারের সময় আর মাত্র ৫ মিনিট আছে। একি সময় আমার সাথে যিনি সবসময় থাকবেন সিআরআই-এর কর্মকর্তা একজন নারী নাম তার ছাই ইউয়ে (মুক্তা) তিনি এলেন। তিনি যেমন দেখতে সুন্দরী তেমন তার মিষ্টিকন্ঠস্বর ঠিক যেন নীল আকাশের হলুদ পরী। মুক্তার কন্ঠ রেডিও-তে আমি নিয়মিত শুনলেও বাস্তবে তার সাথে আমার এই প্রথম দেখা। তিনি আমার জন্য তারাতারি বক্সে কিছু খাবার নিয়ে নিলেন এবং খাবারের রুম থেকে বেড়িয়ে অন্যান্য দেশের ৬ জন শ্রোতার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তারাও সবাই খুবই আন্তরিক ছিলেন। আমরা সবাই মিলে গ্রুপ ছবি তুললাম হোটেল লবিতে। ছবি তোলা শেষে মুক্তা আমাকে হোটেলের গেইটে নিয়ে গেলেন। বললেন, ম্যাডাম ইউ আসছেন আপনার সাথে দেখা করতে। দেখলাম ম্যাডাম ইউ কিছু দূর থেকে হেটে আসছেন আমাদের দিকে এবং এসে কুশল বিনিময়সহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বললেন আমার সাথে। এরপর একটি সুন্দর উপহার আমায় দিলেন। সেই অপূর্ব আনন্দের মুহূর্তের কথা কখনোই আমি ভুলতে পারব না। তার অমায়িক ব্যবহার, সুন্দর কথা আমার মন ছুয়ে গিয়েছিল। মুক্তাকে বলে দিলেন আমার যেন কোন অসুবিধা না হয়। এরপর আমরা সবাই গাড়িতে উঠে বসলাম এবং গাড়ীর মধ্যে আমরা সবাই যার যার নিজ পরিচয় দিলাম এবং একটি করে গানও গাইলাম। সেখানে একটা মজার কান্ড ঘটেছিল, ভারত থেকে যিনি গিয়েছিলেন তিনি নিজ পরিচয় দিলেও গান গাইতে খুবই লজ্জাবোধ করছিলেন। সবাই বার বার বলা সত্বেও তিনি গাইছিলেন না। তখন আমি একটি হিন্দি গানের চারটি লাইন গেয়ে দিলাম এবং এ নিয়ে আমরা খুব হেসেছিলাম। যাইহোক সেদিন আমরা প্রথমেই একটি রেস্তোরায় গিয়ে খাওয়া-দাওয়া করে তিয়েন আন মেন স্কয়ার ও নিষিদ্ধ নগরীতে যায়। Provident City নিষিদ্ধ নগরী নির্মিত হয় ১৪০৬ সালে। এরপর Temple of Haven পার্কে যায়। থিয়েন থান শহরটি ১৪২০ সালে নির্মিত হয়। আমার যতটুকু মনে আছে তা হল এখানে রাজারা ছিলেন মিং ও ছিন বংশের। আগের দিনের রাজারা ছাড়া অন্য কারো হলুদ রং ব্যবহার করা নিষিদ্ধ ছিল। ওখানকার বিল্ডিং এর ছাদে নীল রং হলো আকাশকে শ্রদ্ধা করার জন্য এবং সৈনিকদের স্মরণে এক ধরণের পিলার বা স্তম্ভ আছে যেটাকে সবাই শ্রদ্ধা করে এবং সেখানে পা রাখা যায় না। মুক্তা আমাকে এগুলো বুঝিয়ে দিচ্ছিলো যা আমার চোখে এখনো ভাসে। ৭৮৯ নামের একটি আর্ট কেন্দ্রে গিয়ে চমৎকার চমৎকার আর্ট দেখে আমি খুবই অভিভূত হয়েছিলাম। আমার মনে আছে যতগুলো রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলাম তার মধ্যে একটি রেস্টুরেন্ট চিন দিং স্যুয়ান। এটা দক্ষিণ চীনের বৈশিষ্ট্যময় খাবারের জন্য বিখ্যাত। এরপর Silk Market সিল্ক মার্কেটে গিয়েছিলাম সবাই। কেনা কাটা করেছি। আমরা একটা গ্রামেও গিয়েছিলাম তার নাম ছিল সি ওয়াং। গ্রামটির পরিবেশ খুবই সুন্দর ছিল। ঐ গ্রামের কয়েকটি বাড়ী ছিল যা চোখের নজর মুহূর্তেই কেড়ে নেয়। তার কারণ হল বাড়ির দরজায় আসবাবপত্র বিশেষ করে খাবারের টেবিল, সোফা, পালঙ্ক, টেবিল টেনিস সহ অভূতপূর্ব সব ডিজাইন রয়েছে। যা ড্রাগনের, হাতি, বাঘ, ও অতীত দিনের নানান ঘটনার কথা সে সব ডিজাইনে অঙ্কিত রয়েছে। যা দেখার মত। নিজ চোখে না দেখলে বুঝানো যাবেনা সে সব মুহূর্তের কথা। এসব সম্পর্কে বাড়ীর মালিকের কাছে জেনে নিয়েছিলাম। আমরা সবাই সেখানে গ্রুপ ছবি তুলেছি।

