Web bengali.cri.cn   
সুর ও বাণী : চীনের বিখ্যাত গীতিকার ছিয়াও ইয়ু
  2016-08-17 19:52:11  cri


প্রিয় শ্রোতাবন্ধুরা, আপনারা চীন আন্তর্জাতিক বেতারের বাংলা অনুষ্ঠান শুনছেন। আমি আনন্দি বেইজিং থেকে আপনাদের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আজ 'সুর ও বাণী' আসরে আপনাদের চীনের বিখ্যাত গীতিকার ছিয়াও ইয়ুর সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেবো এবং তার সৃষ্টি কয়েকটি চমতকার গান শোনাবো।

ছিয়াও ইয়ু

বন্ধুরা, এখন আপনারা শুনছেন কণ্ঠশিল্পী লি গু ই'র গাওয়া 'আজ রাত অবিস্মরণীয়' নামে একটি মধুময় গান। ১৯৮৪ সালে গীতিকার ছিয়াও ইয়ু এবং সুরকার ওয়াং মিং বসন্ত উত্সবের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সাংগঠনিক গ্রুপের অনুরোধে এ গান সৃষ্টি করেন। ২২ বছর পেড়িয়ে গেছে। কিন্তু এখনো প্রতি বছর বসন্ত উত্সবের আগের দিন রাতে চীনের কেন্দ্রীয় টেলিভিশনে এ গান শোনা যায়। গানটি বসন্ত উত্সবের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছে। এ গানে গীতিকার বলতে চেয়েছেন, 'আজ রাত অবিস্মরণীয়। আমরা চীনের যে কোনো জায়গায় থাকলেও সকলে দেশের কোলেই আছি। আমরা একসাথে স্বদেশের শুভ কামনা করি। আজ রাতকে বিদায় করি সকলে মিলে। নতুন-পুরোনো বন্ধুরা আগামী বছরের বসন্ত উত্সবের দিন আবারো মিলিত হবো। সবুজ পাহাড় থাকবে। আমরাও চীর সবুজ থাকো, বুড়ো হবো না।'

সুপ্রিয় শ্রোতা, ছিয়াও ইয়ু ১৯২৭ সালের ১৬ নভেম্বর চীনের শানতোং প্রদেশের চিনিংয়ে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলায় তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো ছিলো না। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে লেখাপড়া করার সময় তিনি প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষাদান করতেন। ১৯৪৬ সালে ১৯ বছর বয়সী ছিয়াও ইয়ু কমিউনিস্ট পার্টির এক সদস্যের সুপারিশে উত্তর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি সারা জীবন নিজের তিনটি নাম ব্যবহার করেন। তার আসল নাম 'ছিয়াও ছিং পাও' । তার বাবা-মা এ নাম দিয়েছেন। ১৯ বছর বয়সে তিনি বিপ্লবে অংশগ্রহণের পর নিজেই 'ছিয়াও ইয়ু' নাম গ্রহণ করেন। তার তৃতীয় নাম 'ছিয়াও লাও ইয়ে'। চীনের সংগীত ও সাংস্কৃতিক জগতের সবাই তাকে 'ছিয়াও লাও ইয়ে' অর্থাত্ 'ছিয়াও মাস্টার' বলে ডাকেন। এমন কী চীনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী চৌ আন লাইও তাকে ডাকতেন 'ছিয়াও লাও ইয়ে'।

বন্ধুরা, ১৯৫৫ সালে চীনের প্রথম শিশু বিষয়ক চলচ্চিত্র 'দেশের ফুল' মুক্তি পায়। এ চলচ্চিত্রের থিম সং, 'আমরা একসাথে দাঁড় টেনে নৌকা বাই'। এ গানের সুর করেছেন লিউ চি, কথা লিখেছেন ছিয়াও ইয়ু। এ গানটি চীনা শিশুদের সবচেয়ে প্রিয় গানগুলোর অন্যতম। গত শতাব্দীর ৫০'র দশক থেকে এ পর্যন্ত শিশুদের মুখে মুখে প্রচলিত এ গান। এ গানে বলা হয়েছে, 'আমরা একসাথে দাঁড় টেনে নৌকা বাই। হ্রদের গভীর পানিতে সাদা টাওয়ারের সুন্দর ছায়া দেখা যায়। চার পাশে সবুজ গাছ ও লাল দেওয়াল নজরে পড়ে। ছোট নৌকা হ্রদে ভাসছে। পানিতে মাছেরা যেন আমাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। মনোরম সূর্যালোকে আমরা আনন্দময় গান গাইছি।'

