Web bengali.cri.cn   
পুবের জানালা: চীনের ভোক্তা ও ভোক্তাবাজার
  2016-10-26 09:17:52  cri



চৌ লি সি ছুয়ান প্রদেশের ছেং তু শহরের বাসিন্দা। তিনি আজকাল নিয়মিত মোবাইল ফোনের মাধ্যমে প্রয়োজনী শাকসবজি কেনেন। অনলাইনে অর্ডার দেওয়ার ৩০ মিনিটের মধ্যে বাসায় চলে আসে তরতাজা সব শাকসবজি। সাধারণ বাজারের চেয়ে দামটা একটু বেশি। কিন্তু চৌ লির জন্য এটা ঠিক আছে।

পণ্য ও সেবার মান সম্পর্কে চীনা ভোক্তারা বর্তমানে আগের যে-কোনো সময়ের চেয়ে বেশি সচেতন। সস্তা পণ্য বা সেবা নেওয়ার চেয়ে মানসম্মত ভালো পণ্য ও সেবা নিতেই তারা বেশি আগ্রহী। এ জন্য তারা একটি বাড়তি খরচ করতেও প্রস্তুত। একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ২০১৫ সালে চীনা বাজারে খুচরা পণ্য বিক্রি হয়েছে আগের বছরের চেয়ে ৭ শতাংশ বেশি। অর্থাত মানুষ এখন আগের চেয়ে বেশি কেনাকাটা করছেন। কেনাকাটার সময় তারা ভালো মানের পণ্যের ওপর জোর দিচ্ছেন।

পোশাক, খাবার, যাতায়াতের ধরন ও বাসস্থান একজন ব্যক্তির জীবনযাপন পদ্ধতিকে প্রতিনিধিত্ব করে। একটা সময় ছিল যখন চীনে মৌলিক চাহিদা পূরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হতো। আর বর্তমানে পণ্য ও সেবার মানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পরিবর্তনটা লক্ষ্যণীয়। চীনা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, চলতি বছরের প্রথম ৮ মাসে খুচরা বিক্রয়ের পরিমাণ গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১০.৩ শতাংশ বেশি ছিল। চীনের অর্থনীতিতে এখন ব্যক্তিগত ভোগ একটি অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।

চীনা মানুষের কাছে পর্যটন এখন আগের যে-কোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। পর্যটন খাতে সেবার মানও দিন দিনি উন্নত হচ্ছে। চীনারা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিমান টিকিট কাটা, হোটেলের রুম বুক করার কাজ করছেন। এমনকি অনলাইনে তারা ব্যাক্তিগত গাইড পর্যন্ত নিয়োগ করে থাকেন।

বস্তুত পর্যটন এখন চীনা অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। চীনা জিডিপি'তে পর্যটনের অবদান ১০.৮ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। পর্যটন খাতে কর্মসংস্থানের হারও ১০.২ শতাংশ। অন্যভাবে বললে, চীনে যারা চাকুরি করেন, তাদের প্রতি ১০ জনের একজন পর্যটনশিল্পে কাজ করেন। তবে, ২০১৫ সালে চীনা পর্যটকদের মাত্র ৩ শতাংশ ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে ভ্রমণ করেছেন।

চীনের ভোগ্যপণ্য ও সেবা বাজারে অবসরভাতা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে। সাংহাইয়ে একটি প্রতিষ্ঠান এক লাথ প্রবীণের ওপর সার্বক্ষণিক দৃষ্টি রাখে। তাদের পরিবারে পানি বা বিদ্যুতের সমস্যা হলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিষ্ঠানটি সেবা দেয়। এটি একটি বেসরকারি কোম্পানি এবং গত তিন বছরে এ খাতে কোম্পানিটি মোট ৩০০ কোটি ইউয়ান বিনিয়োগ করেছে। বলা বাহুল্য, প্রবীণরা তাদের অবসরভাতা বিভিন্ন পণ্য ও সেবা ক্রয়ে ব্যয় করছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অদূর ভবিষ্যতে চীনা ভোগ্যবাজারে অবসরভাতার হিস্যা ১০ ট্রিলিয়ান ইউয়ান ছাড়িয়ে যাবে। বছরে এক্ষেত্রে বৃদ্ধির গড় হার ১৭ শতাংশ। চীনের এ বাজার অনেক আন্তর্জাতিক বিনিয়োগও আকর্ষণ করছে। চে চিয়াং প্রদেশের উচেন জেলায় মার্কিন ও চীনা যৌথ বিনিয়োগে প্রবীণদের জন্য ৭৫০ কোটি ইউয়ানের একটি পার্ক নির্মিত হচ্ছে। ফ্রান্সের বিখ্যাত নার্সিং হোম ব্র্যান্ড COLISEE চীনে প্রবীণদের জন্য বিভিন্ন সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। ২০১৩ থেকে এ পর্যন্ত চীনে অবসরভাতার মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০,০০০ কোটি ইউয়ানে।

