Web bengali.cri.cn   
সুর ও বাণী : চীনের বিখ্যাত নারী সুরকার গু চিয়ান ফেন
  2016-06-13 19:02:22  cri


বন্ধুরা, এখন আপনারা শুনছেন 'মোমবাতির আলোয় মা' নামে একটি গান। গেয়েছেন মাও আমিন। এ গানের কথা লিখেছেন লি ছুন লি। লি ছুন লি'র মা বহু বছর ধরে অসুস্থ ছিলেন। তিনি বিছানা থেকে উঠতে পারতেন না। মায়ের জন্য এ গানটি লিখেছেন এই গীতিকার। তার মা গানটি খুবই পছন্দ করেন। এ গানের সুর করেছেন গু চিয়ান ফেন। চীনের অনেক গায়ক গানটি গেয়েছেন। তবে তাদের মধ্যে মাও আমিনের কণ্ঠে গাওয়া গানটি বেশি জনপ্রিয়। এ গানে বলা হয়েছে, 'মা, মোমবাতির আলোয় আমার প্রিয় মা। আপনার কালো চুল সাদা হয়ে গেছে। আপনার মুখে ভাঁজ পরেছে। আপনার চোখের আলো কমে গেছে। মা, আপনার মেয়ে এখন বড় হয়েছে। আপনার হাত ধরে বসন্ত, শরত্, শীত ও গ্রীষ্মকাল অতিক্রম করতে পারে সে। মা, আমাকে বিশ্বাস করুন।'

সুরকার গু চিয়ান ফেন

সুপ্রিয় শ্রোতা, গু চিয়া ফেন চীনের বর্তমান সময়ের একজন বিখ্যাত নারী সুরকার। তার বাবা-মা বিংশ শতাব্দীর ৩০'এর দশকের প্রথম দিকে জাপানে চলে যান। ১৯৩৫ সালে তিনি জাপানের ওসাকায় জন্মগ্রহণ করেন। চীনের বিরুদ্ধে জাপানী সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের পর ১৯৪১ সালে তিনি বাবা-মার সঙ্গে চীনে ফিরে আসেন। এরপর থেকে তারা লিয়াও নিং প্রদেশের দালিয়ান শহরে থাকেন।

ছোটবেলা থেকে গু চিয়ান ফেন মনে করেন, সংগীত তার জীবনের অপরিহার্য বিষয়। সংগীত মাঝে মাঝে তাকে আনন্দ দেয়, মাঝে মাঝে তার মনকে শোকার্ত করে তোলে। সংগীত জগত থেকে তিনি কখনো বিচ্ছিন্ন হতে পারেন না। ১৯৫২ সালে তিনি শেন ইয়াং সংগীত কলেজে ভর্তি হন। স্নাতক হওয়ার পর তিনি চীনের কেন্দ্রীয় নৃত্যগীতি দলে যোগ দেন। তখন তিনি প্রধানত নৃত্য সংগীত তৈরি করতেন।

বন্ধুরা, এখন শুনছেন 'মায়ের স্নেহ চুম্বন' নামের গানটি। গেয়েছেন চেং লিন। কথা লিখেছেন ওয়াং ফু লিন। সুর করেছেন গু চিয়ান ফেন। এ গানে গ্রামাঞ্চলের মা ও সন্তানের আন্তরিক মমতা প্রতিফলিত হয়েছে। এ গানে বলা হয়েছে, 'ওই সুদূর পাহাড়ী গ্রামে আমার প্রিয় মা বাস করে। তার সব চুল সাদা হয়ে গেছে। অতীতের সেই সোনালি স্মৃতি কখনো ভুলে যাবো না। মা আমাকে কত চুমু দিয়েছে। পরম স্নেহে আমার চোখের জল মুছে দিয়েছে। মায়ের চুমু সে কী মিষ্টি! আমার ক্ষুদ্র মনকে উষ্ণ করে তুলতো মায়ের চুমু। আজ সে চুম্বন আমি খুব মিস করি'।

গু চিয়ান ফেন আর তাঁর ছাত্রী মাও আমিন

গু চিয়ান ফেন হাজারখানেক গানের সুর সৃষ্টি করেছেন। বিংশ শতাব্দীর ৮০'র দশক থেকে তার গানগুলো জনপ্রিয় হয়। ব্যাপক সুনাম অর্জন করে। তার অনেক গান আধুনিক চীনের পপ সংগীতের প্রতিনিধিত্বশীল কাজে পরিণত হয়েছে।

