সুর ও বাণী: তাইওয়ানের বিখ্যাত কণ্ঠশিল্পী তেরেসা তেং
  2017-05-12 21:22:19  cri


প্রতিবছর চীনের সংগীতমহলে ৮ মে পালিত হয় ভাবগম্ভীর পরিবেশে। কারণ, ২২ বছর আগে ১৯৯৫ সালের এই দিনে চীনের তাইওয়ানের বিখ্যাত কণ্ঠশিল্পী তেং লি জুন থাইল্যান্ডের ছিয়েংমাইয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৪২ বছর।

১৯৯৬ সালে তাইওয়ানের গোল্ডেন মেলোডি অ্যাওয়ার্ডসের 'বিশেষ অবদান পুরস্কার' তেরেসা তেংকে দেওয়া হয়। ২০০১ সালে ৪২২৯৫ নম্বর বামন গ্রহের নামকরণ করা হয় 'তেরেসা তেং'। তেরেসা তেং হচ্ছে তেং লি জুনের ইংরেজি নাম। আজকের 'সুর ও বাণী' আসরে আপনাদের শোনাবো তেরেসা তেংয়ের কয়েকটি গান; পরিচয় করিয়ে দেবো তার কিংবদন্তীতুল্য জীবনের সাথে।

বন্ধুরা, প্রথমে শুনুন তেরেসা তেংয়ের গাওয়া 'দীর্ঘায়ু কামনা' গানটি। এ গানটি উত্তর সোং রাজবংশ আমলের বিখ্যাত সাহিত্যিক সু শিংয়ের কবিতার রূপান্তর। ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত তেরেসা তেংয়ের কবিতাভিত্তিক গানের অ্যালবামে এটি ছিল। এ অ্যালবামটি তার সংগীতজীবনের স্বর্ণযুগের প্রতিনিধিত্ব করে। অ্যালবামের ১২টি গানই সোং রাজবংশ আমলের বিখ্যাত সব কবিতা অবলম্বনে রচিত। কবিতাগুলো এমনিতেই কালোত্তীর্ণ। তেরেসা তেংয়ের মিষ্টি কণ্ঠে এগুলো পেয়েছে যেন নতুন জীবন। তেরেসা তেং গানটি গাওয়ার পর আরও অনেক শিল্পীও এ গানটি গেয়েছেন।

তেরেসা তেং ১৯৫৩ সালের ২৯ জানুয়ারি চীনের তাইওয়ানের ইয়ুন লিন জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৭ সালে তার প্রথম অ্যালবাম প্রকাশিত হয়। অন্যভাবে বললে, মাত্র ১৪ বছর বয়স থেকে তিনি সংগীতের জগতে প্রবেশ করেন। দু'বছর পর তিনি 'চিংচিং' নামক টিভি নাটকের থিম সং গেয়ে তাইওয়ানে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তখন তার বয়স মাত্র ১৬ বছর।

১৯৭৬ সালে তিনি হংকংয়ে প্রথমবার ব্যক্তিগত সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করেন। এরপর সারা বিশ্বের চীনাদের মধ্যে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। বহু বছর ধরে চীনের মূল ভূভাগ, তাইওয়ান, হংকং, জাপান, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াসহ নানা দেশে তিনি অদ্বিতীয় কণ্ঠশিল্পী ছিলেন। আজও সংগীতপ্রেমীদের কাছে 'মিষ্টি', 'ক্ষুদ্র নগরের গল্প', 'তোমার মতো স্নেহশীল' ইত্যাদি গানগুলোর আবেদন রয়ে গেছে। বর্তমান শিল্পীরাও বিভিন্ন সংগীতানুষ্ঠানে ও চলচ্চিত্রে তার গান ব্যবহার করেন। বন্ধুরা, শুনুন তেরেসা তেংয়ের গাওয়া 'মিষ্টি' গানটি।

২০০৭ সালে তিনি জাপানের মাসাও কোগা সংগীত জাদুঘরের 'জনপ্রিয় সঙ্গীত হল'-এ স্থান পান। ২০০৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার ৬০তম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে 'সবচেয়ে প্রভাবশালী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব' নির্বাচনে তেরেসা তেং ৮৫ লাখ ভোট পেয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ২০১০ সালে নারী দিবসের প্রাক্কালে চীনের বহু তথ্যমাধ্যম যৌথভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের সবচেয়ে প্রভাবশালী নারী হিসেবে তাকে নির্বাচিত করে। একই সালের ২২ এপ্রিল তাইওয়ানের কাও সিয়োংয়ে তেং লি জুন স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়। একই সালের ২ অগাস্ট যুক্তরাষ্ট্রের সিএনএন '৫০ বছরের সেরা ২০ সংগীতজ্ঞ'-এর যে তালিকা প্রকাশ করে তাতে তেরেসা তেং স্থান পান।

