Web bengali.cri.cn   
চীনা গল্প: দাইয়ু বন্যা নিয়ন্ত্রণের গল্প
  2017-03-19 19:41:36  cri

চীনের কিংবদন্তিতে দাইয়ুর বন্যা নিয়ন্ত্রণের গল্প অতি সুপরিচিত। দাইয়ুকে চীনের জনগণের বন্ধু আর জনহিতৈষী বীর হিসেবে শ্রদ্ধা করা হয়।

এই গল্প অনাদিকাল আগের, তখন একবার দীর্ঘ ২২ বছর স্থায়ী একটি বন্যা হয়েছিল। তখন পৃথিবীর চার দিকে শুধু পানি আর পানি। আবাদি জমি বলতে কিছুই অবশিষ্ট ছিল না, কারণ বন্যায় প্লাবিত হয়ে যায় সব। গৃহহারা হয় মানুষ আর তারা প্রায়শই বন্য প্রাণীর খাবারে পরিণত হতো। ফলে সমগ্র রাজ্য ক্রমশই যেন মানব শূণ্য হয়ে যেতে লাগলো। এই অবস্থা দেখে রাজা ইয়াও ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। তিনি বিভিন্ন উপজাতির সর্দারদের ডেকে এনে রাজ্যের দূরাবস্থার চিত্র তুলে ধরে বন্যা নিয়ন্ত্রণে উপায় নিয়ে আলোচনা করেন। সভায় তিনি দাইয়ু'র বাবা গুনকে বন্যা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেন।

গুন রাজার হুকুম মেনে নিলেন এবং কি করে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা যায় তার উপায় খুঁজতে লাগলেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে রাজ্যের চার দিকে উচু উচু বাঁধ নির্মাণ করে বন্যা প্রতিরোধ করবেন। তাঁর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দীর্ঘ নয় বছর ধরে বাঁধ নির্মাণ করা হয়, কিন্তু বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যর্থ হয়। কারন বন্যার তীব্র চাপ বার বার বাঁধ ভেঙ্গে রাজ্যে প্রবেশ করে আগের চেয়েও মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি আর প্রাণহানীর কারণ হয়ে উঠলো। এই দেখে তো রাজা ইয়াও ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে হুকুম দিলেন- 'গুনে'র বাঁধ নির্মাণ বন্যা প্রতিরোধে কেবল ব্যর্থই হয়নি উল্টো বন্যার জল বাঁধ ভেঙ্গে আরো বেশি ক্ষতির সৃষ্টি হয়। গুন নয় বছর ধরে বন্যা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ চেষ্টা করেছে। তাই তাকে মেরে ফেলো।" রাজার এ হুকুমের পর ইয়ু পাহাড়ে গুনকে বন্দী করা হয় এবং তিন বছর পর গুনকে হত্যা করা হয়। কিন্তু গুন মৃত্যুর সময়ও বন্যাকবলিত মানুষের দূর্দশার কথাই চিন্তা করেন। তিনি ব্যর্থতার বড় কষ্ট বুকে নিয়েই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

এই ঘটনার পর আরো প্রায় বিশ বছর চলে যায়। এদিকে রাজা ইয়াও তাঁর রাজ্যভার সুন-এর হাতে ন্যস্ত করেন। নতুন রাজা সুন এবার গুনের ছেলে দাইয়ুকে বন্যা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দিলেন।

দাইয়ু শুরুতেই তার বাবার নেয়া সকল উদ্দ্যোগ থেকে অভিজ্ঞতা আর শিক্ষা নিলেন। তারপর তিনি নিষ্ঠার সাথে চীনের ভূ-প্রকৃতি আর বৈচিত্র নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করেন। তিনি বাবার এবং তার নিজের চিন্তা অর্থাত্ বাঁধ এবং পানি অপসারণের পর্যাপ্ত চ্যানেল নির্মাণ এই দু'ই পদ্ধতিতে বন্যা প্রতিরোধের সিদ্ধান্ত নিলেন।

দাইয়ু স্বর্গের রাজার কাছ থেকে 'সিরাং' নামে এক ধরনের দুর্লভ মাটি ধার করেন। এ মাটি ভূমিতে রেখে দিলে তা নিরন্তরভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে, এমন কী পাহাড় হয়ে উঠতে পারে।

