Web bengali.cri.cn   
সাই হান পা জাতীয় বনের  অগ্নিনির্বাপক-কর্মী
  2017-08-16 12:46:01  cri

আধুনিক অগ্নিনির্বাপক-ব্যবস্থা অনেক উন্নত। এ ক্ষেত্রে আজকাল ব্যবহৃত হচ্ছে উচ্চ প্রযুক্তি। কোথাও আগুন লাগলে মুহূর্তের মধ্যে তা জানা সম্ভব হচ্ছে। আগুন চিহ্নিত করতে ব্যবহৃত হচ্ছে বিশেষ রাডার ও ভিডিও ক্যামেরা। তবে, এ কাজে মানুষের সরাসরি ত্বত্তাবধান এখনও জরুরি। বিশেষ করে বনের ক্ষেত্রে। দাবানল ঠেকাতে বা নিয়ন্ত্রণে আনতে যন্ত্রের পাশাপাশি মানুষের ওপর নির্ভরশীলতাও গুরুত্বপূর্ণ। বনের বিভিন্ন টাওয়ারে যারা কর্তব্যপালন করেন, তাদের বলা হয় 'বনের চোখ'। বনের ভিতরে বছরের পর বছর ধরে তারা বনের পাহারাদার হিসেবে কাজ করে আসছেন।

লিউ জুনের বয়স ৪৬ বছর। তিনি সাই হান পা জাতীয় বনের একজন অগ্নিনির্বাপক-কর্মী। তিনি লম্বা নন, এবং তিনি কৃষ্ণকায়। তিনি আস্তে আস্তে কথা বলেন। বনের ব্যাপারে তার জ্ঞান অগাধ। বনের যে-কোনো জায়গা তিনি অনায়াসে চিনতে পারেন, বলে দিতে পারে সে অংশের নাম। অথচ একজন সাধারণ মানুষের চোখে বনের সব জায়গা প্রায় একই রকম মনে হবে। লিউ জুন বলতে পারেন বনের বিভিন্ন স্থানের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কথা।

সাই হান পা জাতীয় বনে সবচেয়ে কঠিন ও কষ্টকর একটি কাজ হচ্ছে আগুন পর্যবেক্ষণকাজ। এ কাজ গুরুত্বপূর্ণ, তবে করতে হয় সাধারণ জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। টাওয়ারগুলো নির্জন জায়গায় ও একটা থেকে আরেকটা অনেক দূরে অবস্থিত। ফলে, টাওয়ারে কর্মীদের দীর্ঘ সময় জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়। সাই হান পা বনে রয়েছে ৯টি এমন টাওয়ার। এ সব টাওয়ারের ৮টিতে অবশ্য ৮টি দম্পতি কাজ করেন। এতে তাদের নিঃসঙ্গতাবোধ কম হয়। তবে, এধরনের কাজে স্বামী-স্ত্রীর একযোগে নিয়োজিত হবার উদাহরণ খুব বেশি নেই।

২০০৬ সালে লিউ জুন ও তার স্ত্রী বনের সবচেয়ে উঁচু একটি টাওয়ারে কাজ শুরু করেন। এর আগে তারা বনের ভিন্ন বিভাগে কাজ করেছেন। লিউ জুনের জন্য অবশ্য টাওয়ারটি অপরিচিত নয়। কারণ, তার পিতা-মাতাও এ টাওয়ারে কাজ করেছেন। তিনি বলেন, "আমার মা আমাকে জানিয়েছেন, আমার জন্মের ৫ বছর আগে থেকেই তারা এ টাওয়ারে কাজ শুরু করেন। তারা ছিলেন প্রথম প্রজন্মের পর্যবেক্ষণ-কর্মী। তখন টাওয়ারের চারপাশে কোনো বড় রাস্তা ছিল না; ছিল না বড় বড় বৃক্ষও। তখন প্রচুর বাতাস ছিল, ছিল বালিঝড়। আমার জন্মও নাকি এ টাওয়ারেই।"

শুরুর দিকে লিউ জুন এখানকার পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারছিলেন না। কখনও কখনও তিনি দাঁড়িয়ে চিত্কার করেন। নিঃসঙ্গতা কাটানোর এটা একটা উপায় বটে।

প্রায় ১১ বছর হয়ে গেল লিউ জুন দম্পতি এখানে কাজ করছেন। বছরের ৬ মাসই তারা দিন-রাত ২৪ ঘন্টা পর্যবেক্ষণের কাজ করেন। দিনের বেলা প্রতি ১৫ মিনিট পর পর তাদের রিপোর্ট লিখতে হয়; রাতের বেলা ১ ঘন্টা পর পর। তাদের এ কাজ একঘেয়েমিপূর্ণ। স্ত্রী ছি সু ইয়ান বলেন, "রাতের ডিউটি করেন আমার স্বামী। তিনি নিয়মিত দেরি করে ঘুমান। ভোরে তিনি ঘুমাতে গেলে আমি দায়িত্ব নিই। পরে তিনি ঘুম থেকে উঠে রান্নাবান্না করেন। তারপর তিনি আবার ডিউটিতে আসেন এবং আমি সংসারের অন্যান্য কাজ করি। এভাবে আমরা ২৪ ঘন্টা সময় কাটিয়ে দিই।"