তিনি চীনের 'স্বর্ণ ডিস্ক পুরস্কার', সমসাময়িক যুবকদের সবচেয়ে প্রিয় গানের পুরস্কার, চীনের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের নৃত্য সংগীত পুরস্কার, যুগোস্লাভিয়ার বেলগ্রেড আন্তর্জাতিক পপ সংগীতের কম্পোজ পুরস্কার এবং ইউনেস্কো এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের শ্রেষ্ঠ সংগীত শিক্ষা পুরস্কার পেয়েছেন। চীনের সংস্কার ও উন্মুক্তকরণের পর চীনের সংগীত শিল্পের উন্নয়নের জন্য তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

প্রিয় বন্ধুরা, এবার শুনুন 'শিকড়ের প্রতি সবুজ পাতার মমত্ব' নামে একটি গান। গেয়েছেন লিউ হুয়ান। গানের কথা লিখেছেন ওয়াং চিয়ান সুর করেছেন গু চিয়ান ফেন। ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরে গায়িকা মাও আমিন চতুর্থ যুগোস্লাভিয়ার বেলগ্রেড আন্তর্জাতিক পপ সংগীত উত্সব প্রতিযোগিতায় এ গান গেয়েছেন। এ গান শ্রেষ্ঠ কণ্ঠ, দশর্কের প্রতিক্রিয়া এবং কম্পোজ এ তিনটি পুরস্কার পেয়েছে। এ গানটি পপ সংগীতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় চীনের প্রথম পুরস্কার এনে দেয়। এ গানে সবুজ পাতা ও শিকড়কে উপমা হিসেবে ব্যবহার করে প্রবাসী জীবনে জন্মভূমিকে অনুভব করার অনুভূতি উপস্থাপন করা হয়েছে। শুনুন গানটি।

চীনের মূলভূখণ্ডে গু চিয়ান ফেনের নাম বললে সবাই চেনেন তাকে। কারণ তিনি বহু জনপ্রিয় গানের সুর করার পাশাপাশি চীনের পপ সংগীত জগতে বহু জনপ্রিয় গায়ক-গায়িকার ক্যারিয়ার তৈরি করেছেন। তিনি চীনের পপ সংগীতের মজবুত ভিত্তি স্থাপন করেছেন।

গত শতাব্দীর ৮০'র দশকে নানা কঠিন অবস্থা অতিক্রম করে 'গু চিয়ান ফেন কণ্ঠসংগীত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র' প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য হলো 'শ্রেষ্ঠ সংগীত সৃষ্টি করা এবং প্রতিভাবান কণ্ঠশিল্পী গড়ে তোলা'। বর্তমানে চীনের পপ সংগীত জগতের নামকরা কণ্ঠশিল্পী, যেমন লিউ হুয়ান, সুন নান, না ইং, মাও আমিন, চেং ফাং ইউয়ান এবং সু হোং প্রমূখ গু চিয়ান ফেনের ছাত্র-ছাত্রী।

গু চিয়ান ফেন আর তার ছাত্রী সু হোং

প্রিয় শ্রোতা, এখন আপনারা শুনছেন গু চিয়ান ফেনের ছাত্রী সু হোংয়ের গাওয়া 'আমি গান গাইতে চাই' নামে একটি চমতকার গান। এ গানে উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের একজন ছাত্রী লেখাপড়ার চাপে পরে মাকে নিজের মনের কথা বলেছে। মেয়েটি গান গাইতে খুব পছন্দ করে। কিন্তু লেখাপড়ার চাপ এতো বেশি যে গান গাওয়ার সময় পায় না। তাই তার সব সময় মন খারাপ করে থাকে। সে শিক্ষক এবং মাকে বলতে চায়, সবসময় এভাবে বই নিয়ে বই পোকার মতো বসে থাকলে হবে না। এ ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া যাবে না। আমি গান গেতে চাই। আমি এক রঙিন জীবন চাই।'

২০০১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর 'বিশ বছর পর দেখা হবে' শীর্ষক গু চিয়ান ফেনের সংগীতানুষ্ঠান বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হয়। দু'ঘন্টাব্যাপী এ সংগীতানুষ্ঠানে গেল বিশ বছরে এ সুরকারের ২৭টি প্রতিনিধিত্বশীল কাজ উপস্থাপন করা হয়। দর্শকরা গানগুলো শুনতে শুনতে অতীতে ফিরে গেছেন। এ সংগীতানুষ্ঠানের প্রথম সংগীত ছিল 'বিশ বছর পর দেখা হবে'। গেয়েছেন লি গু ই। তিনি গেয়েছেন 'তরুণ বন্ধুরা, আজ আমরা মিলিত হয়েছি। আমরা ছোট নৌকায় চড়ে বসেছি। উষ্ণ বাতাস বয়েছে চারদিকজুড়ে। ফুলের সুগন্ধ, পাখির ডাক, বসন্তের সুন্দর দৃশ্য, আমাদের হাসি ও গানের আওয়াজে রঙিন মেঘ ছড়িয়ে যাচ্ছে।'