প্রিয় শ্রোতা, সারা জীবনে ছিয়াও ইয়ু হাজারখানেক গান লিখেছেন। 'আমার স্বদেশ' নামে গানটি তার প্রতিনিধিত্বশীল কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম। এ গানটি ১৯৫৬ সালের গ্রীষ্মকালে তিনি লিখেছেন। প্রথমে এ গানের নাম ছিল 'বড় এক নদী'। গানটি 'শাং কান লিং'  নামে চলচ্চিত্রের থিম সং। এ চলচ্চিত্রে মার্কিন হামলা প্রতিরোধে কোরিয়াকে সহযোগিতা করে চীনের যুদ্ধে অংশগ্রহণের কাহিনী তুলে ধারা হয়েছে। উপস্থাপন করা হয়েছে চীনা গণস্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর অত্যন্ত কঠোর অবস্থান ও সাহসের সঙ্গে শত্রুদের সঙ্গে লড়াইয়ের কাহিনী। আর 'আমার স্বদেশ' নামে গানটিতে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সৈন্যদের স্বদেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং বীরত্ব প্রকাশিত হয়েছে। শুনুন সোং চু ইংয়ের গাওয়া 'আমার স্বদেশ' গানটি।

ছিয়াও ইয়ু তার সাহিত্যপ্রেমী বাবার প্রভাবে মাত্র চার বছর বয়সে তিন হাজার শব্দ শেখেন। অল্প বয়সেই তিনি অনেক কবিতা মুখস্থ করে ফেলেন। তিনি একজন প্রাণবন্ত ব্যক্তি। তার সাথে গল্প করলে বেশ আনন্দ পাওয়া যায়। তিনি জীবনে অনেক জনপ্রিয় গানের কথা লিখেছেন। ছিয়াও ইয়ু প্রায় বলেন, 'আমি মনে করি না গানের কথা লেখা তেমন উচ্চ মানের কাজ। এটা যেন সাধারণ পরিবারের দৈনন্দিন খাবার ও পোশাকের মতোই সাদামাটা।' তিনি মনে করেন, সরল জীবন ও মাটির সুগন্ধ হচ্ছে শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম। গানের কথা লেখা কঠিন কিছু নয়। তবে ভালো বা উন্নত পর্যায়ের গানের কথা লেখা সহজ কাজ নয়।

প্রিয় শ্রোতা, ১৯৬৩ সালের গ্রীষ্মকালে একদিন ছিয়াও ইয়ু তার শোবার ঘরের জানালা খুললে হঠাত্ করে বাইরে থেকে একটি রঙ্গিন প্রজাপতি তার ঘরে ঢুকে পড়ে। তিনি প্রজাপতিটিকে তাড়ানো চেষ্টা করেন না। দূর থেকে দাঁড়িয়ে প্রজাপতির উড়াউড়ি দেখেন মন দিয়ে। প্রজাপতিটি সোনালি পাখা মেলে ঘরের এদিক থেকে ওদিক উড়তে উড়তে আবার জানালা দিয়ে বাইরে চলে যায়। সূর্যের প্রখর আলোয় যতক্ষণ প্রজাপতিটিকে দেখা যাচ্ছিলো ততক্ষণ তিনি স্থির হয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ মনোমুগ্ধকর দৃশ্য তার মনে গভীর দাগ ফেলে। ১৯৮৮ সালে তিনি সুরকার গু চিয়ান ফানের সঙ্গে যৌথভাবে 'মিস করা' নামে একটি গান সৃষ্টি করেন। এ গানে তিনি সেই প্রজাপতিটির কথা স্মরণ করেছেন। বন্ধুরা, শুনুন কণ্ঠশিল্পী মাও আমিনের গাওয়া এ গানটি। এ গানে ছিয়াও ইয়ু লিখেছেন, 'আমার বন্ধু, তুমি কোথা থেকে এসেছো? প্রজাপতির মতো আমার জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকেছো। এখানে ক'দিন থাকবে আমি জানি না। তবে আমাদের বিদায় হয়েছে অনেক দিন আগে। কেনো তুমি এভাবে চলে গেলে। সেই যে গেলে! আর তো কোনো খবর নেই। তোমাকে আমি গভীরভাবে মিস করি বন্ধু।'