১৯৮৭ সালে তেরেসা তেং 'আমি কেবল তোমাকে পছন্দ করি' গানটি রেকর্ড করেন। এ গানটি জাপানের এনএইচকের নির্বাচিত বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর ১০০টি গানের তালিকায় ষোড়শ স্থান অধিকার করে। তেরেসা তেং ছিলেন এ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত একমাত্র বিদেশি কণ্ঠশিল্পী। এ গানটি রেকর্ডিংয়ের সময় তেরেসা তেং গুরুতর কিডনি রোগে আক্রান্ত ছিলেন। গান গাওয়ার সময় তার কোমরে ব্যথা হতো। তা সত্ত্বেও তিনি উচ্চ মানের এ গানটি গেয়েছেন।

তিনি গেয়েছেন: 'যদি তোমার সঙ্গে দেখা না হতো, আমি কোথায় থাকতাম? আমার জীবন কেমন হতো? অন্য কারুর সঙ্গে কি আমার মধুর প্রেমের সম্পর্ক সম্ভব ছিল? সময় বয়ে যায়, আমি কেবল তোমাকেই পছন্দ করি। জীবনে অন্তরঙ্গ বন্ধু পেলে, জীবন দিতেও দুঃখ লাগে না। আমার অনুরোধ, তুমি ত্যাগ করো না আমায়। যদি কোনো একদিন, তুমি চলে যাও, আমি নিজেকেই হারিয়ে ফেলবো।'

তেরেসা তেং এবং কুংফু মাস্টার জ্যাকি চ্যাং পরস্পরের প্রেমে পড়েছিলেন। কিন্তু এ দু'জনের স্বভাব ও চরিত্র একদম ভিন্ন বলে, সে প্রেমের শুভ পরিণতি ঘটেনি। তেরেসা তেংয়ের মৃত্যুর সাত বছর পর তার স্মরণে আয়োজিত এক সংগীতানুষ্ঠানে প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে জ্যাকি চ্যাং আবার তেরেসা তেংয়ের সঙ্গে 'আমি কেবল তোমাকে পছন্দ করি' গানটি গেয়েছিলেন। গান গাওয়ার সময় জ্যাকি চ্যাং বলেন, 'আগেই একসঙ্গে গানটি গাওয়া উচিত ছিল। এখন তিনি আর নেই। কেবল এ গান গেয়ে তাকে স্মরণ করা যায়।' বন্ধুরা, শুনুন এ দু'জনের কন্ঠে 'আমি কেবল তোমাকে পছন্দ করি' গানটি।

বহু বছর আগে এক প্রজন্মের লোক তেরেসা তেংয়ের গান শুনে গভীরভাবে মুগ্ধ হতেন। বহু বছর পর ওই প্রজন্মের লোক তার গান শুনতে শুনতে যুবক থেকে মধ্যবয়সী বা বয়োজ্যেষ্ঠ হয়েছেন। ব্যস্ততম রাস্তায় হাঁটার সময় হঠাত্ কোনো দোকান থেকে তেরেসা তেংয়ের কণ্ঠ ভেসে আসলে কেউ কেউ আজও থমকে দাঁড়ান। তাদের মনে পড়ে যৌবনকালের কথা। অনেকে মনে করেন, চীনের পপ সংগীতের জগতে তেরেসা তেংয়ের মতো দ্বিতীয় ব্যক্তি আর জন্মাবে না। এ জগতে অনেক ভালো শিল্পী আছেন। কিন্তু তাদের কেউ কি তেরেসা তেংয়ের মতো চীনের ম্যান্ডারিন, ক্যান্টোনিজ, তাইওয়ানের আঞ্চলিক ভাষা, জাপানি ও ইংরেজি ভাষায় শত শত গান গাইতে পারেন? না, পারেন না। তার গানগুলো দু'বছর বয়সী বাচ্চা থেকে এক'শ বছর বয়সী বৃদ্ধবৃদ্ধা সবাই পছন্দ করেন। বন্ধুরা, শুনুন তেরেসা তেংয়ের গান 'তোমার মতো স্নেহশীল'।

