Web bengali.cri.cn   
খাবার সরবরাহকারী ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়
  2017-08-23 10:51:39  cri


চলতি বছরের মার্চ মাসে, চীনের ইন্টারনেটে ১৮ বছর বয়সী একটি ছেলে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সে সি ছুয়ান বিদেশি ভাষা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে একটি রেস্টুরেন্টে খাবার ডেলিভারির কাজ করতো। তার নাম মাও চাও মু। খাবার সরবরাহের সময় সে একটি বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করতো, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে। সে ইংরেজিতে একটি এসএমএস পাঠাতো। তো, সে কীভাবে ইংরেজি শিখলো? নিজে নিজে। এক্ষেত্রে সে বিভিন্ন জনের কাছে বিভিন্ন উপায়ে সাহায্য নিয়েছে এবং পেয়েছে। তার লক্ষ্য ছিল: সি ছুয়ান বিদেশি ভাষা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া।

তো, সম্প্রতি সেই ছেলেটির স্বপ্ন পূরণ হয়েছে; সে সি ছুয়ান বিদেশি ভাষা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়েছে। এ খবরটি ইন্টারনেটে রীতিমতো ভাইরাল হয়ে যায়। মাও চাও মু বলছে: "আমি সি ছুয়ান বিদেশি ভাষা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরেছি। তবে, এবার খাবার সরবরাহকারী হিসেবে নয়, ছাত্র হিসেবে।"

১৪ অগাষ্ট, মা চাও মু নিবন্ধিত ছাত্র হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে। এর আগে সে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অসংখ্যবার এসেছে। কিন্তু তার এবারের আগমন ভিন্ন তাত্পর্য বহন করে। সে এখন রীতিমতো স্টার। তার গল্প ইন্টারনেটে জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পর তাকে প্রতিদিন গড়ে অন্তত দুটি ইন্টারভিউ দিতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরাও তার সঙ্গে কথা বলতে, গল্প করতে আগ্রহী। মাও চাও মু বলে, ছোট্ট একটি কাজ তাকে এমন বিখ্যাত বানিয়ে দিবে, তা সে কখনও কল্পনাও করতে পারেনি।

বিখ্যাত হলেও, মাও চাও মু প্রতিদিন আগের মতোই ইংরেজি শব্দ মুখস্থ করে, ইংরেজি শেষে। এক্ষেত্রে তার কোনো পরিবর্তন হয়নি।

ছেন সি ইউয়ু, সি ছুয়ান বিদেশি ভাষা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের একজন নতুন ছাত্র। ছেন সি ইউয়ু জানায়, সে আগে বহুবার মাও চাও মু'র রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার অর্ডার করিয়ে এনেছে। যতবার খাবার অর্ডার করেছে, ততবারই কর্তৃপক্ষকে বলেছে যেন খাবার মাও চাও মু ডেলিভারি দেয়। সে বলে, "যার স্বপ্ন আছে এবং যে স্বপ্ন পূরণের জন্য প্রচেষ্টা চালায়, সে মহান। আমি মাও চাও মু'কে সম্মান করি। আমি তাকে সবসময় উত্সাহ দিয়ে এসেছি।"

মাও চাও মুর বাবা-মাও তাকে বরাবর উত্সাহ দিয়ে গেছেন।

মাও চাও মু জানায়, মাধ্যমিক স্কুল থেকেই তার ইংরেজি ও চীনা ভাষা মোটামুটি ভাল ছিল। কিন্তু সে পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নসহ অন্যান্য বিষয়ে ভালো ছিল না। মাধ্যমিক স্কুলে সে একটি মেয়েকে পছন্দ করতো। মেয়েটি ইংরেজিতে ভালো। তাই তার মনেও ইংরেজি শেখার আগ্রহ সৃষ্টি হয়।

হাইস্কুলে এক বছর লেখাপড়ার পর মাও চাও মু স্কুল ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তখন তার ইংরেজি শিক্ষক তাকে বলেন, 'তুমি নিজে নিজে ইংরেজি শিখে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হতে পারো। এমন সুযোগ আছে।"

শিক্ষকের কথা শুনে মাও চাও মু সি ছুয়ান বিদেশি ভাষা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র হওয়ার স্বপ্ন দেখা শুরু করে।

