Web bengali.cri.cn   
দেশ প্রেমিক চীনা বিজ্ঞানী হুয়াং দা নিয়েনের গল্প
  2017-07-13 18:18:45  cri


'চীন, আমি তোমাকে ভালোবাসি' শিরোনামের গান বিশ্ব বিখ্যাত কৌশলগত বিজ্ঞানী হুয়াং দা নিয়েনের সবচেয়ে পছন্দের একটি গান।

বিমান-চালনা সংক্রান্ত ভূ-পদার্থবিদ্যা ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষ পর্যায়ের বিজ্ঞানী হিসেবে হুয়াং দা নিয়েন স্বদেশের প্রয়োজন দেখে নিজের কাজের শীর্ষ সময়ে বিদেশে প্রচুর প্রাচুর্যের নিশ্চিত প্রাপ্তি ত্যাগ করে দেশে ফিরে আসেন। চীনে ফিরে এসে তিনি ৪০০ জনের বেশি বিজ্ঞানীর নেতৃত্ব দিয়ে অনেক 'চীনের প্রথম' সৃষ্টি করেছেন। চীনের 'বিমান-চালনা, ভূগর্ভে অনুসন্ধান আর সাগরে ডাইভিং' ক্ষেত্রে অনেক প্রযুক্তিগত শূন্যতা পূরণ করেছেন। ২০১৭ সালের ৮ জানুয়ারি মাত্র ৫৮ বছর বয়সে হুয়াং দা নিয়েন অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বন্ধু, সহকর্মী, ছাত্র, ব্যক্তিগত সচিব আর গাড়ি চালক তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে চোখের পানি ফেলেছেন। সবাই তাঁকে অনেক শ্রদ্ধা করেন। চীনের শীর্ষ নেতারা, অসংখ্য পাঠক, শ্রোতা ও ইন্টারনেট-ব্যবহারকারী হুয়াং দা নিয়েনের জীবনী জেনে মুগ্ধ হয়েছেন।

হুয়াং দা নিয়েন

হুয়াং দা নিয়েন উত্তর-পূর্ব চীনের ছাংছুন ভূতাত্ত্বিক কলেজ থেকে স্নাতক কোর্স সম্পন্ন করে বৃটেনে গিয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি বৃটেনের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আরকেক্স ভূ-পদার্থবিদ্যা কোম্পানির গবেষণা বিভাগের পরিচালক হন। অনেকে প্রশ্ন করেছিলেন, 'তিনি কেন বিদেশের সমৃদ্ধ সুযোগ সুবিধা ছেড়ে স্বদেশে ফিরে এলেন?'

চিলিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস –চ্যান্সেলার হান সিয়াও ফাং আর হুয়াং দা নিয়েনের ত্রিশাধিক বছরের বন্ধুত্ব। তিনি বলেন, "হুয়াং দা নিয়েন বলেছিলেন, 'আমি বিদেশে যাওয়ার সময় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আমি ফিরে আসবোই।' তিনি নিজের ছাত্র ছাত্রীদেরকেও বলেন, 'তোমাকে বিদেশে যেতে হবে, তবে একদিন অবশ্যই স্বদেশে ফিরে আসবে।'

আসলে তাঁর এমন চিন্তাভাবনার উত্স আছে। তা হলো দেশপ্রেমের আবেগ। উত্তর-পূর্ব চীনের প্রতি, চিলিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি তাঁর ছিল গভীর আবেগ। এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।"

২০০৯ সালে হুয়াং দা নিয়েন চীন ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে কাজে যোগ দেন। চিলিন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর অফিসের একটি ব্ল্যাকবোর্ডে পুরো বছরের কাজের পরিকল্পনা লিখে রাখতেন তিনি। ছাংছুন, বেইজিং, নাননিং, চেংতু, লন্ডন এক একটি জায়গার নাম দিয়ে হুয়াং দা নিয়েনের ব্যস্ততার পদচিহ্ন প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর অফিসের বাতি প্রায়শই রাত দুই বা তিনটা পর্যন্ত জ্বলতে থাকতো।

তাঁর সচিব ওয়াং ইয়ু হান বলেন, "তিনি বছরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সময় অফিসের কাজে বিভিন্ন অঞ্চলে যেতেন। তিনি অনেক সময় আমাকে বলতেন, 'চূড়ান্ত ফ্লাইট বুক করো।' তিনি বিমান বন্দরে যাওয়ার গাড়িতে উঠলে সঙ্গে সঙ্গে ফোন করতেন। কারণ তিনি জানতেন, বিমানে উঠলে আরো ফোন করতে পারবেননা। তাঁর বাইরে অবস্থানের কয়েক দিনে আমাদের কাজ সব পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিতেন।"

দিনরাত কাজ করতে দেখে আশেপাশের লোকেরা হুয়াং দা নিয়েনকে 'পাগল বৈজ্ঞানিক' মনে করতো। এ খেতাব প্রসঙ্গে হুয়াং দা নিয়েন চীনে ফিরে আসার পর তাঁর প্রথম ডক্টরেট ডিগ্রি ছাত্র মা কুও ছিং বলেন,"আগে আমিও হুয়াং দা নিয়েনের কাজের মনোভাব বুঝতে পারতাম না। অনেকে বলতেন, তিনি পাগল। সত্যি তিনি সবসময় কাজে ব্যস্ত থাকতেন। তিনি আমাকে বলেছেন, 'তোমার অধিকাংশ সময় বিজ্ঞান গবেষণায় ব্যয় করা উচিত। কারণটা কী? তোমার নিজের উন্নতির জন্য নয়। দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নের জন্য। কেবল নিজের কথা চিন্তা করলে হবে না।"