কিন্তু চারদিকে তো কেবল পানি আর পানি, কীভাবে ভূমিতে 'সিরাং' মাটি চাষ করা যায় তার কোনো উপায়ই যেন খুঁজে পায় না সে। এমন সময়ে হঠাত্ তার সামনে এসে দাড়াঁল বিশাল আকারের এক কচ্ছপ। এ কচ্ছপ বললো-

"তোমরা সবাই আমার পিঠে চড়ে বসো।" "তুমি কে?" দাইয়ু সন্দেহ কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন। "আমি এক হাজার বছর ধরে এখানে আছি আর আমি দেখেছি পানির দেবতা কোংকোং মানবজাতিকে বিপন্ন করার জন্যই বন্যা সৃষ্টি করেন। আমার তা একদম ভাল লাগে না। আজ তোমাদের কঠিন দূরাবস্থা দেখে আমি তোমাদের জন্য কিছু করতে চাই। যাতে মানবজাতিকে বন্যা থেকে উদ্ধার করা যায়।"

এ কথা শুনে দাইয়ু খুব উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। তিনি আর ইংলোং দুর্লভ মাটি 'সিরাং' নিয়ে বড় কচ্ছপের পিঠে চড়ে বসলেন। তারা পানির গভীরে গিয়ে সিরাং মাটি দিয়ে সব বড় বড় নরকের পূরণ করে দেয়। দাইয়ু ইংলোংকে সামনের পথ সুগম করার হুকুম দিলে সে তার শক্ত আর ধারালো লেজ দিয়ে মাটি কাটতে থাকে। তখন রাজ্যের বিপুল সংখ্যক মানুষ ইংলোংয়ের লেজ দিয়ে কাটানো জায়গা খনন করে এবং বন্যার পানি নদী ও সমুদ্রে নেয়ার চেষ্টা করতে থাকে।

এভাবে প্রায় অসম্ভব কার্য সম্ভব করতে গিয়ে অনেক লোক অতি ক্লান্ত হয়ে মরে যেতে লাগলো। তাই দেখে এবার দাইয়ু চিন্তিত হয়ে পড়ে। তিনি একটুও দমে গেলেন না, বরং মৃত্ মানুষদের সত্কার করে পুনরায় উত্সাহ নিয়ে লোকদের নিয়ে উজ্জ্বল ভবিষ্যত গড়ার লক্ষ্যে প্রচেষ্টা চালাতে শুরু করেন। তার এই বিপুল উত্সাহে রাজ্যের মানুষ আবারও পরিশ্রম করতে রাজী হয়।

দাইয়ু বন্যা প্রতিরোধের এই মহাযজ্ঞের সময় একবার থুশান পাহাড় অতিক্রম করতে গিয়ে একটি নয় লেজ ওয়ালা খেঁকশিয়ালের সাথে দেখা হলো। প্রবাদ আছে যে, নয় লেজ যুক্ত খেঁকশিয়ালের সাথে মিলিত হলে কোন সুখবর আসবেই। দাইয়ু মনে মনে ভাবলেন, বন্যা প্রতিরোধে চূড়ান্ত বিজয় তাঁর হবেই।

এ সময় নয় লেজযুক্ত খেঁকশিয়াল হঠাত্‌ই কথা বলে উঠলো- "ভবিষ্যতে তুমি অবশ্যই মহান কৃতিত্ব অর্জন করবে। তবে বড় কৃতিত্ব সাধনের আগে তোমাকে অবশ্যই থুশানশির মেয়েকে বিয়ে করতে হবে।" এ কথা বলেই নয় লেজযুক্ত খেঁকশিয়াল অদৃশ্য হয়ে গেল।

দাইয়ু খেঁকশিয়ালের কথা মত থুশানশির সঙ্গে দেখা করতে যান। থুশানশির বড় মেয়ের নাম নুয়েচিয়াও। সে ভীষণ সুন্দর আর অপরূপ স্নিগ্ধ একটি মেয়ে। সে অনেক আগে থেকেই দাইয়ুর সুনাম ও দক্ষতার কথা শুনেছে। মনে মনে সে দাইয়ুকই ভালোবাসে এবং শ্রদ্ধা করে। এদিকে থুশানশি দাইয়ুর উদ্দেশ্য জানার পর আনন্দের সাথে তার মেয়ে ও দাইয়ুর বিয়েতে সম্মতি দেয়।নুয়েচিয়াও এবার স্বামী দাইয়ুর বন্যা প্রতিরোধের যুদ্ধে সর্বক্ষণ তার সাথে থেকে শক্তি আর উত্সাহ যোগাতে থাকে।

