Web bengali.cri.cn   
তিং ছিয়াং: নিজ শরীরের স্টেম সেল দিয়ে জীবন বাঁচালেন অপরিচিত একজনের
  2017-09-13 16:58:25  cri

 


চীনের হুপেই প্রদেশের চিংচৌ'র নাগরিক তিং ছিয়াং। ৭ সেপ্টেম্বর সকালে তিনি জীবনে প্রথম নিজ শরীর থেকে হেম্যাটোপোইটিক স্টেম সেলস্‌ (Hematopoietic stem cells, HSCs) দান করেন। এই স্টেম সেল গ্রহণ করা হয় হু নান প্রদেশের ছাং শা শহরের সেন্ট্রাল সাউথ ইউনিভার্সিটি সিয়াং ইয়া হাসপাতালে। একই দিন বিকেলে এই স্টেম সেলগুলো পাঠানো হয় চিয়াং সু প্রদেশে। সেখানে এই সেলগুলো প্রবেশ করানো হয় ব্লাড ক্যান্সারে বা লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত রোগীর শরীরে। এই রোগীকে তিং ছিয়াং চেনেন না।

তিং ছিয়াং বলেন, "আমি জানি না আমার স্টেম সেলগুলো কার শরীরে প্রবেশ করানো হবে। হয়তো সে একজন কিশোর, ঠিক আমার ছেলের বয়সী। তিনি হতে পারেন একজন মা বা আমার মতো একজন পুরুষ, যে পরিবারের কর্তা। তবে আমি ঠিক জানি যে, আমার রক্তের এই সেলগুলো একজন মানুষের জীবন বাঁচাবে। আমি কায়মনোবাক্যে তার আরোগ্য কামনা করি।"

তিং ছিয়াং চীনের বিখ্যাত কোম্পানি চিন তুং বা জেডি ডটকমের একজন ডেলিভারি ম্যান। তার কাজ মানুষের দুয়ারে দুয়ারে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সামগ্রী ডেলিভারি দেওয়া। কিন্তু এবার তার নিজের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ স্টেম সেলের ডেলিভারি হচ্ছে অন্যত্র। তিনটি প্রদেশ অতিক্রম করে এই সেল যাচ্ছে রোগীর কাছে। তিং ছিয়াংয়ের কাছে এই ডেলিভারি তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডেলিভারি, যদিও কাজটি তিনি নিজে করছেন না।

ডোনেশনের আগের দিন, ৬ সেপ্টেম্বর বিকেল। হোটেলে তিং ছিয়াংয়ের সঙ্গে দেখা হয় এ সাংবাদিকের। তিং জানান, ৩ দিন আগেই তিনি এসে পৌঁছেছেন ছাং শা শহরে এবং স্টেম সেল ডোনেশনের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। এরই মধ্যে তিনি সামান্য ঠান্ডায় আক্রান্ত হলেন। ওষুধ খাওয়ার চিন্তা মাথায় এলো। কিন্তু তিনি ভাবলেন, ওষুধ খেলে যদি পরের দিন স্টেম সেল দেওয়া না যায়! ডাক্তার অবশ্য তাকে আশ্বস্ত করলেন। ওষুধ খেলে সমস্যা নেই। তিং আশ্বস্ত হলেন, ওষুধ খেলেন। তার ভাষায়, 'যদি আমার নিজের শরীর ভালো না-থাকে, তবে আমি কীভাবে অন্যের জীবন বাঁচাতে পারি?'

তিং ছিয়াংয়ের জীবনে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা, এবং বলা বাহুল্য, কাজটা তার জন্য সহজ ছিল না। তিনি গত ১৪ বছর ধরে বিনামূল্যে রক্তদান করে আসছেন। এই দানের প্রক্রিয়াতেই তার নাম স্টেম সেল ডাটাবেসে অন্তর্ভুক্ত হয়।

চলতি বছরের জুনে একদিন তিনি একটা ফোনকল পেলেন। তাকে জানানো হলো, একজন লিউকেমিয়া আক্রান্ত রোগীকে বাঁচানো সম্ভব যদি তিনি তার শরীর থেকে স্টেম সেল দান করেন। ইন্টারনেটে স্টেম সেল দান করা নিয়ে তিনি খানিকটা লেখাপড়া করেন এবং তার পর স্টেম সেল দান করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

হুপেই, হুনান এবং অবশেষে চিয়াং সু—তিং ছিয়াং-এর স্টেম সেল তিনটি প্রদেশ অতিক্রম করে। প্রথমে কথা ছিল রোগীর শরীরে স্টেম সেল পুশ করা হবে উহান শহরে। কিন্তু স্থানীয় চিকিত্সকরা শাংহাইকেই এ কাজের জন্য সবচেয়ে ভালো বলে রায় দিলেন। পরে অগাষ্টে আবার স্থান পরিবর্তন। এবার সিদ্ধান্ত হয় ছাং শা শহরে রোগীর শরীরে তিং ছিয়াংয়ের স্টেম সেল প্রবেশ করানো হবে। তিং ছিয়াং হুপেই প্রদেশের চিংচৌ শহরের নাগরিক। এর আগে এ শহরে মাত্র ১২ বার স্টেম সেল দানের ঘটনা ঘটেছে।