শ্রোতাবন্ধুরা, পরিশ্রমি ছিয়াও ইয়ু একটি দিনকে দুই ভাগে ভাগ করেন। সকালে তিনি দরজা বন্ধ করে রুমে বসে গান লেখেন। কোনো টেলিফোন ধরেন না। কোনো অতিথির সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন না। তবে বিকেলে তিনি স্বাধীন সময় কাটান। তিনি বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করেন কিংবা বাইরে হাঁটতে যান। কখনো কখনো মাছ ধরতে যান। বৃষ্টির সময় মাছ ধরা তার অন্যতম শখ।

'আমাদের গ্রামের যুবক' নামের চলচ্চিত্রের একটি প্রধান গানের শিরোনাম 'সবাই বলেন শানশি'র প্রাকৃতিক দৃশ্য সুন্দর'। এ গানের কথা লিখেছেন ছিয়াও ইয়ু। সুর করেছেন চাং লি চাং। গানটি গেয়েছেন কু লান ইং। এ গানটি ১৯৫৯ সালে রচিত। গত শতাব্দীর ৬০'র দশকে চীনে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছে এ গান। শানশির লোকসংগীতকে এক নতুন পর্যায়ে নিয়ে গেছে গানটি।

ছিয়াও ইয়ু আর তার স্ত্রী তোং ছি

বন্ধুরা, এখন ছিয়াও ইয়ুর বয়স ৮৭ বছর। স্ত্রী তোং ছি'র সঙ্গে বহু বছরের ভালোবাসার সংসার তার। দীর্ঘ বিবাহিত জীবনে তারা পরস্পরকে সাহায্য করে এসেছেন। তাদের জীবন সুখ ও শান্তিময়। বৃদ্ধকালে সবাই তাকে 'গানের শীর্ষ পর্যায়ের লেখক' বলেন এবং ব্যাপক শ্রদ্ধা করেন। তিনি এ বৃদ্ধ বয়সেও একটি গান লিখেছেন। এ গানের শিরোনাম 'লাল সূর্যাস্ত'।

১৯৯৪ সালের ১৯ জুন ছিয়াও ইয়ু-তোং ছি দম্পতির বিয়ের ৪০তম বার্ষিকী পূর্ণ হয়। এ বিশেষ দিন উদযাপনের জন্য তাদের ছেলেমেয়েসহ আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিলো। অনুষ্ঠানে একজন যুবক বলেন, 'এক পুরুষ ও এক নারী একসাথে চল্লিশ বছর ধরে জীবনযাপন করতে পারেন। এ কী আশ্চর্য ব্যাপার।' এ কথা শুনে ছিয়াও ইয়ু উত্তরে বলেন, 'যদি আমি বলি, আমার একমাত্র উপায় হচ্ছে সহনশীলতা।' এ সময় তার স্ত্রী তোং ছি বলেন, 'আমার উপায় হচ্ছে বার বার সহনশীলতা।' তাদের কথা শুনে সবাই হেসে ওঠে।

ছিয়াও ইয়ু আর লি গু ই

বন্ধুরা, এখন শুনুন লি গু ইর গাওয়া 'মনের গোলাপ' নামের গানটি। ছিয়াও ইয়ু এ গানে লিখেছেন, আমার মনের গভীরে একটি গোলাপ ফুটেছে। আমি প্রাণের ঝরনা দিয়ে তাতে জলদান করি। আমার মনের গোলাপ, তুমি চিরকাল আমার সঙ্গি হয়ে থাকবে। আমাকে সান্ত্বনা দেবে, আমাকে আনন্দ দেবে, দেবে প্রেম। তোমার কারণে আমার জীবন উজ্জ্বল হবে।'

প্রিয় বন্ধুরা, আজকের 'সুর ও বাণী' আসরে চীনের বিখ্যাত গীতিকার ছিয়াও ইয়ু'র সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়েছি। তিনি এক হাজারেরও বেশি গান লিখেছেন। প্রতি গানে অল্প শব্দ ব্যবহার করে অত্যন্ত নিপুনভাবে নিজের আন্তরিকতা, সৌন্দর্য, সদগুণ উপস্থাপন করেছেন। তিনি সরল ও হাস্যরসে সমৃদ্ধ কথা দিয়ে কোটি কোটি চীনার মন-প্রাণ জয় করেছেন।

সুপ্রিয় শ্রোতাবন্ধুরা, 'সুর ও বাণী' আসর আজকের মতো এখানে শেষ করছি। অনুষ্ঠান শোনার জন্য ধন্যবাদ। সবাই ভালো থাকুন। আবার কথা হবে। (ইয়ু/মান্না)

© China Radio International.CRI. All Rights Reserved.
16A Shijingshan Road, Beijing, China. 100040