দাইয়ু এবার নতুন উদ্যমে বন্যা প্রতিরোধে টানা ১৩ বছর ধরে বাড়ি ত্যাগ করে বন্যা নিয়ন্ত্রণে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাপিয়ে পড়লো। এমনকি এই কাজের সময়ে তিনি তিন বার নিজ বাড়ির অতিক্রম করলেও বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করেন নি।

একবার দাইয়ু থাইশি পাহাড় আর শাওশি পাহাড়ের মধ্যকার অবস্থিত শুয়ানইউয়ান পাহাড়ে একটি খাল খনন করার প্রয়োজন দেখা দেয়। কিন্তু পাহাড় দু'টি খাঁড়া এবং তা খনন করা অত্যন্ত কঠিন। দাইয়ু ভাবলেন যদি সে নিজেকে এক বলশালী ভাল্লুকে রূপান্তর করেন তাহলেই কেবল এ খাঁড়া পাহাড় খনন করা সম্ভব। কিন্তু বিপত্তি হচ্ছে তাঁর স্ত্রী নুয়েচিয়াও রোজ পাহাড়ে এসে তাঁকে খাবার দিয়ে যায়, যদি সে স্বামীর ভাল্লুক রূপ দেখে চিনতে না পেরে ভয় পায়, তাহলে সব চেষ্টা বৃথা হয়ে যাবে। তা হলে কী হবে উপায়? হঠাত্ করেই দাইয়ু পাহাড়ের চুড়ায় এক বিশাল ঢাক বসিয়ে দেন। তিনি স্ত্রীকে বলেন, আজ থেকে যখনই ঢাকের বাজনা শুনবে কেবল তখনই খাবার নিয়ে পাহাড়ে উঠে আসবে। ঢাকের আওয়াজ না শুনে আর পাহাড়ে এসো না"।

একদিন দাইয়ু পাহাড়ের পাথর খোদাই করার সময় ভাঙা ভাঙা পাথরের টুকরোর এক একটি খন্ড গিয়ে পড়লো সেই ঢাকের ওপর। আর এতে ঢাকের তুং তুং আওয়াজ তৈরী হয় এবং দাইয়ুর স্ত্রী মনে করে যে, স্বামী তাকে ডাকছে। সে খাবার প্রস্তুত করে পাহাড়ে নিয়ে যায়।

যখন নুয়েচিয়াও খাবার নিয়ে পাহাড়ে উঠে আবেগ কন্ঠে স্বামীকে ডাকে তখন দাইয়ু স্ত্রীর ডাক শুনে ভাবলেন-' অসময়ে কেন স্ত্রী এসেছে, নিশ্চয়ই কোন জরুরি দরকার আছে"। এই ভেবে তিনি দ্রুতই দৌঁড়ে আসলেন, কিন্তু ভুলে গেলেন যে তিনি তখনো ভাল্লুকের রূপ নিয়ে আছে। নুয়েচিয়াও হঠাত্ এক বড় ভাল্লুক দেখে ভয় পেয়ে দৌঁড়ে পাহাড়ের নিচে পালিয়ে যায়।

কিন্তু ভালুক রূপের দাইয়ু চিত্কার করে স্ত্রীর নাম ধরে ডাকেন আর এতে নুয়েচিয়াও ডাক শুনে বুঝতে পারলো যে, ভাল্লুকটি আর কেউ নয় সে তাঁর স্বামী। এতে সে ভীষণ লজ্জা পায় এবং এই ভেবে মনঃকষ্ট পায় যে শেষপর্যন্ত সে একটি ভাল্লুককে বিয়ে করলো। সে আতঙ্কিত হয়ে আর নড়তে পারে না।

দাইয়ু দৌঁড়ে গিয়ে স্ত্রীকে ধরতে গিয়ে দেখলো যে তার স্ত্রী একটি প্রস্তরমূর্তিতে পরিণত হয়েছে। এতে দাইয়ু মনের ব্যথা যেন আর সহ্য করতে পারে না। সে পাথরের স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে চিত্কার করে কাঁদতে লাগল। তার চোখের জল মূর্তির গায়ে পড়ে হঠাত্ প্রস্তরমূর্তির মাঝখানে ভেঙ্গে যায় এবং একটি ফুটফুটে বাচ্চা বের হয়ে আসে।