ক্রীড়াসরঞ্জামের বাজারও চীনে রমরমা। বেইজিংয়ের নাগরিক ইয়ান সাও ছেং একজন ক্রীড়াবিদ ও ক্রীড়া অনুরাগী। তিনি বেইজিংয়ের বাইরে গিয়ে ম্যারাথন প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। প্রতিবছর দৌড়ের সরঞ্জাম ক্রয় ও প্রতিযোগিতার জন্য অন্য শহরে যেতে তিনি অন্তত ১০ হাজার ইউয়ান ব্যায় করেন। তিনি এ ব্যয়কে অর্থবহ মনে করেন। তার মতে, খেলাধুলা মানুষের শরীর ও মনকে চাঙ্গা রাখে।

চীনে ১ কোটির বেশি মানুষ নিয়মিত দৌড়ান। ২০২২ সালের শীতাকালীন অলিম্পিক বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হবে। শীতকালীন ক্রীড়া ইতোমধ্যেই চীনে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। চীনে স্কি খেলায় আগ্রহীর সংখ্যা বছরে ৩০ শতাংশ হারে বাড়ছে।

২০১৩ সালে চীনা ক্রীড়াশিল্পের মূল্য ছিল প্রায় ৩২০০ কোটি ইউয়ান।যা জিডিপি'র ০.৬ শতাংশ। শিল্পোন্নত দেশগুলোতে জিডিপি'র ২ শতাংশ আসে ক্রীড়াশিল্প থেকে। তার মানে, চীনে এই খাতের সম্ভাবনা অনেক বেশি।

বিশ্বজুড়েই চলছে ইন্টারনেট সংস্কৃতির জয়জয়কার। চীনও এর বাইরে নয়। বেইজিং নাগরিক ওয়াং ইউয়ু ইন্টারনেটে রাজপ্রাসাদ যাদুঘরের দোকান থেকে একটি মাউস প্যাড কিনেছেন। এ প্যাডে অঙ্কিত আছে সুং রাজবংশ আমলের বিখ্যাত একজন শিল্পীর শিল্পকর্ম। রাজপ্রাসাদ যাদুঘর থেকে অনলাইন ও অফলাইনে নানা রকমের স্মারকবস্তু ক্রয় করা যায়। এসব পণ্য চীনা ইতিহাস ও সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত।

চীনে অনলাইনে বই, ভিডিও ও গেমসসহ নানা পণ্যের বিক্রিও বেড়েছে। 'হিমালয়' একটি ইন্টারনেট রেডিও প্লাটফর্ম। এখানে প্রতিদিন রেডিও অনুষ্ঠান শোনা যায়। আবার যে কেউ চাইলে এখানে নিজের অনুষ্ঠান আপলোডও করতে পারেন।

ইন্টারনেটে লাইভ অনুষ্ঠানও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কুয়াং তুং প্রদেশে ৯০ দশকে জন্মগ্রহণকারী জুয়াং সিন ইয়ান ইন্টারনেটে লাইভ অনুষ্ঠান করে থাকেন। তিনি প্রতিদিন অনলাইনে গান গান এবং এর মাধ্যমে আয় করেন। চলতি এপ্রিল মাসে তার প্রথম ডিজিটাল অ্যালবাম প্রকাশিত হয়। প্রায় দেড় লাখ অ্যালবাম ইতোমধ্যেই বিক্রি হয়েছে।(শিশির/আলিম)

© China Radio International.CRI. All Rights Reserved.
16A Shijingshan Road, Beijing, China. 100040