গু চিয়ান ফেন আর তার ছাত্রী না ইং

গু চিয়ান ফেনকে চীনের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ পপ সংগীত প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তবে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি নিজেই বলেছেন, তার অধিকাংশ কাজ ব্যর্থ হয়েছে। এর মূল কারণ তার উদ্ভাবশীল কাজ কম। তিনি বলেন, 'আমি সারা জীবন ধরে সংগীত সৃষ্টি করেছি। কিন্তু লোকে কেবল সফল গানগুলো শুনেছে। আসলে ৯৯ শতাংশ কাজই ব্যর্থ হয়েছে। কারণ আগে যত সাফল্য অর্জিত হয়েছে, ভবিষ্যতে তা অতিক্রম করা তত কঠিন হবে।'

গু চিয়ান ফেন সংগীত কর্মের গুণগত মানের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, 'সংগীত কর্ম ভালো ও মন্দ, নিজে বললে হবে না। জনসাধারণের পছন্দ হলে তা কেবল ভালো বলা যায়।

বন্ধুরা, এবার শুনুন 'সে হলো আমি' নামে একটি গান। এ গানে একজন ভ্রমণকারীর নিজ দেশকে মিস করার আবেগ প্রকাশিত হয়েছে। গানটিতে বলা হয়েছে, 'আমি জন্মভূমির ছোট্ট নদী মিস করি। মা, নদীর যে ঢেউ তোমার কাছে আসে, সে ঢেউ অবশ্যই আমি। আমি আমার জন্মভূমির রান্নার ধোঁয়া মিস করি। মা, যদি কোনো বাঁশির সুর তোমার কানে বাজে, তবে সে সুর অবশ্যই আমি। আমি সৈকতের সুন্দর শঙ্খ মিস করি। মা, যদি কোনো পাল তোলা নৌকা তোমার কাছে আসে, সে নৌকা অবশ্যই আমি। আমি জন্মভূমির উজ্জ্বল চাঁদ মিস করি। মা, তুমি যদি সুদূর থেকে ভেসে আসা কোনো পাহাড়ী গান শোনো, তবে জানবে সে গান অবশ্যই আমি।'

গু চিয়ান ফেন পপ সংগীত সৃষ্টি করার পাশাপাশি বাচ্চাদের জন্যও গান লিখেছেন। তিনি বলেন, 'এখন শিশুরা আকাশের চাঁদ চাইলেও বাবা-মা তাদের ইচ্ছা পূরণের চেষ্টা করেন। কিন্তু শিশুরা গান গাইতে চাইলে বাচ্চাদের গান খুব কম খুঁজে পাওয়া যায়। ২০০৪ সালে তত্কালীন চীনের রাষ্ট্রীয় কাউন্সিলর উ ঈ  গু চিয়ান ফেনকে বলেন, 'বাচ্চাদের জন্য কিছু গান লিখুন।' এরপর তিনি শিশুদের গানের বিষয়ে আরো বেশি গুরুত্ব দেন। অবসর নেওয়ার পর গু চিয়ান ফেন চীনের প্রাচীন কবিতাগুলো সুর করে বাচ্চাদের জন্য 'নতুন ক্লাসরুমের গান' নামে ত্রিশাধিক গান সৃষ্টি করেন। বাচ্চারা এ গানগুলো গাওয়ার সাথে সাথে প্রাচীনকালের কবিতাও শিখতে পারছে।

বাচ্চাদের সঙ্গে আছেন গু চিয়ান ফেন

প্রিয় শ্রোতাবন্ধুরা, এবার শুনুন গু চিয়ান ফেনের সৃষ্ট বাচ্চাদের গান ' গান গাওয়া ও হাসি'। এ গানের কথা লিখেছেন ওয়াং চিয়ান। সুর করেছেন গু চিয়ান ফেন। এ গানে কিশোর-কিশোরীদের ভবিষ্যত নিয়ে প্রশংসা করা হয়েছে।

গু চিয়ান ফেন মা, জন্মভূমি, শিশু এবং তরুণদের জন্য প্রচুর গান লিখেছেন। এ গানগুলোর মধ্যে তার নিজের আবেগ ও মমতা রয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, যদিও এখন বয়স বেড়েছে। তবে এখনো প্রতিদিন সংগীতের সঙ্গে আছেন তিনি। ফলে মনে কখনো বৃদ্ধ হওয়ার অনুভূতি হয়নি। কারণ তার মন সবসময় তরুণ এবং যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে।

সুপ্রিয় বন্ধুরা, আশা করি, গান শুনে আপনারাও মনে সব সময় শক্তি পাবেন। আজকের 'সুর ও বাণী' আসর এ পর্যন্তই। সবাই ভালো থাকুন। আবার কথা হবে। (ইয়ু/মান্না)

© China Radio International.CRI. All Rights Reserved.
16A Shijingshan Road, Beijing, China. 100040