আরেকদিন আমরা ইয়ং হো কং Tama Trample–এ গিয়েছিলাম। যতদূর মনে পড়ে এর ভিতরে খুবই সুসজ্জিত চমৎকার বাড়ী রয়েছে। তার ভেতরে আরো অতি চমৎকার সাজে বৌদ্ধ মূর্তি রয়েছে। যাকে তিব্বতীদের একটি ধর্ম বলা হয়। এখানে বিশাল কারুকার্জের বড় একটি বৌদ্ধ মূর্তি দেখেছি যা চারতলা ভবনের সম মানের উঁচু। আমি খুবই বিস্মিত ও অবাক হয়েছি। কারণ এত বড় মূর্তি এর আগে কখনো আমি দেখিনি। এখানের এক বৌদ্ধ রাজা ছিলেন যার জন্য একটি পুকুর হয়েছিল এবং তিনি খুবই ভালো লোক ছিলেন। আর তিনি মাছ থেকে ড্রাগনে পরিণত হতে পারতেন। তাই অনেক চীনা মহিলারা তাদের সন্তানকে এখানে নিয়ে আসতেন যাতে তাদের সন্তানদের ভাগ্য ভালো হয়। ঐ বৌদ্ধ রাজা ড্রাগনকে তারা প্রভু বলে শ্রদ্ধা করতেন।

যাক এবারে আমার ভ্রমণের সবচেয়ে মজার, আনন্দের ও উত্তেজনাপূর্ণ দিনের কথা বলব। সেটা হলো যেদিন আমরা ছাং ছোং Great Wall অর্থাৎ চীনের মহাপ্রাচীরে গেলাম। আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে পাঠ্য বই-এ পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের একটি এই চীনের মহাপ্রচীরের গল্প পড়েছিলাম। এ সম্পর্কে তেমন কিছু মনে না থাকলেও চীনের মহাপ্রচীরের নামটি আর তার আংশিক আবছা ছবি ছাপানো ছিলো বই-এ। তখন ভেবেছি এটা কী, কেমন এই প্রচীর? কেন এত নাম হল এই প্রাচীরের? কেন এটিকে পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের একটি বলা হলো? সেটা আজ বুঝতে পারলাম যখন এই Great Wall-এর সিড়ি গুলো ধাপে ধাপে একের পর এক অতিক্রম করে উপরে উঠে যাচ্ছিলাম। সিড়ি গুলো বেয়ে উঠে যাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। এক একটি সিড়ির ধাপ বেয়ে উঠে আপনাকে হাপাতে হবে। কারণ এই সিড়ির প্রাচীর গুলো কিছু ঢালু ধরনের। তবে একবার সিড়ি বেয়ে যখন উঠবেন তখন আপনার কৌতুহল আরো বেড়ে যাবে যে আর একটি উঠে দেখি নিচের দিকে তাকালে কেমন লাগে। এভাবে সবচেয়ে সর্বশেষ সিড়িতে যাওয়ার কৌতুহল আপনাকে প্রলুব্ধ করবে যেখানে গেলে নিচের কোন মানুষ, বাড়ী-ঘর, নিচের কোন গাছ-পালা দেখা যায় না। উঁচু প্রাচীর থেকে নিচের দিকে তাকালে শরীরটা কেমন ছমছম করে ওঠে। মনে হয় এই যেন পড়ে গেলাম। আমি ভয়ে প্রাচীরের পাশে দাড়িয়ে নিচের দেকে একটু কম তাকিয়েছি। ভেতরে ভেতরে অদ্ভুত একটি ভয় কাজ করছিলো। প্রাচীর থেকে শুধু দূরের পাহাড়ের গাছ-পালা দেখা যায় আর নীল আকাশ দেখা যায়। আকাশ, আমি আর মহা প্রাচীর সে এক অন্যরকম অনুভূতি। মনে হয় যেন আমি প্রাচীর বেয়ে আকাশের ভিতরে কোন এক অজানা রাজ্যে চলে যাচ্ছি। চারিদিক তখন সুন্দর আবহাওয়া। অসাধারণ অপরূপ সেই দৃশ্য। এখানে না এলে এত কাছ থেকে না দেখলে এর অপার সৌন্দর্য কেউ বুঝতে পারবে না। বিশ্বের সেরা নামকরা আদর্শময় এই Great Wall এতে যে একবার উঠবে সে জীবনে আর তার কথা ভুলতে পারবে না। মনে হবে অজানা স্বপ্নে এই অসাধারণ প্রাচীর বেয়ে দূরের আকাশকে নিজ হাতে ছুয়ে দেখেছি। স্বপ্নময় চীনে গিয়ে আমার জীবন সত্যি সফল আর স্বার্থক হয়েছিল এই চীনের মহাপ্রাচীর বা Great Wall-এ উঠে। চীনের নামকরা এই ছাং ছোং এর বয়স প্রায় দেড়শ বছর। এটি ৫ থেকে ৮ মিটার উঁচু এবং নয় হাজার কিলোমিটারের অধিক লম্বা।

