Web bengali.cri.cn   
সুর ও বাণী: সুরকার ওয়াং মিং
  2016-09-08 19:39:44  cri


প্রিয় শ্রোতাবন্ধুরা, আপনারা চীন আন্তর্জাতিক বেতারের বাংলা অনুষ্ঠান শুনছেন। আমি আনন্দী বেইজিং থেকে আপনাদের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়ে শুরু করছি সুর ও বাণী আসর। আজ আপনাদের চীনের বিখ্যাত সুরকার ওয়াং মিং সম্পর্কে জানাব এবং শোনাবো তার কয়েকটি শ্রুতিমধুর গান।

সুরকার ওয়াং মিং

বন্ধুরা, এখন আপনারা শুনছেন 'অন্তরঙ্গ বন্ধু' শিরোনামের গান। গেয়েছেন কণ্ঠশিল্পী লি গু ই। একই নামের চলচ্চিত্রে গানটি ব্যবহার করা হয়েছে। সুরকার ওয়াং মিং এ গানে সুর করেছেন। গানে জেনারেল ছাই-এর দেশ রক্ষায় বীরত্ব ও সাহসিকতার প্রশংসা করা হয়েছে এবং তার জন্য সিয়াও ফেং সিয়ানের প্রেম ফুটে উঠেছে।

সুরকার ওয়াং মিং ১৯৩৪ সালে শাংহাইয়ের উপকণ্ঠের এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ফুল বিক্রি করে তাকে প্রাথমিক স্কুলে পড়ান। ১৯৪৭ সালে তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা একটু ভালো হওয়ার পর তিনি শাংহাই চিয়াওথোং মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি হন। স্কুলে তিনি গান শোনার সুযোগ পান। ১৯৪৯ সালে শাংহাই মুক্তি পাওয়ার পর স্কুলটি সংগীত তত্ত্ব, কম্পোজ ও সংগীত পরিচালনা শেখার জন্য ওয়াং মিংকে যুব সাংস্কৃতিক দলে পাঠায়। এখান থেকেই তার সংগীত জীবন শুরু হয়।

বন্ধুরা, এখন শুনছেন 'সীমান্তে ঝরনার পরিষ্কার পানি' নামের গানটি। গানের সুর ঠিক যেন ঝরনার পানির মতো আমাদের কানে বাজে। গানে সেনাবাহিনী ও জনগণের মাছ ও পানির মতো গভীর সম্পর্ক এবং দেশের প্রতি জনগণের শুভকামনা ফুটে উঠেছে।

১৯৫৩ সালে উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল পাশ করার পর ওয়াং মিং অসুস্থতার জন্য সংগীত কলেজে ভর্তি হতে পারেননি। তবে সংগীতের প্রতি তার ভালোবাসা থেমে যায়নি। এরপর তিনি শাংহাই সংগীত বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈশক্লাসে যোগ দেন এবং ধাপে ধাপে কিছু সুর সৃষ্টি করেন। ১৯৫৯ সালে ওয়াং মিং খুব ভালো ফলাফল নিয়ে শাংহাই সংগীত ইনস্টিটিউটের কম্পোজ বিভাগে ভর্তি হন। এ ইনস্টিটিউটে পাঁচ বছরে তিনি দেশি-বিদেশি সংগীত তত্ত্ব শেখার পাশাপাশি চীনের লোকসংগীত নিয়েও গবেষণা করেন। এটা পরবর্তীতে তার নিজস্ব সংগীত শৈলী সৃষ্টির মজবুত ভিত্তি স্থাপন করেছে।

চলচ্চিত্র 'হাই ইয়ান'

১৯৭৫ সালে ওয়াং মিং চলচ্চিত্র 'হাই সিয়া' এর জন্য সুর করেন। এ চলচ্চিত্রে 'সমুদ্রতীরে জেলের মেয়ে' নামের গানটি খুব জনপ্রিয় হয়। এরপর চীনের চলচ্চিত্র সংগীতের সঙ্গে তার অবিচ্ছেদ্য বন্ধন গড়ে ওঠে। তিনি বিদেশি শৈলী ও চীনা লোকসংগীতের বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে নিজস্ব বিশেষ সংগীত শৈলী সৃষ্টি করেন। বন্ধুরা, শুনুন 'সমুদ্রতীরে জেলের মেয়ে' শিরোনামের গানটি।

ওয়াং মিং তার সংগীত জীবনে ১০০টিরও বেশি চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন নাটকে সুর করেছেন। তার সুরে তারুণ্যের দীপ্তি ভরা, ফলে যুবক-যুবতীদের মাঝে তার গান জনপ্রিয়তা পায়। ওয়াং মিং বলেন, 'আমি গান দিয়ে জীবনের অর্থ বুঝাতে চাই, যুবকদের ইতিবাচক প্রেরণা দিতে চাই।'

বন্ধুরা, এবার শুনুন ওয়াং মিংয়ের সৃষ্ট আরেকটি গান। শিরোনাম 'যৌবন'।

চীনে পপ সংগীতের প্রশিক্ষণ কোর্স চালুর প্রথম সারির একজন সংগীতজ্ঞ ওয়াং মিং। ১৯৮৭ সালে সুন হাও, লি শু ও হু সিয়াও ছিং প্রমুখ যুব গায়ক ও গায়িকা তার পপ সংগীত প্রশিক্ষণ কোর্স থেকে পাশ করেন। তারা চীনের পপ সংগীত জগতে নিজেদের স্থান করে নেন। ১৯৮৮ সালে ওয়াং মিং চীনের 'হালকা সংগীত সমিতি' গঠন করেন, এরপর তিনি 'সংগীত জীবন পত্রিকা' সম্পাদনা করেন। গীতিকার ছিয়াও ইয়ু ওয়াং মিংয়ের সঙ্গে প্রায় ৩০ বছর ধরে সংগীত সৃষ্টিতে সহযোগিতা করেছেন। ছিয়াং ইয়ু বলেন, 'ওয়াং মিং তার জীবন সংগীতের জন্য উত্সর্গ করেছেন।'