পরে মাও চাও মু নানা জায়গায় কাজ করেছে। অবশেষে সে সি ছুয়ান বিদেশি ভাষা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি একটি রেস্টুরেন্টে কাজ নেয়।

নিজের প্রচেষ্টার মাধ্যমে স্বপ্নপূরণ করা চমত্কার একটি ব্যাপার। তবে মাও চাও মুর গ্রামের মানুষের ভাষ্য, টাকা কামাই করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তারা মাও চাও মুর মাকে পরামর্শ দিয়েছে এই বলে যে, ছেলেকে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে কাজ করতে বল।

কিন্তু মাও চাও মুর বাবা-মা তাকে সমর্থন করেন। তারা মনে করেন, সব মানুষের উচিত নিজের স্বপ্নকে পূরণ করার চেষ্টা করা। অপূর্ণ স্বপ্ন পরবর্তী জীবনে তাকে কষ্ট দিবে। তারা বলেন, "আমরা বেশি লেখাপাড়া করতে পারিনি। আশা করি আমাদের ছেলে নিজের ইচ্ছামতো জীবনযাপন করতে পারবে।"

মাও চাও মু'র দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ছিল সে সি ছুয়ান বিদেশি ভাষা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হবে। চীনে প্রতিবছরের জুলাইয়ের শেষ দিকে স্ব-শিক্ষিত ভর্তিচ্ছুদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি-পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। তাই জুলাই মাসের শুরুতে মাও চাও মু কাজ ছেড়ে দিয়ে গ্রামে ফিরে আসে এবং পরীক্ষা কাগজপত্র তৈরি করে। সে ভর্তি-পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়।

জুলাই থেকে অগাষ্ট পর্যন্ত মাও চাও মু প্রতিদিন পোষ্ট অফিসে গিয়ে নিজের মেইল চেক করতে থাকে। পোষ্ট অফিসের কর্মী শুধু হাঁটার শব্দ শুনেই বুঝতে পারেন যে মাও চাও মু আসছে! অবশেষে ১০ অগাষ্ট মাও চাও মু তার ভর্তির আমন্ত্রণপত্র হাতে পায়। সে ও তার পরিবার আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে।

মার্চ মাসে মাও চাও মু'র গল্প ইন্টারনেটে জনপ্রিয় হয়ে উঠার পর, শাংহাইয়ের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেভিন নামক একজন শিক্ষক মাও চাও মু'কে একটি পোষ্টকার্ড পাঠান। তিনি জানান, মাও চাও মুকে ইংরেজি শিখতে সাহায্য করতে আগ্রহী তিনি। তখন থেকে প্রতিদিন কেভিন কিউ কিউ'তে মাওকে ইংরেজি শেখাতে শুরু করেন। মাও চাও মু কেভিনকে তার পরিচয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে কোনো উত্তর পায়নি। কেভিন তার পরিচয় গোপন রাখেন। মাও চাও মু জানায়, ইংরেজি শেখায় কেভিন তাকে অনেক সাহায্য করেছে। শুধু নিজের প্রচেষ্টায় নয়, বরং ইংরেজি শিখতে তাকে অন্যের সাহায্যও নিতে হয়েছে। বহু মানুষ তাকে নানানভাবে উত্সাহিতও করেছেন।

মাও চাও মু'র এখন দুটি নতুন স্বপ্ন আছে। একটি হল চীনের কেন্দ্রীয় টেলিভিশন স্টেশনের ইংরেজি টক শো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা এবং আরেকটি হল বাবা-মাকে নিয়ে ভ্রমণ করা। মাও চাও মু'র একটি ছোট বোন আছে; মা'র শরীরও ভাল নয়। তবে তার মা নিজের শেষ সঞ্চয় তার ছেলেকে লেখাপড়ার জন্য দিয়েছেন। মাও চাও মু বলে, "আমি বাবা-মার কাছে সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ। তারা কখনও গ্রামের বাইরে যাওয়ার সুযোগ পাননি। আমি যত দ্রুত সম্ভব পয়সাকড়ি রোজগার করব এবং বাবা-মাকে নিয়ে হাই নান দ্বীপের শানইয়া শহরে ভ্রমণ করতে যাবো।" (শিশির/আলিম/সুবর্ণা)

© China Radio International.CRI. All Rights Reserved.
16A Shijingshan Road, Beijing, China. 100040