দীর্ঘসময় বনে কাটিয়ে যখন তারা ছুটিতে নিজেদের বাড়িতে ফেরেন, তখন অদ্ভুত অনুভূতি তাদের মধ্যে কাজ করে। লিউ জুন বলেন, "এখন বন আমাদের বাড়ির মতো। কারণ, আসল বাড়িতে আমাদের থাকা হয় খুবই কম। আমার জেলায় মানুষ ও যানবাহন বেশি। আমার এখন আর এতো হৈ চৈ ভালো লাগে না। দু'দিন থাকলেই হাঁপিয়ে উঠি; ফিরতে চাই বনে।"

তার স্ত্রীও একই কথা বললেন। বনই এখন তাদের বাড়ি। কিছুদিন বনের বাইরে থাকলেই তার বার বার বনের কথা মনে পড়ে।

সর্বশেষ লিউ জুন দম্পতি বাড়িতে ফিরেছিলেন গত জুনে, ছেলের বিয়ের কারণে। বনের অনেক কর্মীর মতো তারাও নিজেদের সন্তানের সঙ্গে থাকতে পারেন না। প্রাথমিক স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তাদের ছেলে লিউ চি কাং বাবা-মা থেকে আলাদা। ছোট বেলায় লিউ চিং কাং তার পিতা-মাতার অসহায়ত্বের কথা বুঝতে পারতো না। সে তার পিতা-মাতকে ঘৃণা করতো। সে বনকেও ঘৃণা করতো। কারণ, বন তার পিতা-মাতাকে তার কাছ থেক ছিনিয়ে নিয়েছে।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেককিছু পাল্টেছে; পাল্টেছে লিউ চি কাংয়ের ধারণাও। তিনি এখন পিতা-মাতার সমস্যাটা বোঝেন। তিনি বলেন,

"যখন আমার বাবা-মা এ বনে এসে কাজ শুরু করেন তখন টাওয়ারের কাছে এ গাছগুলো ছোট ছিল। আমি ছোট হলেও, গাছের চারাগুলো আমার পায়ের সমানই ছিল। তারপর প্রতিবছরের গ্রীষ্মের ছুটিতে যখন আসতাম, দেখতাম গাছগুলো বড় হয়েছে আগের চেয়ে। একদিন সেগুলো আমাকেও ছাড়িয়ে গেল। আমার মনে হয়, আমি যেন গাছগুলোর সঙ্গেই বড় হয়েছি।"

কঠোর পরিবেশে কঠিন কাজ করতে হয় বলে লিউ জুন ও তার স্ত্রীকে বয়সের চেয়ে বেশি বয়সী লাগে। তবে, দু'জনই তাদের কাজ ও জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট। লিউ জুন বলেন, "অবসর নেওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা এখানে থাকবো এবং বনকে সংরক্ষণ করে যাবো। আমরা আগামীর বনকর্মীদের জন্য একটি অক্ষত বন রেখে যেতে চাই।"

তাদের ছেলে লিউ চি কাং জানেন বাবা-মার প্রত্যাশা। তিনিও শাংহাইতে তার কাজ ছেড়ে এখানে এসে একজন অস্থায়ী অগ্নিনির্বাপক কর্মী হিসেবে কাজ করছেন। এখন তিনি বাবার কাছ থেকে কাজ শিখছেন এবং আশা করেন, ভবিষ্যতে তিনি বাবার স্থলাভিষিক্ত হবেন।

শুরুতে লিউ জুন তার ছেলের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেননি। তিনি চিন্তা করেন, তার ছেলের বয়স কম; তার পক্ষে এখানে কাজ করা সম্ভব নয়। তবে লিউ চি কাং বাবার কাছে তার দৃঢ় ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং ছেলের স্ত্রীও তার এ সিদ্ধান্ত সমর্থন করেন।

বর্তমানে ছেলে বাবার মতো অতোটা ভালো কাজ করতে পারেন না, কিন্তু তিনি ধীরে ধীরে শিখছেন। লিউ জুন আশা করছেন, তার ছেলে এ বনকে রক্ষা করতে পারবে।

তিনি বলেন, বাবা থেকে ছেলে পর্যন্ত তার পরিবারের ৩ প্রজন্মের মানুষ এ বনের রক্ষী। তিনি আশা করেন, ছেলে তার দাদা ও বাবার মতোই এ কাজ ভালভাবে সম্পন্ন করতে পারবে। (শিশির/আলিম/সুবর্ণা)

© China Radio International.CRI. All Rights Reserved.
16A Shijingshan Road, Beijing, China. 100040