Web bengali.cri.cn   
মানুষ্য-সৃষ্ট কারণেই বাংলাদেশে পাহাড়ধসের ট্রাজেডি
  2017-06-18 18:07:22  cri
 

১৩ জুন ভোরে বাংলাদেশ তিন পার্বত্য জেলা চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও বান্দরবানে ভয়াবহ পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। স্মরণকালের সবচেয়ে মারাত্মক এ সব পাহাড় ধসের ঘটনায় জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। সবশেষ হিসাব অনুযায়ী ১৩ জুন ও পরবর্তী কয়েকদিনে তিন পার্বত্য জেলাসহ দেশের আরো কয়েকটি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনায় নিহত হয়েছে ১৫৭ জন মানুষ। কোনো কোনো জায়গায় পাহাড়ধসে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে গোটা পরিবার। কোথাও কোথাও হয়তো বেঁচে আছেন পরিবারের একজন-দুজন সদস্য-মারা গেছেন বাঁকি সবাই।

পাহাড়ধসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাঙামাটি। এখানেই নিহত হয়েছে সবচেয়ে বেশি ১১৪ জন। এদের মধ্যে ৫ সেনাসদস্য মারা গেছেন উদ্ধার অভিযান চালাতে গিয়ে। চট্টগ্রামে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। বান্দরবানে মারা গেছেন ৬ জন। এছাড়া খাগড়াছড়ি, কক্সবাজারের টেকনাফ, মৌলভীবাজারেও পাহাড়ধসে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। প্রবল বৃষ্টি হলে যে কোন সময় বড় ধরনের পাহাড় ধসের আশঙ্কায় রয়েছে।

পাহাড়ধসে রাঙামাটিতে মানবিক বিপর্যয় দেখা দেয়। চট্টগ্রামের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় ত্রাণপাঠাতে সমস্যা হচ্ছে। কয়েক দিন বিদ্যুৎ সংযোগও বন্ধ ছিল। এখন খাদ্য ও জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে পার্বত্য এ জেলাটিতে। সরকারে তরফ থেকে দুর্গতদের উদ্ধার ও ত্রাণ বিতরণে সর্বোচ্চ উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা যথেষ্ট নয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

পাহাড়ধসের বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রায় প্রতিবছরই ছোটখাট পাহাড় ধসের ঘটনায় অল্পবিস্তর প্রাণহানির ঘটে থাকে। এর আগে পাহাড়ধসে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে ২০০৭ সালে। সেবার মারা যায় ১২৭ জন মানুষ। এরপর ২০০৮ সালে ১১ জন, ২০১১ সালে ১৭ জন, ২০১২ সালে ২৩ জন ও ২০১৩ সালে পাহাড়ধসে ৬ জনের প্রাণহানি ঘটে। ২০০৭ সালে ১২৭ জনের মৃত্যুর পর চট্টগ্রামের তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি পাহাড় ধসের ২৮টি কারণ নির্ণয় করে তা মোকাবেলায় ৩৬টি সুপারিশ করে। কিন্তু সেই সব সুপারিশ কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি। প্রশাসন পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটলে খানিকটা তৎপর হয়। উদ্ধার অভিযান চালায়, মাইকিং করে সতর্ক করে। এর মধ্যেই সীমিত থাকে তাদের কার্যক্রম। যার ফলে প্রতিবছরই পাহাড়ধসে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি অব্যাহত রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড়ধসের বৈজ্ঞানিক কারণ অনুসন্ধান করে তা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতেও এমন মানবিক বিপর্যয় পড়বে বাংলাদেশ। পাহাড়ধসের প্রধান দুটি কারণ হচ্ছে অবিবেচনাপ্রসূতভাবে বন উজাড় করা ও অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটা। গত ১২ বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামে এক চুতর্থাংশ বনভূমি উজাড় করা হয়েছে। ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট করে পাহাড় কেটে রাস্তা ও বসতি নির্মাণ এবং অন্যান্য স্থাপনা প্রতিষ্ঠা পাহাড় ধসের একটি বড় কারণ। আর জেনেশুনেই মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় বসতি নির্মাণ করছে। রাজনৈতিক কারণে অনেকসময় তাদের সরাতে পারে না প্রশাসন।

পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের কাছে যারা বসবাস করছে- জীবন রক্ষায় জোর করেও হলেও তাদের সরিয়ে নেওয়া হবে। এ বিষয়ে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা বরদাশত করা হবে না বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।

খাগড়াছড়ির পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আবু দাউদ বলেন, রাঙামাটির মতোই খাগড়াছড়িতেও নেই শহর উন্নয়নের কোনো মাস্টারপ্ল্যান। যত্রতত্র গড়ে উঠছে বসতি। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্তেও উন্নয়নের নামে পৌরসভাও যথেচ্ছভাবে পাহাড় কেটে চলেছে। এ সব বন্ধ না হলেও খাগড়াছড়িতেও রাঙামাটির মতো বড় বিপর্যয় ঘটতে পারে যে কোন সময়।

ভূতত্ত্ববিদ ড. হুমায়ূন আকতার বলেছেন, পাহাড়ধস এড়াতে হলে বনজসম্পদ ধংস আর পাহাড় কাটা বন্ধের কোনো বিকল্প নেই। আর দুর্ঘটনা ঘটলে উদ্ধারকাজের জন্য দক্ষতা অর্জন ও প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

ঢাকা থেকে মাহমুদ হাশিম।

© China Radio International.CRI. All Rights Reserved.
16A Shijingshan Road, Beijing, China. 100040