বিংশ শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে তেরেসা তেং তত্কালীন নবীন সুরকার ছাও জুন হোংকে থাং রাজবংশের মহাকবি লি পাইয়ের 'ছিং পিং তিয়াও' নামক কবিতার সুর করার অনুরোধ করেন। ছাও জুন হোং গানের সুর করেছিলেন। কিন্তু তেরেসা গানটির মাত্র দ্বিতীয় অংশ রেকর্ড করতে পেরেছেন। গানটি শেষ করার আগেই তার মৃত্যু ঘটে। ওই অসম্পূর্ণ গানের রেকর্ড বিশ বছর ধরে সংরক্ষিত ছিল। ২০১৫ সালের ৮ মে গায়িকা ওয়াং ফেই এ গানের প্রথম অংশ রেকর্ড করেন। দু'জনের কণ্ঠে সম্পূর্ণ গানটি তখন প্রচার করা হয়। এ গান থেকে যে অর্থ আয় হয়েছে, তার পুরোটাই সমাজের দুর্বল শ্রেণির জন্য ব্যয় করেন ওয়াং ফেই। শুনুন এ গানটি।

বলা যায় তেরেসা তেংয়ের সংগীতজীবন ছিল অদ্ভুত। তিনি একাই অন্যান্য শিল্পীর কয়েক জনমের সফলতা অর্জন করেছেন। চীনের হংকং, তাইওয়ান ও মূল ভূভাগের অনেক শিল্পী প্রথম দিকে তাকে অনুসরণ করতেন। তার কাছের লোকেরা বলেন, তেরেসা তেংয়ের চরিত্র খুব ভালো। জনপ্রিয়তা ও খ্যাতি তাকে বদলাতে পারেনি; তিনি বরাবরই ছিলেন নম্র ও স্নিগ্ধ।

চীনের সুরকার কাও সিয়াও সোং বলেন, 'একবার আমি একাই কয়েক ঘন্টা ধরে পাহাড়ী এলাকায় হাঁটছিলাম। তখন আমার হাতে একটি রেকর্ডার ছিল। এর মধ্যে ছিল তেরেসা তেংয়ের গানের টেপ। পাহাড়ের চূড়ায় উঠে হঠাত্ উজ্জ্বল তারা ভরা আকাশ দেখে আর হাঁটতে ইচ্ছে করলো না। আমি চূড়ায় শুয়ে শুয়ে বিশুদ্ধ বাতাস উপভোগ করছিলাম আর তেরেসা তেংয়ের গান শ��নছিলাম। গান শুনতে শুনতে আমার ওই মুহূর্তে প্রেমে পড়ার বড় সাধ হলো।"

২০১৩ সালে চৌ চিয়ে লুন তাইওয়ানে তেরেসা তেংয়ের ভার্চুয়াল মূর্তির সঙ্গে 'তুমি কী বলো', 'রেড ডাস্ট ইন' এবং 'হাজার মাইল দূরে' শীর্ষক তিনটি গান গেয়েছেন। ভিডিওতে আমরা দেখেছি, চৌ চিয়ে লুন কিছুক্ষণ গাওয়ার পর তেরেসা তেংয়ের ত্রিমাত্রিক ইমেজ মঞ্চে এসে তার সঙ্গে গান গাইছে। কয়েক সেকেন্ড পর ক্যামেরা মঞ্চের নিচে বসা একজন বৃদ্ধের ওপর ফোকাস করলো। তিনি হলেন তেরেসা তেংয়ের তৃতীয় বড় ভাই। সংগীতানুষ্ঠানে উপস্থিত দর্শক ও তার আত্মীয়স্বজনরা সবাই মুগ্ধ হন গোটা দৃশ্য দেখে।

প্রিয় বন্ধুরা, এতোক্ষণ আপনারা তাইওয়ানের প্রয়াত বিখ্যাত কণ্ঠশিল্পী তেরেসা তেংয়ের সংক্ষিপ্ত পরিচয় জানলেন, শুনলেন তার কয়েকটি গান। তার অনেক সুন্দর গান রয়েছে, কিন্তু 'সুর ও বাণী' আসরের সময় কম, তাই সব গান প্রচার করা অসম্ভব। তার সব গান শুনতে চাইলে আপনারা ইন্টারনেটে তেরেসা তেং লিখে সার্চ দিন। তার সম্পর্কে অনেক তথ্য ও তার গাওয়া অনেক গান আশা করি পেয়ে যাবেন। তার গানগুলো আপনাদের ভালো লাগবে, এ বিশ্বাস আমার আছে। তো আজকের 'সুর ও বাণী' আসর এ পর্যন্তই। ভালো থাকুন সবাই। আবার কথা হবে। (ইয়ু/আলিম)

© China Radio International.CRI. All Rights Reserved.
16A Shijingshan Road, Beijing, China. 100040