১৯৮৪ সালে এ দু'জন সংগীতজ্ঞের সৃষ্ট 'আজ রাত অবিস্মরণীয়' গানটি চীনের কেন্দ্রীয় টেলিভিশন কেন্দ্রের বসন্ত উত্সবের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পরিবেশন করা হয়। এখন পর্যন্ত বসন্ত উত্সবের সব অনুষ্ঠানে এ গানটি শোনা যায়। গানটি সারা চীনের জনগণের মনে গভীর দাগ কেটেছে।

ওয়াং মিংয়ের জন্ম সংগীতের জন্য হয়েছে। দেবতা সংগীতের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও সহজাত প্রতিভা এক দরিদ্র বাচ্চাকে দিয়েছে। দর্শকরা শ্রুতিমধুর সংগীত শোনেন এবং সুখ্যাতি অর্জনের পর সবসময় হাসিমুখের ওয়াং মিংকে দেখতে পান, কিন্তু খুব কম লোক জানেন, তিনি কীভাবে চোখের জল আর ঘাম দিয়ে স্বদেশ ও জীবনের প্রতি নিজের মনের গভীর ভাবাবেগ প্রকাশ করেছেন এবং সংগীতে নিজস্ব জগত সৃষ্টি করেছেন।

চলচ্চিত্র 'ক্ষুদ্র ফুল'

১৯৭৯ সালে তিনি চলচ্চিত্র 'ক্ষুদ্র ফুল' এর জন্য সুর করেন। ১৯৮০ সালে এ চলচ্চিত্রের সংগীত চীনের 'শত ফুল অ্যাওয়ার্ডে'র শ্রেষ্ঠ সংগীত পুরস্কার পায়। এ চলচ্চিত্রের থিম সং 'মখমল ফুল' ১৯৮০ সালে শ্রোতাদের জনপ্রিয় গান হিসেবে নির্বাচিত হয়। বন্ধুরা, শুনুন 'মখমল ফুল' গানটি।

ওয়াং মিং চীনের জাতীয় গণরাজনৈতিক পরামর্শ সম্মেলনের সদস্য, চীনের হালকা সংগীত সমিতির স্থায়ী ভাইস চেয়ারম্যান ও মহাসচিব, চীনের চলচ্চিত্র অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ও প্রথম শ্রেণীর সুরকার ছিলেন। তার সৃষ্ট চলচ্চিত্রের সংগীতগুলো চীনের নতুন যুগের প্রথম কিস্তির পপ সংগীতে পরিণত হয়েছে। তার গানগুলো চীনের মূল ভূখন্ডে কেবল হংকং ও তাইওয়ানের পপ সংগীতের জনপ্রিয়তার পরিস্থিতি ভেঙ্গে দিয়েছে। ফলে চীনারা ওয়াং মিংকে সবসময় মনে রাখবে।

বন্ধুরা, এবার শুনুন 'ক্ষুদ্র ফুল' চলচ্চিত্রের আরেকটি গান। গানের নাম 'অশ্রু ঝরা চোখে বড় ভাইয়ের খোঁজে ছোট বোন।' অনেকেই কণ্ঠশিল্পী লি গু ই'র গাওয়া এ গানটি শোনার পর নিজেদের চোখের জল আটকে রাখতে পারেননি। গানটি যেন একটি বর্ণনামূলক কবিতা।

একজন শিল্পী কখন নিজের সাফল্যের রেকর্ড নিজেই ভাঙ্গতে পারেন? কিভাবে একের পর এক সফলতার পাহাড় ডিঙ্গিয়ে যেতে পারেন? এটা সহজ কোনো কাজ নয়। ওয়াং মিংও অনেক কষ্ট করে এটি অর্জন করেছেন। তিনি সবসময় নিজের কাজ নিয়ে অসন্তুষ্ট থাকতেন এবং পুরানো কাজ বাদ দিয়ে নতুন কিছু সৃষ্টির চেষ্টা করতেন। অন্যরা দেখত ওয়াং মিং প্রায় সময়ই ক্ষুব্ধ, মনমরা, অসুখী ও অশ্রুসিক্ত নয়নে রয়েছেন। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগ্‌ পর্যন্ত তিনি সংগীতের পেছনে তার সমস্ত চেষ্টা ঢেলে দিয়েছেন। তবে কোনো সন্দেহ নেই যে, তিনি একজন সফল সুরকার ও মানুষ ছিলেন।

প্রিয় বন্ধুরা, সুর ও বাণী আসরে আপনাদের চীনের বিখ্যাত সুরকার ওয়াং মিংয়ের জীবন সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরেছি এবং তার বেশ কয়েকটি গান শুনিয়েছি। আজ এ পর্যন্তই, আমি এখানেই বিদায় নিচ্ছি। ভালো থাকুন সবাই। আবার কথা হবে।

(ইয়ু/তৌহিদ)

© China Radio International.CRI. All Rights Reserved.
16A Shijingshan Road, Beijing, China. 100040