দাইয়ু বুঝতে পারলো যে, এ বাচ্চা হচ্ছে নুয়েচিয়াও ও তার সন্তান। তার মনে এবার আনন্দ ও বেদনা দুয়ে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলো। বাচ্চা মায়ের প্রস্তরমূর্তি ভেঙ্গে দিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে বলে দাইয়ু এ বাচ্চার নাম রাখেন 'ছি'।

তারপর দাইয়ু একদিকে ছি'কে লালনপালন করেন অন্যদিকে বন্যা নিয়ন্ত্রণের যুদ্ধও চালিয়ে যেতে থাকে। এবারে আরও দুঃসহ যন্ত্রণা আর কষ্টে তাঁর দিনাতিপাত হতে থাকে। থুশানশির মেঝো মেয়ে, অর্থাত্ নুয়েচিয়াওয়ের ছোট বোন নুয়েইয়াও দাইয়ুর এই অসম্ভব পরিশ্রম আর প্রচেষ্টা দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়। একদিন সে দাইয়ুর বাড়িতে এসে তার স্ত্রী হয়ে ছি'কে লালন করা আর দাইয়ুকে দেখাশোনার দায়িত্ব নেয়।

নুয়েইয়াও আসার পর দাইয়ুর বন্যা নিয়ন্ত্রণের কাজ পুনরায় বিপুল গতি আর উদ্যমে শুরু হয়। অসম্ভব সব কঠোর পরিশ্রম শেষে অবশেষে দাইয়ু বন্যা নিয়ন্ত্রণের সাফল্য অর্জন করেন। এজন্য তাকে ৩০০টি বড় নদী, ৩০০০টি শাখা নদী ও অসংখ্য ছোট খাল খনন করতে হয়েছে। আর এগুলোকে বড় নদী ও সমুদ্রের সাথে সংযোগ করা হয়। ফলে চিরদিনের ন্যায় বন্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।

বন্যা নিয়ন্ত্রণের পর এবার দাইয়ু আবারও জনগণদের সাথে বিপুল পরিমাণ গাছগাছলা ও ঘাস চাষ করেন। তারা সমতলভূমিতে ফসলের চাষ করেন, লাগানো হয় হরেক রকমের ফলের গাছ। এমনকি তারা মরুভূমিতেও সবুজ ঘাস লাগায়। ধাপে ধাপে বিস্তীর্ণ চীনের মাটিতে আবার প্রাণশক্তি ফিরে আসে। চীনাদের শান্তিময় ও সুখী জীবন যেন আবার পুনরুদ্ধার হলো।

বন্যা প্রতিরোধ করার পর দাইয়ু এবার চীনের আয়তন মাপ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি পূর্বমেরু থেকে পশ্চিমমেরু পর্যন্ত, দক্ষিণমেরু থেকে উত্তরমেরু পর্যন্ত মাপ নেয়ার জন্য লোকজন নিয়োগ করেন। মাপের ফল হলো উভয় দিকে ৫০ কোটি ১৯ হাজার ৮০০ পদক্ষেপ। দাইয়ু এ ঘনক্ষেত্রকে নয়টি রাজ্যে ভাগ করেন।

দাইয়ু বন্যা নিয়ন্ত্রণের কৃতিত্ব দেখে জনসাধারণ সবাই তাকে শ্রদ্ধা করেন এবং তার কীর্তির জন্য তাকে প্রশংসা করে। তখন অবশ্য রাজা সুন বৃদ্ধ হয়ে গেছে। সকলের সমর্থনে দাইয়ু এবার সুন রাজার স্থালাভিষিক্ত হলেন।

দাইয়ুর আমলে চীনের জনগন অনেক ভালো কাজ করেন। এর প্রায় বেশ কয়েক বছর পরে তিনি দক্ষিণাঞ্চলে পরিদর্শনের সময় হুইচি নামে এক জায়গায় অজানা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। সেই থেকে আজ পর্যন্ত হুইচি পাহাড়ের 'ইয়ুশুয়ে' নামে এক গুহা আছে। সাধারণ মানুষ মনে করেন, সেটা হলো দাইয়ুর কবরস্থান। (ইয়ু)

© China Radio International.CRI. All Rights Reserved.
16A Shijingshan Road, Beijing, China. 100040