এরপরদিন আমাকে সিআরআই ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গিয়ে আমার খুবই ভালো লেগেছে। ইথারের মাধ্যমে যে ভবন থেকে পাঠানো অনুষ্ঠান আমরা রেডিও সেটে শুনতাম ঠিক সেই ভবনে এখন আমি অবস্থান করছি। সত্যি এটা আমার জন্য বিস্ময়কর, গর্বের এবং পরম আনন্দেরও। আমি আবেগে আফ্লুত। এখানে সিআরআই-এর সকল বিভাগ আলাদা আলাদা। তবে বাংলা ও হিন্দি বিভাগ পাশাপাশি। সিআরআই বাংলা বিভাগে প্রবেশের পর সকল কর্মীদের সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন মুক্তা। এতদিন ইথারে যাদের শুধু কন্ঠ শুনেছি আজ তাদের অনেকের সাথে বাস্তবে দেখা হলো। সত্যি আমি মহা ভাগ্যবান। তারা সকলে খুবই ভালো। আমি সিআরআই বাংলা বিভাগের জন্য আমার হাতের শেলাই করা একটি বড় ওয়ালমেট উপহার দিয়েছি। আর বাংলা বিভাগ থেকে আমাকেও বিভিন্ন ধরনের অনেক উপহার দেয়। তা পেয়ে আমি খুবই আনন্দিত ও উৎফুল্ল। পরে বাংলা বিভাগের সকলে মিলে আমরা একটি গ্রুপ ছবি তুলি এবং আমার একটি সাক্ষাৎকারও নেয় প্রকাশ ভাই। একিদিন সিআরআই ভবনে ৮টি দেশের ৮ জন শ্রোতাকে নিয়ে একটি আলোচনা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সিআরআই-এর ৮টি বিভাগের প্রতিনিধি সহ সিআরআই-এর উচ্চ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন অনুষ্ঠানে। বাংলাদেশ, ভারত, আর্জেন্টিনা, রোমানিয়া, মরক্কো, বুলগেরিয়া, জাপান এবং ব্রাজিল থেকে আমরা যারা বিজয়ী ক্লাবের প্রতিনিধি হিসেবে চীন ভ্রমণ করেছি তারা প্রত্যেকে নিজ নিজ দেশে কিভাবে সিআরআই-এর প্রচার প্রচারনায় কাজ করে থাকি তা তুলে ধরার চেষ্টা করি। আমি বাংলা ভাষায় বক্তব্য রাখলেও মুক্তা সেটি চীনা ভাষায় অনুবাদ করেন। এবং ঘটনাক্রমে আমাদের ক্লাব কার্যক্রম নিয়ে আলোচনাটি উপস্থিত সকলের কাছে বেশি ভালো লেগেছে বলে সিআরআই-এর নেতাদের চীনা ভাষার প্রতিক্রিয়া মুক্তা আমাকে বাংলায় অনুবাদ করে জানান। সত্যি তখন মনে হয়েছে আমরা বাংলাদেশে সিআরআই তথা চীনা সংস্কৃতির প্রচার প্রচারনায় যে নিরলস ভূমিকা পালন করে যাচ্ছি সেটা সফল হয়েছে, সার্থক হয়েছে। অনুষ্ঠানে আমাদের সবাইকে কিছু না কিছু করে দেখাতে বলা হয়েছিল। সেখানে আমি একটি গান পরিবেশন করেছিলাম এবং সেটিরও খুব তারিফ করেছিলেন সবাই।