৭ সেপ্টেম্বর ভোর ৬টায় প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু হয়। পরে ৮টায় শুরু হয় তিং ছিয়াংয়ের শরীর থেকে স্টেম সেল সংগ্রহের কাজ। এ জন্য তিন ছিয়াংকে বিছানায় শুয়ে থাকতে হয় টানা ৫ ঘন্টা। দুপুর ২টা ২০ মিনিটে, চিয়াং সু প্রদেশের একটি হাসপাতালের জনৈক কর্মী দানকৃত স্টেম সেলের বাক্স নিয়ে রওয়ানা হন চিয়াং সু অভিমুখে।

চীনা হেম্যাটোপোইটিক স্টেম সেল্স দাতা ডেটাবেসের হুপেই শাখার কর্মী ছেন হুই। তিনি তিং ছিয়াং ও তার স্ত্রীর সঙ্গে চিংচৌ থেকে এসেছেন ছাং শাতে। তিনি জানালেন, স্টেম সেল দান করাটা হচ্ছে প্রথম পদক্ষেপ। তিং ছিয়াং-এর স্টেম সেলগুলো রোগীর শরীরে নতুন রক্ত সৃষ্টি করতে পারবে কি না, সেটি একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

তিং ছিয়াংয়ের স্ত্রী চাও লি হুয়া। তিনি জানান, তার স্বামীর বয়স ৪২। স্বামীর বাবা-মা স্টেম সেল দানের সিদ্ধান্ত সমর্থন করেননি। পরিবারের অন্য সদস্যরাও বার বার তিং ছিয়াংকে ফোন করে এ কাজে অনুত্সাহিত করার চেষ্টা করেছেন। তবে তিং ছিয়াং তার স্ত্রীকে বলেন, "আমার স্টেম সেল একজন মানুষের প্রাণ বাঁচাতে পারে এবং এ তথ্যটা আমি জানি। এখন আমি এটা উপেক্ষা করতে পারি না।" তিনি অবশেষে স্ত্রীসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছে তার সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা প্রমাণে সক্ষম হন এবং ইন্টারনেটে প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্য নিয়েও তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন।

চাও লি হুয়া আশাবাদী ও সাহসী মানুষ। তার স্বামী যখন বিছানায় শুয়ে স্টেম সেল দান করছিলেন, তখন তিনি তার পাশেই বসে ছিলেন এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে ভিডিও চ্যাট করেন। উইচ্যাটে তিনি স্বামীর শারীরিক অবস্থাও বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করেন। চাও লি হুয়া স্বামীকে বলেন, "দেখ, অনেক মানুষ উইচ্যাটে তোমাকে উত্সাহ দিচ্ছেন।" শুনে তিং ছিয়াংয়ের চোখে ফুটে ওঠে গর্বিত ভাব।

ছাং শা শহরে আসার জন্য তিং ছিয়াং কোম্পানির কাছ থেকে পেয়েছেন ১৫ দিনের ছুটি এবং কোম্পানি তাকে ২ হাজার ইউয়ান বিশেষ ভাতাও দিয়েছে।

চাও লি হুয়া বলেন, তার স্বামীর এই সিদ্ধান্ত কোনো আকস্মিক ব্যাপার ছিল না। তিনি বরাবরই একজন ভালো মানুষ। অন্যের কল্যাণে কাজ করতে আগ্রহী একজন সাহসী মানুষ। চাও লি হুয়া দু'একটি উদাহরণও দিলেন। যেমন, প্রয়োজন হলেই তিং ছিয়াংয়ের বন্ধুরা তাকে ফোন করে। যতো রাতেই হোক না কেন, সে ফোন পেয়ে তিং ছিয়াং ছুটে যান বন্ধুদের সাহায্য করতে। ব্যাপারটা চাও লি হুয়াকে অবাকও করতো। এসব করে কী লাভ? তার মনে প্রশ্ন জাগতো। কিন্তু এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর তিনি পাননি। তিনি শুধু জানেন, তার স্বামী একজন ভালো মনের মানুষ।

তাদের ছেলে এখন মাধ্যমিক স্কুলের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। সে সবসময় তার বাবাকে বলে, "বাবা আমার কাছে আপনি মহান একজন মানুষ, আপনি আমার গর্ব।" ছাং শা শহরে যাওয়ার আগে ছেলে বাবাকে বার বার উত্সাহ দিয়েছে এবং ছেলের কথা শুনে তিং ছিয়াং খুব খুশি হয়েছেন। বাবার প্রভাবে ছেলেও মানুষকে সাহায্য করতে পছন্দ করে। চাও লি হুয়া বলেন, বাবা ছেলের জন্য ভাল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

তিং ছিয়াংয়ের কোম্পানির ছাং শা শাখার কর্মীরা তার কথা শুনে হাসপাতালে তাকে দেখতে আসেন। তারা বলেন, "অপরিচিত একজন মানুষকে সাহায্য করতে তিং ছিয়াং চিংচৌ শহর থেকে এসেছেন ছাং শাতে। তার এ কাজ সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আমরা সবাই তাকে খুব সম্মান করি এবং শ্রদ্ধা করি।" (শিশির/আলিম/সুবর্ণা)

© China Radio International.CRI. All Rights Reserved.
16A Shijingshan Road, Beijing, China. 100040