হুয়াং দা নিয়েনের অফিস

হুয়াং দা নিয়েনের অন্যতম কেন্দ্রীয় কাজ ছিল দেশের খুব জরুরি প্রয়োজনীয় 'বিমান-চালনায় মধ্যাকর্ষণ শক্তির নির্ভুল পরিমাপ প্রযুক্তি' নিয়ে গবেষণা করা। বিশেষ করে 'বিমান-চালনায় 'গ্রেডিওমিটার' নিয়ে গবেষণা করেন তিনি। এ যন্ত্র প্রেক্ষিত চোখের মতো। তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের সময় এবং ডুবোজাহাজ প্রতিরোধ ও পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহার করা হয়।

হুয়াং দা নিয়েনের সহকারী, চিলিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃথিবী অন্বেষণ সংক্রান্ত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মাদাম ইয়ু পিং বলেন, "এ প্রযুক্তি হলো চীনের জরুরি প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি। এক দিকে জনসাধারণের জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত, অন্যদিকে দেশের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। বর্তমানে খুব কম দেশের এ প্রযুক্তি অধিকারে আছে। এ প্রযুক্তির অধিকারী দেশগুলো চীনের কাছে তা হস্তান্তরে সবসময় বাধা তৈরি করতো। দ্বাদশ পাঁচশালা পরিকল্পনার আগে চীনে এ প্রযুক্তির শূন্যতা ছিল। জনাব হুয়াং চীনে ফিরে আসার পর দশ বারোটি প্রতিষ্ঠান আর কয়েক'শ বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। আমরা পাঁচ বছর সময় ধরে সরঞ্জামের উপাত্ত অর্জনের নির্ভুলতা ও দক্ষতার দিকে বিশ্বের ২০ বছর ব্যবধান হ্রাস করেছি। তাত্ত্বিকভাবে বলা যায়, এ ক্ষেত্রে আমরা আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছেছি।"

হুয়াং দা নিয়েন ছাংছু ভূতাত্ত্বিক কলেজ থেকে স্নাতক অনুষ্ঠানের সময় স্মরণিকায় লিখেছিলেন, 'চীনের পুনরুত্থান করা হলো আমাদের দায়িত্ব।' এটাই তাঁর মনের কথা, এ কথা বিজ্ঞান গবেষণার পথে সবসময় হুয়াং দা নিয়েনকে উত্সাহ দিতো। তিনি কোন সময় অপচয় করতে চাইতেন না। তাঁর শারীরিক অবস্থা ভালো না হলেও তিনি কাজ চালিয়ে যেতেন।

চিলিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস ভবন

গাড়িচালক লিউ কুও ছিউ বলেন, "একবার আমি বাসায় তাঁকে আনতে গিয়েছি, তিনি বাড়ির দরজার সামনে হঠাত্ দুর্বল হয়ে পড়লেন। আমি তাড়াতাড়ি তাকে কোলে নিয়েছি। তিনি জেগে উঠার পর বললেন, সম্ভবত আমার বেশি ক্লান্তি হয়েছে। আমি বলি, 'স্যার, আপনি হাসপাতালে যান। কাজে যাওয়ার দরকার নেই।' তিনি বললেন, 'মোটেও না। আগামীকাল বেইজিংয়ে দু'টি খুব গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন আছে। আমাকে যেতেই হবে।"

বৈজ্ঞানিক গবেষণা কাজ জরুরি ভেবে হুয়াং দা নিয়েন সবসময় সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতেন। অতিরিক্ত কাজ করার জন্য তিনি একাধিকবার দুর্বল হয়ে পড়েন। বাধ্য হয়ে তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। স্বাস্থ্য পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায় তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন।

তবে হাসপাতালের শয্যায় থাকলেও তিনি কাজের প্রতি মনোযোগ দিতেন। চিলিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্টি কমিটির যুক্তফ্রন্ট বিভাগের উপপ্রধান মাদাম রেন বো বলেন, "অস্ত্রোপচার করার আগের দিন বিকেলে আমরা কয়েক জন ফল কিনে হাসপাতালে তাঁকে দেখতে গিয়েছি। কিন্তু তিনি হাসপাতালে ছিলেন না। অফিসে ফিরে গেছেন। সবাই তাকে বলেন, 'হাসপাতালে ফিরে যেতে হবে। অস্ত্রোপচারের আগে ভালো করে বিশ্রাম নিতে হবে।' কিন্তু তিনি বললেন, 'না, আমার হাতে অনেক কাজ বাকি রয়েছে। এ কাজগুলো শেষ না করলে আমার মনে শান্তি আসবে না।' সে দিন তিনি অনেক রাত পর্যন্ত অফিসে ছিলেন।"

এই বছরের ৮ জানুয়ারি ৫৮ বছর বয়সী হুয়াং দা নিয়েন চিরকালের জন্য চোখ বন্ধ করেন। তিনি আর অফিসে ফিরে আসতে পারেন নি। চিলিন বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হুয়াং দা নিয়েন বার বার 'চীন, আমি তোমাকে ভালোবাসি' গানটি গেয়েছিলেন। তিনি শুধু কন্ঠ দিয়ে গেয়েছেন তা নয়, বরং নিজের প্রাণ দিয়ে এ গানটি গেয়েছেন।

হুয়াং দান নিয়েন চলে গেছেন। তবে তাঁর অসম্পূর্ণ কাজ এখনো অব্যাহতভাবে চলছে। হুয়াং দানের সহকর্মীরা তাঁর নেতৃত্ব তত্ত্বের ভিত্তিতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন।

(ইয়ু/ মহসীন)

© China Radio International.CRI. All Rights Reserved.
16A Shijingshan Road, Beijing, China. 100040