আলোচনা অনুষ্ঠান শেষে আমাদের প্রত্যেককে মূল্যবান পুরস্কারসহ সার্টিফিকেট দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানের শেষে আমাদের সৌজন্যে লাঞ্চের আয়োজন করা হয়। সেখানে অনেক শ্রোতাই অল্প অল্প খেয়েছেন কিন্তু আমি প্রায় সব ধরনের চীনা খাবার খেয়েছি। সেটা দেখে সেখানকার সবাই খুবই খুশি হয়ে বলেছিলেন যে তিনি আমাদের খাবার খেতে পারছেন। কারণ অন্য দেশের কোন শ্রোতা তাদের (চীনের) খাবার বেশি বেশি খেলে তারা খুবই খুশি হন।

খাবার প্রসঙ্গ যেহেতু এসেছে তখন বিশেষ ভাবে উল্লেখ করতেই হবে চীনের স্পেশাল একটি খাবার সম্পর্কে। আর তা হচ্ছে "বেইজিং ডাক"। হ্যাঁ, চীন ভ্রমণের সময় একদিন আমাদের চীনের ডাক খাওয়ানো হয়েছিল। চীনের ডাক সেটা চীনের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং নামকরা খাবার বলে পরিচিত। শুনেছি যে চীন দেশে বেড়াতে গিয়ে চীনের ডাক বা বেইজিং ডাক যদি কেউ না খায় তবে তার চীন দেশে বেড়ানো অসম্পূর্ণ থেকে যায়। চীনের ডাক, সে এক অসাধারণ, চমৎকার, তৃপ্তিময়, খুবই মজার খাবার। এ অসাধারণ খাবার না খেলে বুঝতে পারবেন না তার মজাটা। সব ভেঙ্গে বলব না, তার আকর্ষণটা সবার কাছে থেকে যাক।

এভাবেই আমার মজার দিনগুলি কাটছিল। এরপর আমার স্বপ্নময় দেশ থেকে আমার বিদায়ের পালা। চীন ভ্রমণের শেষ দিন ভোর রাতে মুক্তা আমাকে বেইজিং বিমানবন্দরে পৌঁছে দেন। See-off শেষে মুক্তা তার গন্তব্যে এবং আমি ইমিগ্রেশনে চলে যায়। চীন ভ্রমণের মাত্র কয়দিনে মুক্তা যেন আমার খুব কাছের বন্ধু হয়ে গিয়েছেল। একবারেও মনে হয়নি সে একজন চৈনিক আর আমি বাঙালি! দুজনের দেশ যোজন যোজন মাইল দূরে হলেও কখনো সেটা দূরের মনে হয়নি। আমি বিমানে বসে বসে ভাবছিলাম সবার কথা। চীন দেশ এবং সে দেশের মানুষের সাথে আমার যে গভীর আত্নার সম্পর্ক ও মধুর ভালোবাসা তৈরী হয়েছে তা কখনো ভুলার নয়। সবার কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে বিমানটি সুদূর চীন দেশ ছেড়ে যেতে আকাশে উড়াল দিয়েছে বুঝতেই পারিনি। আর এভাবে চীন দেশের মমতা আর মানুষের ভালোবাসা নিয়ে ফিরে আসি নিজ মাতৃভূমি বাংলাদেশে।

তাছলিমা আক্তার লিমা

ভাইস চেয়ারম্যান

সাউথ এশিয়া রেডিও ক্লাব (সার্ক)

বাড়ী- ৩৩৬, সেকশন- ৭, রোড- ২,

মিরপুর, ঢাকা- ১২১৬, বাংলাদেশ।

© China Radio International.CRI. All Rights Reserved.
16A Shijingshan Road, Beijing, China. 100040